২ কোটি ২০ লাখ টাকা জরিমানা; চেয়ারম্যানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে
ফৌজদারি মামলা, সতর্ক চীনা উদ্যোক্তা ও প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স
বিশেষ প্রতিনিধি
একটি আইসক্রিম কোম্পানির শেয়ারের দাম মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসে বেড়েছে ২৫৭ শতাংশ। ২৯ টাকা ৮০ পয়সার শেয়ার উঠে গেছে ১০৬ টাকা ৪০ পয়সায়। অস্বাভাবিক এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ছিল কারসাজি ও যোগসাজশের অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্তে উঠে এসেছে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ। আর এর জেরে তাওফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেনে জড়িত ৮ ব্যক্তি ও ২ প্রতিষ্ঠানকে মোট প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। শুধু জরিমানা নয়, একই ঘটনায় কোম্পানিটির চেয়ারম্যান শামীমা নার্গিস হক, তাঁর নিকটাত্মীয় মো. জাহেদুল হক এবং পারিবারিক প্রতিষ্ঠান তৌফিকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, বিএসইসির তদন্তে এই কারসাজির ঘটনায় এক চীনা উদ্যোক্তাকে ঘিরে একটি সহযোগী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। ওই উদ্যোক্তার দুটি প্রতিষ্ঠান—লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট—কারসাজির সঙ্গে জড়িত বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তবে ঝুয়াং লিফেং ও প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
সাড়ে পাঁচ মাসে শেয়ারের দাম বেড়েছে ২৫৭%
বিএসইসির তদন্তে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময়ের লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেন পর্যালোচনা করা হয়। তদন্তে ওই সময়ে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন এবং যোগসাজশের মাধ্যমে কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি লাভেলোর শেয়ারের বাজারদর ছিল ২৯ টাকা ৮০ পয়সা। এরপর অস্বাভাবিক গতিতে বাড়তে থাকে দর। ১৫ জুলাই তা সর্বোচ্চ ১০৬ টাকা ৪০ পয়সায় উঠে যায়।
অর্থাৎ মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৭৬ টাকা ৬০ পয়সা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ২৫৭ শতাংশ।
একটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দরে এমন উল্লম্ফন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়—কোম্পানির মৌলিক আর্থিক অবস্থার সঙ্গে কি এই মূল্যবৃদ্ধির সামঞ্জস্য ছিল, নাকি কৃত্রিমভাবে শেয়ারের চাহিদা ও দাম বাড়ানো হয়েছিল? বিএসইসির তদন্তে দ্বিতীয়টিরই প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জরিমানা ১০ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের
তদন্তের ভিত্তিতে ৮ ব্যক্তি ও ২ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
জরিমানার তালিকায় রয়েছে—
| ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান | জরিমানা |
|---|---|
| লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ | ১৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা |
| সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট | ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা |
| এইচএম রুবাইয়াত | ৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা |
| শায়লা আক্তার | ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা |
| রাজন কুমার সাহা | ২ লাখ টাকা |
| তাসলিমা কানন | ৩৩ লাখ টাকা |
| মো. মাসুদ রানা | ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা |
| আবু সাদাত মো. ফয়সাল | ৪৫ লাখ টাকা |
| আদিবা আজাদ | ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা |
| মোহাম্মদ আরিফ হোসাইন | ৫৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা |
সব মিলিয়ে নির্ধারিত জরিমানার পরিমাণ ২ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
তালিকায় সবচেয়ে বেশি জরিমানা করা হয়েছে মোহাম্মদ আরিফ হোসাইনকে—৫৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এরপর আবু সাদাত মো. ফয়সালকে ৪৫ লাখ টাকা এবং মো. মাসুদ রানাকে ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জরিমানা ছাড়িয়ে ফৌজদারি মামলা
লাভেলোর শেয়ার কারসাজির ঘটনায় কমিশনের সিদ্ধান্ত শুধু অর্থদণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান শামীমা নার্গিস হক, তাঁর নিকটাত্মীয় মো. জাহেদুল হক এবং পারিবারিক প্রতিষ্ঠান তৌফিকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, এখনো মামলা করা হয়নি। বিষয়টি পর্যালোচনা করে আইন বিভাগ পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
ফলে এখন প্রশ্ন—কবে এবং কোন ধারায় মামলা করা হবে এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ কতটা শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে?
কারসাজির সঙ্গে চীনা উদ্যোক্তার সহযোগী গোষ্ঠী
বিএসইসির তদন্তে চীনা উদ্যোক্তা ঝুয়াং লিফেংকে ঘিরে একটি সহযোগী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পাওয়া গেছে।
তদন্তে তাঁর দুটি প্রতিষ্ঠান—লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টের নাম এসেছে। প্রতিষ্ঠান দুটিকেই জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে।
ঝুয়াং লিফেং চীনা নাগরিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ব্যবসা করছেন। পোশাক ও আর্থিক খাতেও তাঁর ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে ব্যক্তিগতভাবে ঝুয়াং লিফেংকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। একই সঙ্গে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সকেও সতর্ক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এখানেই তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—একজন বিদেশি উদ্যোক্তাকে ঘিরে সহযোগী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার পরও কেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি জরিমানা বা মামলা নয়, বরং সতর্কতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? এ বিষয়ে বিএসইসির বিস্তারিত ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কোন আইনে কারসাজি?
