জোনায়েদ মানসুর : একটি ইনভয়েসে লেখা কয়েকটি সংখ্যা। তার ওপর ভিত্তি করে খোলা হয় এলসি, ব্যাংক থেকে ছাড় হয় বৈদেশিক মুদ্রা, কাস্টমস ছাড়ে পণ্য। কাগজে সবকিছু বৈধ—কিন্তু সেই কাগজের অঙ্ক যদি বাস্তব পণ্যের দামের সঙ্গে না মেলে, তাহলে একটি বৈদেশিক বাণিজ্যিক লেনদেনই হয়ে উঠতে পারে অর্থপাচারের পথ। দেশের অর্থপাচারের সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত এখানেই। টাকা সবসময় গোপনে সীমান্ত পার হচ্ছে না; অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যের বৈধ কাগজপত্র ব্যবহার করেই তার মূল্য স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই একটি পণ্য দেশে ঢোকে, কাগজে তার দাম লেখা থাকে এক রকম; আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরেক রকম। কোথাও পণ্যের পরিমাণ কাগজে যত দেখানো হয়, বাস্তবে আসে তার চেয়ে কম। আবার রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির প্রকৃত মূল্য আড়াল করে দেশে আসে কম টাকা। বাইরে থেকে সবই বৈধ আমদানি-রপ্তানি। কিন্তু ইনভয়েসের অঙ্ক বদলে গেলেই বদলে যায় টাকার হিসাব-নিকাশ। এই অঙ্কের কারসাজিই অর্থপাচারের অন্যতম বড় ঝুঁকি বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
৬৮ বিলিয়ন ডলারের মিসইনভয়েসিং: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০১৩ থেকে ২০২২—এই ১০ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে সম্ভাব্য ৬৮ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ আর্থিক বহিঃপ্রবাহের ‘মূল্যের ব্যবধান’ শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে বছরে প্রায় ৬.৮ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমপরিমাণ। এই ব্যবধানকে প্রধানত বাণিজ্যিক মিসইনভয়েসিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)।
এর মধ্যে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে লেনদেনেই প্রায় ৩২.৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান পাওয়া গেছে। শুধু বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের ক্ষেত্রে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে বেরিয়ে যাওয়ার হিসাবও বিভিন্ন গবেষণায় এসেছে। আর ২০১৫ সালে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রায় ৫.৯ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যভিত্তিক অবৈধ বহিঃপ্রবাহ শনাক্ত করেছিল।
অন্যদিকে অর্থনীতির ওপর ২০২৪ সালের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ২০০৯-২০২৩ সময়ে বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ আর্থিক বহিঃপ্রবাহের কথা জানিয়েছে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণায় বাণিজ্যপথে অর্থপাচারের বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে উঠে এসেছে।
বিআইবিএমের গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের অর্থপাচারের প্রায় ৭৫ শতাংশই বাণিজ্য চ্যানেল ব্যবহার করে হতে পারে। তবে এই হিসাব শুধু ইনভয়েস কারসাজি নয়; অবৈধ অর্থের বিভিন্ন ধরনের বহিঃপ্রবাহকে বিবেচনায় নেয়। বিআইবিএমের গবেষণাটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য এবং ৩৭টি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। গবেষণায় মিথ্যা আমদানি-রপ্তানি ঘোষণা, ওভার-আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ভুয়া চালানকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চার কৌশলে অর্থপাচার: বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের মূল কৌশলগুলো বেশ সরল, কিন্তু এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বিআইবিএমের গবেষণায় চারটি প্রধান কৌশল চিহ্নিত করা হয়েছে: পণ্যের ওভার অ্যান্ড আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভার অ্যান্ড আন্ডার শিপমেন্ট, পণ্যের মিথ্যা বর্ণনা এবং একাধিক ইনভয়েস।
ওভার ইনভয়েসিং হলো—আমদানিকৃত পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দেখানো। ধরুন, ব্যবসায়ীরা কখনো ১০ কোটি টাকার পণ্যের দাম দেখাচ্ছেন ১৫ কোটি টাকা। এই অতিরিক্ত ৫ কোটি টাকার অর্থ চলে যাচ্ছে বিদেশে। আবার কখনো আন্ডার ইনভয়েসিংয়ে ১০ কোটি টাকার পণ্যকে ৬ কোটি টাকা দেখানো হলে কমে যায় আমদানি মূল্য। এতে কমে যাচ্ছে শুল্ক-কর, আর প্রকৃত মূল্যের বাকি অংশ অন্য পথে পরিশোধের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রকৃত মূল্যের সঙ্গে ঘোষিত মূল্যের যে ব্যবধান তৈরি হয়, সেটি পরিশোধের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অর্থ লেনদেনের ঝুঁকি তৈরি হয়। ওভার ইনভয়েসিংকে বলা যায় অর্থপাচারের সরাসরি পথ। কেননা, কোথাও একই চালানের বিপরীতে একাধিক ইনভয়েস, কোথাও কাগজে ১০০ টন পণ্য কিন্তু দেশে এসেছে ৬০ টন, আবার কোনো ক্ষেত্রে নথিতে পণ্য এসেছে—বাস্তবে তার অস্তিত্বই নেই।
ব্যাংক ও কাস্টমসের নথিতে ১০০ টনের হিসাব থাকলেও বাস্তব চালানে ৪০ টনের ঘাটতি তৈরি হলো। এই কৌশলগুলোর সম্মিলিত নাম বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার। এ অর্থপাচার বিদেশে থেকে যেতে পারে বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে ফিরে যেতে পারে—যদি পুরো প্রক্রিয়ায় যোগসাজশ থাকে। এ ধরনের শর্ট শিপমেন্টের মাধ্যমে পণ্যের পরিমাণ ও অর্থের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি করা যায়।
