অগ্রণী ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, সুশাসনের ঘাটতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন সংকট ও দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকটি সাম্প্রতিক সময়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তবে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা বলছে, পরিস্থিতি উত্তরণে সংস্কার, সুশাসন, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে জোর দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকের বর্তমান সংকট, অতীতের অভিজ্ঞতা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে উদ্যোক্তা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেছেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ : অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: অগ্রণী ব্যাংক বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, খেলাপি ঋণ কমানো, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। ব্যাংকের কিছু আর্থিক সূচকে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ ও মূলধন পর্যাপ্ততার বিষয়টি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা সমস্যাগুলো আড়াল না করে চিহ্নিত করছি এবং পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অগ্রণী ব্যাংক আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে পারবে।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ: আপনি এর আগে অগ্রণী ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন ব্যাংকের অবস্থা কেমন ছিল?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: ২০০৪ সালে আমি অগ্রণী ব্যাংকের দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সব আর্থিক সূচকই নেতিবাচক ছিল। ব্যাংকের মূলধনে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪০ শতাংশের বেশি এবং ঈঅগঊখঝ রেটিংও দুর্বল ছিল। সে সময় ব্যাংকের ইক্যুইটি ছিল ঋণাত্মক প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা পুনর্গঠন ও সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দিই। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং ধারাবাহিক সংস্কারের ফলে ২০১০ সালের মধ্যে ব্যাংকের ইক্যুইটিকে প্রায় ১০ শতাংশ ইতিবাচক অবস্থানে নিয়ে আসতে সক্ষম হই। একই সময়ে লোকসানি শাখার সংখ্যা ৪৪৭ থেকে কমে ৭৭টিতে নেমে আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ পরিবর্তন আনতে কোনো শাখা বন্ধ করতে হয়নি এবং কাউকে চাকরিচ্যুতও করা হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতা, দলগত কাজ এবং সম্মিলিত উদ্যোগের ফলেই ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ: আপনার মতে, অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান সংকটের মূল কারণ কী?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: আমার মতে, সবচেয়ে বড় কারণ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ঘাটতি এবং যথাযথ ব্যাংকিং নীতিমালা অনুসরণ না করে রাজনৈতিক তদবির ও প্রভাবের ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদন করা। এর ফলে সময়ের সঙ্গে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ঋণ দেওয়ার পর কার্যকর তদারকি ও নিয়মিত ফলোআপের অভাবও বড় সমস্যা ছিল।
অনেক ঋণগ্রহীতার ব্যবসার অগ্রগতি কিংবা ঋণের ব্যবহার যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। কিছু প্রকল্পে এমন ঋণও দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর বাস্তবায়ন বা দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে পরিচালনার সক্ষমতা ছিল না। ফলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি এবং অনেক ঋণ শেষ পর্যন্ত খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ: আপনার দায়িত্বের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা কোনটি?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: আমি যখন ব্যাংক ছেড়ে যাই, তখন মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে সেটি নেমে দাঁড়ায় মাত্র ০ দশমিক ৫ শতাংশে। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের। তবে সব দিকেই যে অবনতি হয়েছে, তা নয়। শাখা ব্যবস্থাপনায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং আগের তুলনায় লোকসানি শাখার সংখ্যাও কমেছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, করপোরেট শাখা ও প্রধান শাখাগুলোরও কিছু অংশ লোকসানে চলে গেছে, যা আমাদের আগের সময়ে ছিল না।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ: খেলাপি ঋণ কমাতে বর্তমানে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: বর্তমানে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং ভালো ঋণগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী পুনঃতফসিল করা। গত দুই বছরে আমরা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করতে সক্ষম হয়েছি। একই সময়ে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ আদায় করা হয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ শিগগিরই পুনঃতফসিল হবে। আমরা আশা করছি, ডিসেম্বরের শেষে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারব।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ: ঋণ পুনঃতফসিল করলেই তো খেলাপি ঋণের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না। এ ক্ষেত্রে আপনার কৌশল কী?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: অবশ্যই শুধু পুনঃতফসিল করাই সমাধান নয়। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে প্রকৃত অর্থে ঋণকে নিয়মিত ধারায় ফিরিয়ে আনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালা ও নির্দেশনা অনুসরণ করে পুনঃতফসিল করা হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রুপভিত্তিক খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের শনাক্ত করা হয়েছে। ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, প্রকল্পভিত্তিক পর্যালোচনা, পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল এবং বাস্তবসম্মত আদায় কৌশল-সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করছি। একই সঙ্গে নতুন করে যাতে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ: ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার কাছে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আটকে আছে। এই অর্থ আদায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: এটি অবশ্যই আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকের সম্পদ বাড়লেও একই হারে মুনাফা না বাড়ার অন্যতম কারণ হলো বড় অঙ্কের অর্থ খেলাপি ঋণে আটকে থাকা। শীর্ষ খেলাপিদের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কার ব্যবসা কার্যকর, কার প্রকল্প চালু করা সম্ভব, কোথায় পুনর্গঠন প্রয়োজন এবং কোথায় আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন-এসব বিষয় পৃথকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার করে ব্যাংকের তারল্য ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ: ব্যাংকের সম্পদ তো উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তারপরও মুনাফায় কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না কেন?