নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার মাত্র তিন মাস সাত দিন পরই বন্ড সুবিধায় বিপুল পরিমাণ কাপড় আমদানি—তারপর সেই কাপড়ের বড় অংশ খোলাবাজারে বিক্রি। অভিযোগ উঠেছে, বন্ড লাইসেন্স যেন “আলাদিনের চেরাগ” হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের আকবর শাহ এলাকার মেসার্স এএমটি ফ্যাশন বিডি-এর জন্য। ঘষা দিলেই বের হয়েছে শুল্কমুক্ত কাপড়, আর তা চলে গেছে উন্মুক্ত বাজারে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—লাইসেন্স পাওয়ার ৯৭ দিনের মাথায় প্রতিষ্ঠানটি ৬৫৯.৭৯ মেট্রিক টন ওভেন ফেব্রিক্স আমদানি করে, যার মধ্যে ৪০৭.৮০ মেট্রিক টন কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ। লাইসেন্স পেল ২০ অক্টোবর, অভিযান ২৮ জানুয়ারি : চট্টগ্রামের ঈঁশা মহাজন রোড, উত্তর কাট্টলি, আকবর শাহ এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটিকে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর শতভাগ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে বন্ড লাইসেন্স দেয় চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। লাইসেন্স পাওয়ার পরপরই শুরু হয় বন্ড সুবিধায় কাপড় আমদানি। কিন্তু তিন মাসের মাথায়ই বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের তথ্য পায় কর্তৃপক্ষ। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় সাত সদস্যের একটি নিবারক দল গঠন করে ২৮ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান চালানো হয়।
ইন-টু-বন্ড রেজিস্টার নেই, মজুদের হিসাবও অদৃশ্য: অভিযানে গিয়ে বন্ড কর্মকর্তারা দেখতে পান— কাঁচামালের ইন-টু-বন্ড রেজিস্টার নেই, মজুদ সংক্রান্ত কোনো রেজিস্টার নেই, বন্ড গুদামে আমদানি করা কাপড়ের অস্তিত্ব নেই, রপ্তানির কোনো গ্রহণযোগ্য কাগজপত্র নেই, প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং পার্টনার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানান, তারা ইন-টু-বন্ড রেজিস্টার ব্যবহার করেন না। এই বক্তব্য কর্মকর্তাদের মতে, বন্দর থেকে খালাসের পর কাপড় সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রির ইঙ্গিত দেয়।
“চালু মেশিন” কৌশল- অন্যের কাপড়ে উৎপাদন: অভিযানের সময় কয়েকটি মেশিনে ২০–২৫ জন শ্রমিককে পোশাক তৈরি করতে দেখা যায়। প্রথমে মনে হয়েছিল আমদানি করা কাপড় দিয়েই উৎপাদন চলছে। কিন্তু পরে কর্মকর্তারা দেখেন, আমদানি করা ফেব্রিক্সের সঙ্গে উৎপাদনে ব্যবহৃত কাপড়ের মিল নেই। পরে প্রতিষ্ঠান স্বীকার করে—তারা অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা কাপড় দিয়ে উৎপাদন করছে। অর্থাৎ, নিজস্ব আমদানি করা কাপড় ব্যবহারই করা হয়নি। কাটিং ও সুইং সেকশনে মোট ৩,০৭৫ কেজি কাপড় দিয়ে উৎপাদন চলছিল, যা আমদানি করা কাপড়ের ধরন থেকে ভিন্ন।
৬৫৯ টন আমদানি, ৪০৭ টন উধাও: ২০ অক্টোবর থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯৭ দিনে প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করে—৬,৫৯,৭৯৩.৬০ কেজি (৬৫৯.৭৯ মেট্রিক টন) কাপড়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ টন আমদানি প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, ২৩৮ মেট্রিক টন কাপড় দিয়ে রপ্তানি করা হয়েছে। তবে কর্মকর্তাদের দাবি, এই রপ্তানি স্টক লটের কাগজ দিয়ে ভুয়া দেখানো হয়েছে। প্রায় ১৪১ মেট্রিক টন অপচয় দেখানো হয়েছে—যা অস্বাভাবিক উচ্চ হারে। কর্মকর্তাদের মতে, এই তথাকথিত “অপচয়” কাপড়ও বিক্রি করা হয়েছে। সব হিসাব শেষে ৪০৭.৮০ মেট্রিক টন কাপড় বন্ড গুদামে থাকার কথা থাকলেও তা পাওয়া যায়নি।
১৭.৮০ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ: খোলাবাজারে বিক্রি করা ৪০৭.৮০ মেট্রিক টন কাপড়ের— শুল্কায়নযোগ্য মূল্য: ২২ কোটি ৯৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৯ টাকা, প্রযোজ্য শুল্ককর: ১৭ কোটি ৮০ লাখ ১৭ হাজার ১৮৭ টাকা, এই বিপুল রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। একইসঙ্গে দাবিনামাসহ কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, “মাত্র তিন মাস আগে লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠান এই ধরনের অপকর্ম করবে, তা কল্পনাও করা যায় না। বেশিরভাগ কাপড় বিক্রি করে দিয়েছে। রপ্তানিও খতিয়ে দেখা হবে।”
প্রতিষ্ঠানের অস্বীকার: অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স এএমটি ফ্যাশন বিডির ম্যানেজিং পার্টনার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন খোলাবাজারে কাপড় বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “না না, বিক্রির প্রশ্নই আসে না। আমরা উৎপাদন করেছি, রপ্তানি করেছি।” রপ্তানির কাগজপত্র না পাওয়ার বিষয়ে বলেন, “কাগজপত্র তো আমাদের কমার্শিয়ালের কাছে থাকে।” অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে রপ্তানির তথ্য না থাকার প্রশ্নে তিনি বলেন, “কেন পাবে না, পাওয়ার তো কথা।” শিল্পমহলের ক্ষোভ: ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’
এই বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়ার পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “আমাদের মধ্যে কিছু ব্যবসায়ী শুধু বন্ডের অপকর্ম করার জন্য গার্মেন্টের সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন। এনবিআর দুই-একজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে অন্যরা সাবধান হয়ে যাবে।” তার মতে, কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠানের কারণে প্রকৃত রপ্তানিকারকরা ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং পুরো খাত অপবাদে পড়ছে।
প্রশ্নের মুখে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া : এখন বড় প্রশ্ন—একটি নামসর্বস প্রতিষ্ঠান কীভাবে এত দ্রুত লাইসেন্স পেল? বন্দর ও কাস্টমস থেকে বিপুল পরিমাণ কাপড় কীভাবে খালাস হলো? কারা ছিল এই প্রক্রিয়ায় সহায়ক? রপ্তানির ভুয়া তথ্য কীভাবে সিস্টেমে ঢুকল বা ঢোকানোর চেষ্টা হলো? বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ড লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা না হলে ‘হরিলুটের কারখানা’ হিসেবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ করা কঠিন হবে।
বন্ড সুবিধা মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা করার জন্য। কিন্তু যদি তা শুল্ক ফাঁকির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের রাজস্ব, সৎ ব্যবসায়ী এবং দেশের ভাবমূর্তি। এএমটি ফ্যাশন বিডির ঘটনায় ৯৭ দিনে ৪০৭ টন কাপড় উধাও হওয়ার অভিযোগ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়—এটি বন্ড ব্যবস্থাপনার নজরদারি, লাইসেন্সিং কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়—এই মামলার পরিণতি কী হয়, এবং আদৌ কি এটি বন্ড অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।