আরও একটি কৌশল হলো কাল্পনিক চালান—কাগজে পণ্য পাঠানো হয়েছে, অথচ বাস্তবে কোনো পণ্যই পাঠানো হয়নি। আবার একই চালানের বিপরীতে একাধিক ইনভয়েস তৈরি করে একাধিকবার অর্থ পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অর্থপাচারের কারণে সরকার হারায় রাজস্ব, দেশ হারায় বৈদেশিক মুদ্রা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার বলেন, কম দাম দেখিয়ে আমদানি ও রপ্তানির মাধ্যমেও অর্থ পাচার হয়; এটাও বাণিজ্য অর্থায়নের মধ্যে পড়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাণিজ্য এমনভাবে করা হয় যে বাইরের দৃষ্টিতে সব ঠিকঠাক মনে হয়। তবে ভেতরে অন্য কিছু লুকানো থাকে। অনেক সময় চোখে ধুলা দেওয়ার মতো অবস্থা হয়।
ব্যাংক ও কাস্টমসের সীমাবদ্ধতা : ২০২৫ সালে এনবিআরের তখনকার চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বাণিজ্যিক পণ্যের মূল্য কারসাজি ঠেকাতে ব্যাংক ও কাস্টমসের ব্যর্থতাকে ‘সম্মিলিত ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম যাচাই করা সম্ভব। তার বক্তব্যের অর্থ দাঁড়ায়—সমস্যাটি শুধু তথ্যের ঘাটতি নয়; তথ্য থাকা সত্ত্বেও সেটি যথাসময়ে কাজে লাগানোর সক্ষমতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা কার্টন বা প্যাকেটের মধ্যে কী আনছে তা এনবিআর লোকবলের অভাবে সব সময় যাচাই করতে পারেন না। এতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থ পাচার করে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক বার্ষিক প্রতিবেদনে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের ঝুঁকি শনাক্তে আলাদা নজরদারি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে বাস্তবে এই নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এক প্রেস কনফারেন্সে বলে, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের ফলে বড় ধরনের জালিয়াতি ও অর্থপাচার কিছুটা কমেছে, কিন্তু আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কারের অভাবে মিসইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বড় পরিসরে অর্থপাচারের সুযোগ এখনো রয়ে গেছে।
বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং সেবা আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক নীতিমালার ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন করেছে। আরও পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থপাচারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বিদেশে সম্পদ, দেশে তার উৎস-৪০ হাজার কোটি টাকার সন্ধান : অর্থপাচারের শেষ গন্তব্য শুধু বিদেশি ব্যাংক হিসাব নয়। পাচার করা অর্থ দিয়ে বিদেশে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, জমি, কোম্পানি, ব্যবসা কিংবা অন্যান্য সম্পদ কেনা হতে পারে। ২০২৫ সালে এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের বিদেশি সম্পদের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায়।
তদন্তে পাঁচটি দেশে সাতটি শহরে অনুসন্ধানের মাধ্যমে এসব সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই, লন্ডন, নিউইয়র্ক, ভার্জিনিয়া ও ফ্লোরিডাসহ বিভিন্ন স্থানে সম্পদের সন্ধান পাওয়ার কথা জানানো হয়। একটি প্রতিবেদনে ৩৪৬টি সম্পত্তি ব্যক্তি ও কোম্পানির নামে শনাক্ত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই সম্পদ গড়ে তোলার সঙ্গে জড়িত ৫২ জন বাংলাদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।
বিদেশে শনাক্ত ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ শুধু ওভার-আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না বলছে সিআইসি। তবে এটি যে বাণিজ্যপথে পাচার হওয়া অর্থের একটি বড় অংশ, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। ২০২৫ সালের নভেম্বরে সরকার প্রথমবারের মতো ৫০ জনের বেশি সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে ৪০,০০০ কোটি টাকার অবৈধ বিদেশি সম্পদ উদ্ধারে অভিযান শুরু করে। সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সাতটি শহরে তদন্ত চালিয়ে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
