নিজস্ব প্রতিবেদক : আলফা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ৩৩ জন গ্রাহকের মৃত্যুর পর তাদের পরিবার বা নমিনিরা বীমার পুরো অর্থ পাননি বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব গ্রাহকের বীমার মোট অর্থের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। কিন্তু কোম্পানি পরিশোধ করেছে মাত্র ৩৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা।
বীমা পলিসি চালু থাকা অবস্থায় কোনো গ্রাহকের মৃত্যু হলে চুক্তি অনুযায়ী তার পরিবার বা নির্ধারিত ব্যক্তি (নমিনি) বীমার অর্থ পাওয়ার কথা। তবে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর দাবি, আলফা ইসলামী লাইফের ক্ষেত্রে অনেকেই নির্ধারিত অর্থের চেয়ে কম টাকা পেয়েছেন।
কিশোরগঞ্জের জেসমিন আক্তারের পরিবার: কিশোরগঞ্জের আলালপুর গ্রামের জেসমিন আক্তার ২০২১ সালের ১২ জানুয়ারি আলফা ইসলামী লাইফে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি বীমা করেন। বীমা করার নয় মাস পর তার মৃত্যু হয়।
পরিবারের দাবি, জেসমিনের স্বামী ও নমিনি আব্দুল কাদেরের পুরো বীমার অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও তাকে দেয়া হয়েছে ৫৮ হাজার টাকা।
আব্দুল কাদের জানান, কোম্পানির পক্ষ থেকে তাকে বলা হয়েছিল নিয়ম অনুযায়ী এই অর্থই তার প্রাপ্য। তবে পরে তিনি জানতে পারেন, তার পাওনা অর্থের চেয়ে কম টাকা পেয়েছেন।
ফেনীর বিবি সকিনার পরিবার : ফেনীর জগতপুর গ্রামের বিবি সকিনা ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আলফা ইসলামী লাইফে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকার একটি বীমা করেন। বীমা করার ২১ দিন পর তার মৃত্যু হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বীমার পুরো অর্থের পরিবর্তে কোম্পানি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে। বিবি সকিনার নমিনির স্বামী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বীমার টাকা কম দেয়ার কারণ হিসেবে কোম্পানির পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের ‘চার্জ’ কাটার কথা বলা হয়েছে। তবে এসব চার্জ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা একাধিক বীমার কিস্তি তিনি নিয়মিত পরিশোধ করেছেন। কিন্তু প্রয়োজনের সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় তিনি হতাশ হয়েছেন।
তার দাবি, বীমার টাকা কম পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে। এ কারণে তিনি নিজের ও পরিবারের মোট ১০টি বীমা পলিসি বন্ধ করে দিয়েছেন।
নথিতে ‘তামাদি’ বা বন্ধ পলিসি নিয়ে প্রশ্ন
গ্রাহকদের আরেকটি অভিযোগ, মৃত্যুর পর বীমার অর্থ পরিশোধ করার পরও কিছু পলিসিকে কোম্পানির নথিতে ‘তামাদি’ বা বন্ধ পলিসি হিসেবে রাখা হয়েছে।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গ্রাহকের মৃত্যু হলে এবং পরিবারের পাওনা অর্থ পরিশোধ হলে সংশ্লিষ্ট বীমা পলিসি বন্ধ হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার কথা। তবে এসব ক্ষেত্রে কোম্পানির নথি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনি কাঠামো ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা
বাংলাদেশের বীমা আইন ও ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ) এর বিধিমালা অনুযায়ী, বৈধ দাবি জমা পড়ার ৯০ দিনের মধ্যে বীমা কোম্পানিকে দাবি পরিশোধ করতে হয়।
আইডিআরএর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে আলফা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সসহ তিনটি লাইফ ইন্স্যুরার তাদের ১০০ শতাংশ দাবি পরিশোধ করেছে বলে দেখানো হয়েছে। তবে গ্রাহকদের সাম্প্রতিক অভিযোগ এবং দাবি পরিশোধে ঘাটতির বিষয়টি এই পরিসংখ্যানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে হচ্ছে।
বীমা খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে আইডিআরএ সম্প্রতি দাবি নিষ্পত্তির জন্য একটি বাধ্যতামূলক চেকলিস্ট প্রণয়ন করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে, “যেকোনো মূল্যে বীমা দাবি পরিশোধ করতে হবে।”
গ্রাহকদের দাবি ও পরবর্তী পদক্ষেপ
গ্রাহকদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা বিষয়টির তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তাদের পাওনা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
যদি কোনো গ্রাহক বা নমিনি মনে করেন যে তার দাবি যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়নি, তাহলে তিনি প্রথমে লিখিতভাবে বীমা কোম্পানিকে জানান এবং ৩০ দিনের মধ্যে সাড়া না পেলে আইডিআরএ-তে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
আইডিআরএর যোগাযোগের তথ্য:
ঠিকানা: সাধারণ বীমা কর্পোরেশন টাওয়ার (৮ম তলা), ৩৭/এ, দিলকুশা বা/এ, মতিঝিল, ঢাকা–১০০০
ওয়েবসাইট: idra.org.bd
ফোন: +৮৮০-২-৯৫৭৩৯৫১ থেকে ৯৫৭৩৯৫৩ (সর্বশেষ তথ্যের জন্য ওয়েবসাইট যাচাই করুন)
এ বিষয়ে আলফা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও আইডিআরএর মন্তব্য জানতে চেষ্টা করা হচ্ছে।