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: ২০১০ সালে অগ্রণী ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৬ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঋণ বিতরণের পরিমাণও প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ সম্পদের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সম্পদের পরিমাণ বাড়লেই মুনাফা একই হারে বাড়বে-এমন নয়। যদি বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয় এবং সেই অর্থ থেকে কাক্সিক্ষত আয় না আসে, তাহলে সম্পদ বাড়লেও মুনাফায় তার প্রতিফলন দেখা যায় না। বর্তমানে আমরা এ জায়গাটিতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ: নতুন গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে সরকারি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শক্তি কী?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: সরকারি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থা ও বিশ্বাস। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার কারণে অনেক মানুষ সরকারি ব্যাংকে সঞ্চয় রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এছাড়া আমাদের বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, জনবল এবং দেশব্যাপী উপস্থিতি রয়েছে। এর সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা যুক্ত হলে সরকারি ব্যাংকগুলো নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের কাছেও আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ : আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে আমানতের মুনাফার হার কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমানতের মুনাফার হার নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ে। অনেক মানুষ ব্যাংকে আমানত রেখে সেই মুনাফা দিয়ে সংসারের ব্যয় পরিচালনা করেন। কিন্তু মূল্যস্ফীতির তুলনায় আমানতের মুনাফা কম হলে তারা প্রকৃত অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তখন তাদের মধ্যে ব্যাংকে টাকা রাখার আগ্রহ কমতে পারে এবং তারা বিকল্প বিনিয়োগের দিকে যেতে পারেন। তাই আমানতকারীদের স্বার্থ এবং ব্যাংকের আমানত প্রবাহ-দুই বিষয় বিবেচনায় রেখেই মুনাফার হার নির্ধারণ করা উচিত।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ: অগ্রণী ব্যাংকের জন্য সুশাসন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: সবার আগে সুশাসন দরকার। করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে হলে শক্তিশালী ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদকে দক্ষতার সঙ্গে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করতে হবে এবং ব্যবস্থাপনাকে সেই নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কার্যকর রাখার মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ : ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে অগ্রণী ব্যাংকের পরিকল্পনা কী?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: ডিজিটাল ব্যাংকিং এখন আর শুধু একটি সেবা নয়; এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আমরা গ্রাহকদের জন্য নিরাপদ, দ্রুত ও সহজ ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছি। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মিত সিকিউরিটি অডিট, ২৪/৭ মনিটরিং, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন, ডেটা এনক্রিপশন এবং কর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ-এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশনাও কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ :‘বাংলা কিউআর’ নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: ক্যাশহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে ‘বাংলা কিউআর’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিউআর কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার গ্রাহকরা সহজে ও নিরাপদে লেনদেন করতে পারবেন। এতে নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রয়োজন কমবে, লেনদেনের সময় ও ব্যয় কমবে এবং অর্থ পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার অপচয়ও হ্রাস পাবে। ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ গ্রাহক পর্যন্ত সবার জন্য আর্থিক সেবা আরও সহজলভ্য করবে। তাই ‘বাংলা কিউআর’-এর বিস্তার ও কার্যকর ব্যবহারে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ : ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা ফেরাতে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ কী?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: সবার আগে আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কার্যকর ডিপোজিট সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে আমানতকারীরা তাদের সঞ্চয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় না থাকেন। এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও কার্যকর করা জরুরি। এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও আরও গতিশীল হবে।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ:অগ্রণী ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ। বিশেষ করে গ্রুপভিত্তিক ঋণের উচ্চ এক্সপোজার এবং প্রকল্পভিত্তিক ঋণের একটি বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হওয়া ব্যাংকের ওপর চাপ তৈরি করেছে। তবে আমরা সমস্যা চিহ্নিত করেছি। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের শনাক্ত করা হচ্ছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও অন্যান্য নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে ব্যবসাকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি বন্ধ করতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ : আগামী তিন বছরে অগ্রণী ব্যাংককে কোথায় দেখতে চান?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: আগামী তিন বছরের মধ্যে অগ্রণী ব্যাংককে একটি স্থিতিশীল, লাভজনক এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের লক্ষ্য। এটি সহজ কাজ নয় এবং সময়সাপেক্ষ। তবে আমরা আশাবাদী। আমাদের মূল লক্ষ্য হবে খেলাপি ঋণ কমানো, আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার, নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ সৃষ্টি বন্ধ করা, পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠন।
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ: অগ্রণী ব্যাংককে নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা কী?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ: আমার লক্ষ্য অগ্রণী ব্যাংককে আবারও দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাতারে ফিরিয়ে আনা। এ ব্যাংকের দীর্ঘ ও গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। দেশভাগের আগে হাবিব ব্যাংক ও কমার্স ব্যাংকের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি ছিল গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা, আস্থা ও পেশাদারিত্ব। আমরা সেই ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করতে চাই। গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠন, সেবার মানোন্নয়ন এবং আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অগ্রণী ব্যাংককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই আমাদের অঙ্গীকার। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কঠোর সুশাসন এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে অগ্রণী ব্যাংক খুব শিগগিরই খেলাপি ঋণের চাপ কাটিয়ে উঠে তার হারানো মর্যাদা ও নেতৃত্বের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।