হুন্ডির মহাসড়ক: ইনভয়েসের কারসাজিতে অর্থ প্রথমে বিদেশি বিক্রেতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা তৃতীয় পক্ষের অ্যাকাউন্টে যেতে পারে। সেখান থেকে অর্থের মালিকানা ও উৎস আড়াল করতে একাধিক দেশ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তা ঘুরতে পারে।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিদিন ৭৫০ কোটি টাকা সমমূল্যের অর্থ লেনদেন হচ্ছে। আনুমানিক এ হিসাবে সংখ্যাটি মাসে ২২ হাজার ৫০০ কোটিতে দাঁড়ায়। এ পরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, দেশে অনুমোদিত ২৩৫টির বাইরে আরও ৭০০ মতো মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব মানি এক্সচেঞ্জার বন্ধে কঠোর হওয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা- রিজার্ভ, রাজস্ব ও ব্যাংকিংয়ে আঘাত : বাণিজ্যপথে অর্থপাচার নিয়ে অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগের মূল জায়গা হলো—এটি একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রাজস্ব আয়, বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আঘাত করে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বিভিন্ন বিশ্লেষণেও ট্রেড মিসইনভয়েসিংকে বাংলাদেশের অবৈধ অর্থপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সিপিডির হিসাবে ২০০৯-২০১৮ সময়ে শুধু ট্রেড মিসইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিআইবিএমের গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাণিজ্যপথ পাচারকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো—একটি বাণিজ্যিক লেনদেনের মধ্য দিয়ে অন্য অনেক পদ্ধতির তুলনায় বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করা সম্ভব।
এই পদ্ধতির সুবিধা হলো, অর্থ স্থানান্তরের জন্য আলাদা কোনো ‘টাকার রাস্তা’ তৈরি করতে হয় না। বৈধ আমদানির এলসি, ব্যাংক পেমেন্ট, কাস্টমস নথি—সবকিছুর ভেতরেই লুকিয়ে যেতে পারে অতিরিক্ত অর্থ।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। তবে টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার পর তা উদ্ধারের চেষ্টা চালানোর চেয়ে টাকা যাতে পাচার না হয়, সেটা নিশ্চিত করাই বেশি প্রয়োজন। সাধারণত সৎভাবে অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তি তার উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করেন না। প্রধানত কালোটাকা ও অপ্রদর্শিত অর্থের মালিকরাই তাদের উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করে থাকেন। কারণ এ অর্থ স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।
অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, মিথ্যা ঘোষণা বন্ধে তথ্য প্রদানে স্বচ্ছতা আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বন্দর, লিয়েন ব্যাংক এবং ক্রেতা-বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনলাইনে আদান-প্রদানে পদক্ষেপ নিতে হবে। নজরদারির দায়িত্বরতদের অনলাইনে প্রবেশ করে তথ্য খতিয়ে দেখার সুযোগ রাখতে হবে। ভিয়েতনাম, আমেরিকা, চীনসহ অনেক দেশে এভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এলসিতে কী তথ্য দেওয়া হয়েছে আর বন্দর থেকে কী দাম দেখিয়ে আমদানি-রপ্তানি করা হচ্ছে তা মিলিয়ে দেখার সুযোগ থাকলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থ পাচারের দিন শেষ হবে।
সমাধানের পথ- সমন্বিত নজরদারি ও স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি বিশ্লেষণ : অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থপাচার বন্ধে আইন থাকা যথেষ্ট নয়; প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের তাৎক্ষণিক আদান-প্রদান, আন্তর্জাতিক বাজারদর যাচাই, প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ এবং সন্দেহজনক লেনদেনে দ্রুত তদন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্ক ফোর্স পুনর্গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বিএফআইইউ, দুদক, সিআইডি, এনবিআরের সিআইসি এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মতো সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার কাঠামো দেওয়া হয়েছে। ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় যৌথ তদন্ত দল গঠনের কথাও ওই প্রতিবেদনে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রতিটি বড় আমদানি-রপ্তানি লেনদেনে স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি স্কোরিং চালু করা দরকার। একই পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম, আমদানিকারকের আগের মূল্য, দেশভিত্তিক মূল্য, সরবরাহকারীর মালিকানা এবং পণ্যের পরিমাণ—সব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে।
বিআইবিএমের গবেষণায় আরও সুপারিশ করা হয়েছে, একটি ‘ট্রেড ট্রান্সপারেন্সি ইউনিট’ তৈরি করতে, যেখানে কাস্টমস ও বিএফআইইউর তথ্য একত্রিত থাকবে। এছাড়া প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করতে একটি প্রকাশ্য বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ রেজিস্টার প্রকাশ এবং ফ্রেট ও গুদাম অপারেটরদের ওপরও কেওয়াইসি/এএমএল দায়িত্ব বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অনলাইনে প্রকৃত হিসাব যাচাই: শিল্পী, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা কী পরিমাণ আয় করেন তার তথ্য গোপন করার সুযোগ থাকে। তাদের হিসাব হাতে-কলমে না রেখে কম্পিউটারে সংরক্ষিত রাখতে আইন করা হলে এবং তা অনলাইনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুদক, এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের নজরদারি করার সুযোগ রাখা হলে মিথ্যা হিসাব দেওয়ার সুযোগ কমবে।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগ-৯টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা: বর্তমান সরকার পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নতুন নয়। অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে এ উদ্যোগের প্রাথমিক সূচনা করা হলেও সময়স্বল্পতার কারণে তখন সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে উদ্যোগটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় এ উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চলতি বছরের ২৪ জুন জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের যে অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করার জন্য ৯টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করা হচ্ছে।
