৩০ কোটি টাকা’অবৈধ আয়ের অভিযোগ
১৯৭ নির্বাহী প্রকৌশলীর পদোন্নতিতে ‘অর্থ লেনদেন’জনপ্রতি পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা
পোস্টিংয়ে ১০–২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পর্যায় থেকে প্রায় ১৩৫ কর্মকর্তার পদোন্নতিতেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
জুনিয়র কর্মকর্তাকে সিনিয়রিটি দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়া
প্রশাসন শাখার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
পোস্টিং পেতে সাভারে ১৫ লাখ, জাজিরায় ১০ লাখ ও বাবুগঞ্জে পাঁচ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে
বিশেষ প্রতিবেদক : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) পদোন্নতি, বদলি, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও নিয়োগকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার উঠে আসছে সংস্থাটির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী (প্রশাসন) শফিকুর রহমানের নাম। প্রধান অভিযোগসমূহ: পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন, পোস্টিং-বদলিতে লাখ লাখ টাকার লেনদেনে, নিয়োগ বাণিজ্যে দেড় কোটি টাকার সমঝোতা,. বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। বিদেশে নিয়মিত যাতায়াত, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী পদে ১৯৭ কর্মকর্তার পদোন্নতির ক্ষেত্রে জনপ্রতি পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেন হয়েছে। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা, প্রকল্প ও কর্মস্থলে পোস্টিং পেতে কোনো কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
৩০ কোটি টাকা’অবৈধ আয়ের অভিযোগ : শফিকুর রহমানকে ঘিরে অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো প্রায় ৩০ কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জনের দাবি। একই অভিযোগে ‘সোহেল’ নামের একজনের বিরুদ্ধে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা এবং ‘মান্নান’ নামের একজনের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ লাখ টাকা অবৈধভাবে উপার্জনের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মাত্র এক কোটি টাকা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিপুল সম্পদের অভিযোগ : শফিকুর রহমানকে ঘিরে আরও অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ চাকরিজীবনে তিনি অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। বিদেশে নিয়মিত যাতায়াত, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত ব্যয়ের উদাহরণ হিসেবে ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকার একটি সেলুন ও স্পা একবারে প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয়ের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগেও দুর্নীতি তদন্তে নাম উঠেছিল : শফিকুর রহমানকে ঘিরে অভিযোগ নতুন নয় বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের ভাষ্য, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরেও এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের সময় তার নাম আলোচনায় আসে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে এলজিইডির দুর্নীতি তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন মাঠে নামে বলেও দাবি করা হয়েছে। ওই সময় বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সাবেক প্রধান প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তদন্তের কথা উঠে আসে। তবে আগের তদন্তে শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তার কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা সিদ্ধান্তের নথি পাওয়া গেলে সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
১৯৭ নির্বাহী প্রকৌশলীর পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ : অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এলজিইডিতে ১৯৭ কর্মকর্তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় জনপ্রতি পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে- মোট অর্থের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকায় দাঁড়ায়। কইভাবে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পর্যায় থেকে প্রায় ১৩৫ কর্মকর্তার পদোন্নতিতেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
সার্ভেয়ারদের মধ্য থেকেও কয়েকজনকে সরকারি প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে চার থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার স্বাভাবিক মানদণ্ড পাশ কাটিয়ে কোনো কোনো জুনিয়র কর্মকর্তাকে সিনিয়রিটি দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ ধরনের সুবিধা পেতে কোনো কোনো কর্মকর্তাকে সাত থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে।
পোস্টিং-বদলিতেও লাখ লাখ টাকার অভিযোগ: এলজিইডিতে শুধু পদোন্নতি নয়, গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে বদলি ও পদায়ন নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পোস্টিং পেতে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। বরিশাল সদর উপজেলা থেকে ‘কামাল’ নামের এক কর্মকর্তাকে বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পদে পদায়নের ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। একইভাবে জাজিরায় সহকারী প্রকৌশলী পদে পোস্টিংয়ের জন্য ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসন শাখাকে ঘিরে যত প্রশ্ন: অভিযোগের কেন্দ্রে বারবার উঠে আসছে এলজিইডির প্রশাসন শাখার কয়েকজন কর্মকর্তার নাম। তাদের মধ্যে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিকুর রহমানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর শাখায় দায়িত্ব পালনের সুবাদে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির বিভিন্ন নথি প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন প্রধান প্রকৌশলীর সময়েও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদায়ন ও পদোন্নতিকে ঘিরে তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের সময় প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে শফিকুর রহমানের প্রভাব ছিল এবং অর্থ ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী বেলাল খানের সময়ও প্রশাসন ঘিরে কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে প্রভাব বিস্তার ও অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
নিয়োগ বাণিজ্যে দেড় কোটি টাকার ‘সমঝোতা র অভিযোগ : অতীতের নিয়োগ ও পদোন্নতি ঘিরেও শফিকুর রহমানকে নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের সময়ে ‘আব্দুল ওহাব’ নামের এক ব্যক্তি সরাসরি শফিকুর রহমানের বাসায় গিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার সমঝোতা করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই দেড় কোটি টাকার মধ্যে—১ কোটি টাকা সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের জন্য; ৩০ লাখ টাকা শফিকুর রহমানের জন্য; অবশিষ্ট অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ভাগ হওয়ার কথা ছিল।
১২ কর্মকর্তার পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ : অভিযোগের আরেক অংশে শফিকুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) সাইফুল কবির, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিম এবং ‘ওহাব গ্রুপ’-সংশ্লিষ্ট ১২ জন পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিধিমালা ও জ্যেষ্ঠতার প্রশ্ন উপেক্ষা করে এসব কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ কোটি টাকার বেতন-ভাতার চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে নিয়োগবিধি অনুসরণ করেও যোগ্য অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
একই চক্র’ বছরের পর বছর: অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিম, রশীদ মিয়া ও আনোয়ার হোসেনের সময়েও বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। তাদের দাবি, নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও প্রশাসন, বদলি-পদায়ন, পদোন্নতি, কেনাকাটা ও নিয়োগকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী বলয়ের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে অভিযোগের পুনরাবৃত্তি: শফিকুর রহমানকে ঘিরে অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের সময়ও তার নাম উঠে আসে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে এলজিইডির দুর্নীতি তদন্তে মাঠে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের উপপরিচালক আজিজুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়。 সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান, আলী আকতার হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মঞ্জুর আলী, নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রউফের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। এই তদন্তে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী (প্রশাসন) শফিকুল ইসলামের সঙ্গে শফিকুর রহমানের নামও উঠে আসে। ২০১০ সাল থেকে অদ্যাবধি যত নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও পদায়ন হয়েছে তার কপি চেয়ে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী আবদুর রশিদ মিয়াকে চিঠি দিয়েছে দুদকের টিম। ২০২৫ সালের মে মাসে এলজিইডির প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করে আত্মসাতের অভিযোগে দুদক এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালায়। সম্প্রতি দুদক এলজিইডির ৩৬টি অফিসে একযোগে অভিযান চালিয়েছে।
শফিকুর রহমানের বক্তব্য: অভিযোগগুলোর বিষয়ে দৈনিক বাংলার গৌরবের পক্ষ থেকে একাধিকবার শফিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রতিবেদনের প্রশ্নও পাঠানো হয়। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এলজিইডির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে পদোন্নতি, বদলি-পদায়ন, নিয়োগ ও সরকারি ক্রয়কে কেন্দ্র করে ধারাবাহিকভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী (প্রশাসন) শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির বিষয় নয়; বরং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সক্ষমতা, মেধাভিত্তিক পদোন্নতি এবং জনগণের অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর সরাসরি আঘাত।






