বিশেষ প্রতিবেদক : দেশের শীর্ষস্থানীয় জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। নিরীক্ষকদের প্রতিবেদনে কোম্পানিটিতে ৫৬৫ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং অনিশ্চিত বিনিয়োগের চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২১১ কোটি টাকা অনাদায়ি খাতে আটকে থাকার পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগে ঘাটতি রয়েছে ২০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্ধারিত ‘অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগের’ সীমা অতিক্রম করেছে ১৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
অনাদায়ি খাতে ২১১ কোটি টাকা: নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের মধ্যে পিএফআই (PFI) সিকিউরিটিজে ১৬৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং অনাদায়ি মুনাফা, লভ্যাংশ ও ভাড়া বাবদ ৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা রয়েছে। এ ছাড়া পিএফআই সিকিউরিটিজে আরও ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি থেকে পাওনা ১৮৮ কোটি ১১ লাখ টাকা, যা ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ি অবস্থায় পড়ে আছে।
সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্য ১৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা লভ্যাংশও ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ি রয়েছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে কোম্পানিটির আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বিশাল ঘাটতি: প্রাইম ইসলামী লাইফের সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ রয়েছে মাত্র ২৭ কোটি টাকা। অথচ বীমা বিধিমালা ও আইডিআরএর নিয়ম অনুযায়ী, জীবন বীমা কোম্পানির সম্পদের অন্তত ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এ কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭৮২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সে হিসাবে সরকারি সিকিউরিটিজে ন্যূনতম ২৩৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বিনিয়োগের কথা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
‘অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগে’ সীমা অতিক্রম: জিরো কুপন বন্ড, পিএফআইয়ের স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ ও স্টার্লিং গ্রুপের বিনিয়োগসহ ‘অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগ’ খাতে কোম্পানিটির বিনিয়োগ রয়েছে ১৮৭ কোটি ৮০ লাখ ৪৪ হাজার ৯০৭ টাকা। আইডিআরএর বিধিমালা অনুযায়ী, এ খাতে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও কোম্পানিটির বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বেশি।
নিরীক্ষকরা আরও জানিয়েছেন, বাংলালায়নের ১০ শতাংশ কনভার্টিবল জিরো কুপন বন্ডে প্রায় ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে কোম্পানিটি। এর বিপরীতে জমা মুনাফা রয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। বন্ডটির মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হলেও এখনো এ বিনিয়োগের অর্থ আদায় অনিশ্চিত।
স্টার্লিং গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে কোম্পানিটির ১৫ কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগও ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী। অর্থ আদায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চারটি দেওয়ানি আবেদন চলমান রয়েছে।
অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়নহীনতা ও মালিকানা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন: এ ছাড়া কোম্পানিটি জীবন বীমা দায়ের অ্যাকচুয়ারিয়াল তদন্ত ও মূল্যায়ন করেনি। অথচ ২০১৮ সালের ২৯ মে জারি করা এসআরও ১৬১-আইন/২০১৮-এর ৩০(১) ধারায় এ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক।
নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে স্পন্সর ও পরিচালকদের মালিকানা ৩৬ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ৬৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। এই মালিকানা কাঠামো আইডিআরএর নির্ধারিত অনুপাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সচিব আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম গণমাধ্যমে বলেন, পাওনা টাকা আদায়ে মামলা চলমান রয়েছে। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
বীমা খাতে অনিয়মের এমন চিত্র এককভাবে প্রাইম ইসলামী লাইফের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৪ সালের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ২৭টি তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে আইডিআরএকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছে। এর মধ্যে প্রাইম ইন্স্যুরেন্সও (নন-লাইফ) অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আইডিআরএর নিয়ম অনুযায়ী, জীবন বীমা কোম্পানিকে তার সম্পদের অন্তত ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে হয়, যা পলিসিহোল্ডারদের দাবি নিশ্চিত করতে সহায়ক। এই বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করলে পলিসিহোল্ডারদের অর্থের সুরক্ষা ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ বিষয়ে আইডিআরএ ও প্রাইম ইসলামী লাইফের পক্ষ থেকে আরও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।