সংস্থাগুলো ‘নো উইন নো ফি’ ভিত্তিতে বাংলাদেশকে পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সহায়তা করবে। অর্থাৎ এ সংস্থার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে কোনো বাড়তি ফি দিতে হবে না। তারা যে পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে তার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তারা কমিশন হিসাবে লাভ করবে। অর্থ ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের কাছে কোনো আর্থিক সুবিধা দাবি করতে পারবে না। অর্থমন্ত্রী সংসদে আরও জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি সহায়তা দেবে।
আমদানি নীতির কাঠামোতে বদল-এলসির বাইরে লেনদেনের সুযোগ: ঋণপত্র বা এলসির পাশাপাশি এখন থেকে মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানির সুযোগ পাচ্ছেন দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকেরা। একই সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও কেন্দ্রীয় বন্ডেড গুদাম প্রতিষ্ঠার বিধান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্পে বিনিয়োগের জন্য আমদানি সুবিধা এবং রফতানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ সম্প্রসারণ করে নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ জারি করেছে সরকার।
চলতি বছরের ২৪ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন আমদানি নীতি আদেশের গেজেট প্রকাশ করে। আগের আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২০২৪-এ এলসি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ থাকলেও বিভিন্ন পণ্য ও খাতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা ও শর্ত ছিল। বিশেষ করে বাণিজ্যিক আমদানিকারকেরা বাংলাদেশ থেকে অর্থ পরিশোধ করে এলসি ছাড়া বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পণ্য আমদানি করতে পারতেন। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ছিল পৃথক সীমাও।
নতুন নীতিতে সেই মূল্যসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রচলিত চুক্তিনির্ভর বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় আরও বেশি পণ্য আমদানির সুযোগ তৈরি হলো। এতে একদিকে ব্যাংকিং প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা কমতে পারে, অন্যদিকে আমদানিকারক ও বিদেশি সরবরাহকারীর মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক চুক্তির সুযোগও বাড়বে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলসির বাইরে লেনদেন বাড়লে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং ওভার বা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর নজরদারিও জরুরি হয়ে উঠবে।
রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন : কারণ ইনভয়েসের একটি অঙ্ক ভুল হলে শুধু একটি চালান ভুল হয় না—ভুল হতে পারে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবও। আর সেই ভুলের ফাঁক দিয়েই যদি বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মূল্য দেশের বাইরে চলে যায়, তাহলে এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যবসায়িক অনিয়ম নয়; এটি রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
অর্থপাচার ঠেকাতে শুধু সীমান্তে নগদ অর্থ আটকালে হবে না। যে কাগজের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলারের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে, সেই কাগজের সত্যতাও পরীক্ষা করতে হবে। গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এশিয়ার শীর্ষ ১০টি উন্নয়নশীল অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম, যেখানে বাণিজ্যিক মিসইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ফাঁক দেখা গেছে।
২০২৪-২৫ সালের শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের ফলে বাংলাদেশের বার্ষিক ক্ষতি জিডিপির ৩.৪ শতাংশ, যা দেশের বার্ষিক স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের চেয়েও বেশি। এই ক্ষতি শুধু সংখ্যার খেলা নয়; এটি দেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সময় বাণিজ্য ও অর্থ ব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কারের। নয়তো ইনভয়েসের এই অঙ্কের ফাঁক দিয়ে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ পাচার হতেই থাকবে, আর দেশের অর্থনীতি হতে থাকবে দুর্বল।






