দুই হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ,
উচ্চ আদালতে ২০ রিটে নাকাল এনবিআর
অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গ্রুপ সামিটের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খানসহ সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গ্রুপটির বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সংস্থাটি। এনবিআর কর্মকর্তাদের দাবি, প্রায় দুই বছরের অনুসন্ধানে সামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে রেকর্ড দুই হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলায় সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান ছাড়াও আঞ্জুমান আজিজ খান, আদিবা আজিজ খান, মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান, মোহাম্মদ লতিফ খান, মোহাম্মদ ফরিদ খান ও জাফর উমেদ খানকে আসামি করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এনবিআরের কর নির্ধারণ ও আদায়ের উদ্যোগের বিরুদ্ধে গত দুই বছরে উচ্চ আদালতে সামিট গ্রুপের পক্ষ থেকে ২০টি রিট মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি রিটে আয়কর আইনের ১৪৩(৫) ধারায় আরোপ করা জরিমানাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। বাকি ১৩টি রিটে একই আইনের ২১২ ধারায় কর নথি পুনঃউন্মোচনের উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০টি রিটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা এখনো বিচারাধীন। এসব মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
রিটের পথেই সামিট, কঠোর অবস্থানে এনবিআর: এনবিআরের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কর ফাঁকির বিষয়ে নির্ধারিত বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির পরিবর্তে সামিট একের পর এক উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। ফলে কর আদায়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এবার ফৌজদারি আইনের বিধান প্রয়োগের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআর সূত্রের দাবি, নথি জাল করা, মিথ্যা তথ্য প্রদান কিংবা তথ্য গোপন করে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার আইনি সুযোগ রয়েছে। সামিটের ক্ষেত্রে সেই বিধানই প্রয়োগের প্রস্তুতি চলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি আগস্ট মাসের মধ্যেই সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হতে পারে।
দুই হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ: এনবিআরের প্রায় দুই বছরের অনুসন্ধানে সামিট গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে বিপুল অঙ্কের কর ফাঁকির তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে আসা কর ফাঁকির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সিঙ্গাপুরে শীর্ষ ধনী আজিজ খান: সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুরের অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সামিটের ব্যবসা বিস্তৃত। বিভিন্ন সময়ে গ্রুপটির ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে করসংক্রান্ত অনুসন্ধান নতুন করে বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি ও জবাবদিহির কাঠামোতে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সামিটের করসংক্রান্ত বিষয়গুলোও নতুন করে পর্যালোচনায় আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান: এনবিআরের সাবেক সদস্য খাইরুল ইসলাম বলেন, ফৌজদারি আইনের বিধান অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং কমপক্ষে ছয় মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান থাকতে পারে।
তবে তার মতে, শুধু মামলা ও শাস্তির দিকে না তাকিয়ে সরকারের পাওনা কর দ্রুত আদায়ের বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, কর ফাঁকির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
এদিকে এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, সামিটের বিরুদ্ধে চলমান করসংক্রান্ত কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রমাণিত অনিয়মের ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে। ফলে এখন নজর থাকবে—চলতি মাসেই সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয় কি না এবং হলে মামলায় কী কী অভিযোগ আনা হয় তার ওপর।






