অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক : বেসরকারি খাতের মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসিতে সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল, ডায়েরি-ক্যালেন্ডার সরবরাহ, আইটি প্রকল্প এবং পর্ষদ সভার সম্মানী খাতে প্রায় ১৯৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকার অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-২-এর একটি নথিতে অভিযোগগুলোর সারসংক্ষেপ তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
https://www.uddoktabangladesh.com/2026/06/05/8036/
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে উল্লিখিত অভিযোগগুলো এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। ফলে তদন্ত, সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপের আগে এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
কম্বল কিনে ১১০ কোটি টাকা: নথি অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে কম্বল কেনার নামে প্রায় ১১০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ বা অন্তত ৮৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান, সাতজন পরিচালক এবং কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিতে একজন পরিচালককে ঘিরে কম্বল ক্রয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ডায়েরি-ক্যালেন্ডারে ৭৭ কোটি: ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার সরবরাহের নামে প্রায় ৭৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও নথিতে এসেছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে এই অঙ্ক ৭৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে; ফলে তদন্তে প্রকৃত অঙ্ক ও ব্যয়ের নথিপত্র যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিতে একই ধরনের অনিয়ম চলেছে। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
সম্মানী নিয়ে প্রশ্ন : বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ বা নির্বাহী কমিটির একটি সভায় সদস্যপ্রতি সম্মানী ৮ হাজার টাকা। অভিযোগে বলা হয়েছে, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে প্রতি সভায় সদস্যদের ১ লাখ টাকা করে সম্মানী দেওয়া হয়।
নথি অনুযায়ী, নিয়মের অতিরিক্ত অর্থ ‘সাসপেন্স আদার্স অ্যাকাউন্ট’ থেকে উত্তোলন করে পরে ভুয়া বিল ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে সমন্বয়ের অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিতে এমন কর্মকাণ্ডকে গুরুতর আর্থিক জালিয়াতি ও সম্ভাব্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আইটি প্রকল্পেও অসংগতি : ব্যাংকের আইটি অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ‘থাকরল ইনফরমেশন কোম্পানি’কে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রয়নীতিও মানা হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘রেইনবো অ্যাপ’ উন্নয়নে ‘কোনা সফটওয়্যার ল্যাব’কে ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হলেও পরে কারওয়ান বাজার শাখার একটি হিসাব থেকে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ডেবিট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কার্যাদেশের মূল্য ও প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধানের যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ নথিতে উল্লেখ করেছে।
চাকরিচ্যুতি ও ভয়ভীতির অভিযোগ : আইটি প্রকল্পের অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই ঘটনায় আইটি বিভাগের প্রধানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অনিয়মে সহযোগিতা করতে বাধ্য করার অভিযোগও এসেছে।
অভিযোগে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মতিউল হাসান, পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল আওয়াল এবং কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে। তবে তাদের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ নথি, ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র, ব্যাংক হিসাব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল ছাড়া ব্যক্তিগত দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এখন যা গুরুত্বপূর্ণ : বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন দল অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না মিললে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা নিতে পারে।
তদন্তে বিশেষভাবে যাচাই প্রয়োজন—সিএসআর বিতরণের প্রকৃত সুবিধাভোগী, কম্বল ও প্রচারসামগ্রী সরবরাহকারীদের পরিচয়, দরপত্র ও বিলের সত্যতা, সাসপেন্স হিসাবের লেনদেন, আইটি প্রকল্পের কাজের বাস্তব অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদনপ্রক্রিয়া






