টিকিট কেলেঙ্কারি, অর্থপাচার তদন্ত এবং আইনি নোটিশে উত্তাল ট্রাভেল খাত
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ ডেস্ক: বাংলাদেশের ট্রাভেল সেক্টরে একের পর এক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সাবেক মহাসচিব এবং সায়মন গ্রুপের কর্মকর্তা আফসিয়া জান্নাত সালেহ। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, আর্থিক জটিলতা, মিথ্যা তথ্য প্রচার, টিকিট কেলেঙ্কারি এবং অর্থপাচারের অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় বিষয়টি বর্তমানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ একাধিক দপ্তরে তদন্তাধীন।
লিগ্যাল নোটিশ- পদত্যাগ গোপন ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের অভিযোগ: ২০২৫ সালের ১১ মে আটাবের কার্যনির্বাহী পরিষদের পদত্যাগকারী সদস্য সবুজ মুন্সীর পক্ষে অ্যাডভোকেট মো. সেলিম মিয়া একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠান আফসিয়া জান্নাত সালেহ’র কাছে। নোটিশে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হয়-পদত্যাগ গোপন করার অভিযোগ : সবুজ মুন্সী জানান, সাধারণ সদস্যদের অভিযোগে বিব্রত হয়ে তিনি ২৪ এপ্রিল পদত্যাগ করেন, ২৬ এপ্রিল জরুরি সভায় পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়। অথচ একই দিনে আফসিয়া জান্নাত সালেহ আটাবের পক্ষে যে প্রেস রিলিজটি দেন, সেখানে পদত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ না করে তাকে “অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে” বলে উপস্থাপন করা হয়। এতে গণমাধ্যম বিভ্রান্ত হয়ে ভুল সংবাদ প্রকাশ করে এবং তার “সুনাম ও ব্যবসায়িক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়” বলে অভিযোগ।
তদন্ত কমিটির চিঠির ভাষা বিকৃতি করার অভিযোগ: প্রেস রিলিজে বলা হয়, সবুজ মুন্সী “টিকিট সিন্ডিকেট, নামহীন টিকিট বুকিং, কৃত্রিম সংকট তৈরি ও চড়া দামে বিক্রির অভিযোগে” তদন্তাধীন। কিন্তু নোটিশে দাবি করা হয়, তদন্ত কমিটির চিঠিতে “সিন্ডিকেট, মজুদদার, কালোবাজারি” শব্দগুলো ছিল না। অতিরিক্ত নেতিবাচক শব্দ যুক্ত করে সবুজ মুন্সীর ব্যবসায়িক ক্ষতি সাধন করা হয়েছে।
আইনগত হুঁশিয়ারি: নোটিশে বলা হয়, আফসিয়া জান্নাত সালেহ ৭ কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা না দিলে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২৫/২৯/৬২ ধারা। এবং দণ্ডবিধি ৫০০/৪২০ ধারায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা করা হবে। সায়মন ওভারসীজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে ১৬ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ আসে যে. সায়মন ওভারসীজ লিমিটেড ডিডিএস/জিডিএস আইডি ব্যবহার করে। মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিদেশি এজেন্টের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করেছে। তদন্তে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১,৮৯৪টি আন্তর্জাতিক টিকিট বিক্রি করা হয়। এসব টিকিটের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা। যাত্রীরা বিদেশে টাকা পরিশোধ করলেও এ অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আসেনি-এ অভিযোগেই তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, এভাবে দেশের রিজার্ভে যুক্ত হওয়ার কথা থাকা টাকা দেশে না এনে বিদেশেই ধরে রাখা হয়েছে, যা অর্থপাচারের সম্ভাব্য প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জিডিএস আইডি ব্যবহারের নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ: একাধিক ট্রাভেল এজেন্সির মতে, জিডিএস আইডি শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু সায়মন ওভারসীজ তাদের আইডি বিদেশি এজেন্টদের কাছে দিয়েছে। এতে বিদেশে বিক্রি হওয়া টিকিটের টাকা আইএটিএর মাধ্যমে দেশে ফেরেনি। এ কারণে মন্ত্রণালয় থেকে আফসিয়া জান্নাত সালেহ’র কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়-পদত্যাগ-টিকিট সিন্ডিকেট: ২০২৫ সালের আগস্টে অভিযোগ উঠেছিল, আটাবের সভাপতি ও মহাসচিবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, আর্থিক অস্বচ্ছতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার। এ প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় আটাব কমিটি বাতিল করে। এর পর থেকেই আফসিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ দৃশ্যমান হয়।
ট্রাভেল খাতে অস্থিরতা-একটি বড় ধাক্কা : দু’দিকে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, লিগ্যাল নোটিশ, সরকারি তদন্ত এবং আর্থিক অনিয়মের তথ্য, এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে ট্রাভেল খাতে অস্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার চিত্র আরও প্রকট হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিডিএস আইডির বিদেশে ব্যবহার, লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের বাইরে টিকিট বিক্রি, রেমিটেন্স ফাঁকি এবং ট্রাভেল সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, এসবই খাতটিকে বারবার সংকটে ফেলছে। অভিযোগ-তদন্ত-সবকিছু এখনো চলমান মন্ত্রণালয়ের তদন্ত সম্পন্ন হয়নি। জিডিএস-জড়িত আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আটাবের অভ্যন্তরীণ সংকটও পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি। সুতরাং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা দায় নির্ধারণ এখনো হয়নি।
অভিযোগ সম্পর্কে আফসিয়া জান্নাত সালেহর অবস্থান: তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, “মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা চেয়েছে, আমরা ব্যাখ্যা দিয়েছি।” “যিনি অভিযোগ দিয়েছেন তিনি টিকিট সিন্ডিকেটের সদস্য-সরকারি মামলার এক নম্বর আসামি। “এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং প্রতিহিংসামূলক।” “সব নথি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন, আটাবে মহাসচিব থাকাকালে তিনি টিকিট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কাজ করেছিলেন। তাই “প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে মানহানির উদ্দেশ্যে” অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি ১৪ ডিসেম্বর একটি চিঠি দিয়ে জানান সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলো। কিন্তু এ কাগজ বের করতে কী পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়েছে, তা আড়ালেই থেকে গেলো বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র: দৈনিক বাংলার গৌরব