বিএসইসির তদন্তে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ১৭(ই)(২) ও ১৭(ই)(৫) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১০ সালের ১৪ জুলাই কমিশনের জারি করা নোটিফিকেশন এবং সুবিধাভোগী ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৫(১) লঙ্ঘনের কথাও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা পরস্পরের সঙ্গে যোগসাজশ করে বিধিবহির্ভূতভাবে শেয়ার লেনদেন করেছেন এবং এর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দর ও লেনদেনের পরিস্থিতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন।
অর্থাৎ বিএসইসির তদন্তে বিষয়টি কেবল অস্বাভাবিক শেয়ারদরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং কারা কীভাবে লেনদেন করেছে, তাদের মধ্যে সম্পর্ক বা সমন্বয় ছিল কি না এবং সেই লেনদেনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
শুধু জরিমানা, নাকি মামলা—আস্থার প্রশ্ন
পুঁজিবাজারে কারসাজির ঘটনায় জরিমানা নতুন কিছু নয়। কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে—জরিমানার পরিমাণ কি কারসাজির মাধ্যমে সম্ভাব্য অর্জিত সুবিধার তুলনায় যথেষ্ট, নাকি এ ধরনের শাস্তি ভবিষ্যতে কারসাজি ঠেকাতে পর্যাপ্ত নয়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিনের মতে, শুধু জরিমানা করলে তা আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতে পারে। তবে অভিযোগের ধরন ও অপরাধ বিবেচনায় সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মামলা করা হলে বাজারে বড় ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়।
তিনি মনে করেন, মামলা করার আগে কমিশনকে আইনি ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি দুর্বল হলে বরং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। কারণ পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার যেকোনো পদক্ষেপকে শুধু শাস্তিমূলক নয়, একই সঙ্গে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টেকসই হতে হয়। একটি মামলা যদি পরবর্তী সময়ে আইনি দুর্বলতায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে শাস্তির চেয়ে বাজারে আস্থার ক্ষতিই বড় হয়ে উঠতে পারে।
‘জিরো টলারেন্স’ থেকে ফৌজদারি ব্যবস্থার পথে
লাভেলোর ঘটনায় বিএসইসির অবস্থানকে পুঁজিবাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোরতার নতুন বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এর আগে গত ১৮ আগস্ট ‘কারসাজির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হবে’ শিরোনামে আগামীর সময়কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছিলেন, কোনো ঘটনায় প্রশাসনিক বা দেওয়ানি ব্যবস্থা প্রয়োজন হলে জরিমানা করা হবে। তবে গুরুতর বা উচ্চ প্রোফাইলের ঘটনায় প্রয়োজন হলে ফৌজদারি মামলার দিকেও যাওয়া হবে।
লাভেলোর ঘটনায় চেয়ারম্যানসহ তিন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত সেই ঘোষণারই বাস্তব প্রয়োগের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এখন দেখার বিষয়, তদন্তে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে মামলাগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে করা হয় এবং আদালতে অভিযোগগুলো কতটা শক্তভাবে উপস্থাপন করতে পারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিনিয়োগকারীর ক্ষতি কতটা—সেটিই বড় প্রশ্ন
শেয়ারের দাম ২৯ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১০৬ টাকা ৪০ পয়সায় ওঠার পুরো প্রক্রিয়ায় কারা লাভবান হয়েছে এবং কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ পুঁজিবাজারে কারসাজির সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ সাধারণত সেই বিনিয়োগকারীরা, যারা কৃত্রিমভাবে বাড়তে থাকা দরকে বাস্তব বাজারচাহিদা মনে করে শেয়ার কিনে পরে দরপতনের মুখে পড়েন।
তাই ২৫৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির ঘটনায় শুধু অভিযুক্তদের জরিমানা করাই যথেষ্ট নয়। কারসাজির মাধ্যমে তৈরি হওয়া কৃত্রিম বাজার পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য ক্ষতি, সংশ্লিষ্ট লেনদেন থেকে অর্জিত সুবিধা এবং কারা শেষ পর্যন্ত সেই সুবিধা পেয়েছে—এসব প্রশ্নেরও পূর্ণাঙ্গ উত্তর প্রয়োজন।
লাভেলোর ঘটনায় বিএসইসির তদন্ত ও শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ানোর অভিযোগ নয়; এটি পুঁজিবাজারে কারসাজির ধরন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা।
২৯ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১০৬ টাকা ৪০ পয়সা—মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসে ২৫৭ শতাংশ উল্লম্ফনের এই হিসাব এখন পরিণত হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত, জরিমানা ও ফৌজদারি ব্যবস্থার প্রশ্নে। সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—সিদ্ধান্তগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।






