480
ঢাকাশনিবার , ১৮ জুলাই ২০২৬
  1. অনুসন্ধানী ও বিশেষ প্রতিবেদন
  2. অপরাধ-আইন ও আদালত
  3. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প
  4. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প-ব্যাংক-বীমা-নন ব্যাংক
  5. আইটি, টেলিকম ও ই-কমার্স
  6. আবাসন-ভূমি-রাজউক-রিহ্যাব
  7. উদ্যোক্তা-জীবনী
  8. করপোরেট ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
  9. কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ
  10. গণমাধ্যম
  11. গৃহায়ন ও গণপূর্ত
  12. জনশক্তি ও পর্যটন
  13. জনসংযোগ-পদোন্নতি ও সম্মাননা
  14. জাতীয়
  15. দুর্ঘটনা-শোক-দুর্যোগ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চিফ ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

https://www.uddoktabangladesh.com/wp-content/uploads/2024/03/aaaaaa.jpg
বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা :
জুলাই ১৮, ২০২৬ ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বিশেষ প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকারী এবং বর্তমানে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী (চিফ ইঞ্জিনিয়ার) হিসেবে কর্মরত প্রকৌশলী আব্দুল বারেককে ঘিরে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। একজন সরকারি চাকরিজীবী প্রকৌশলী কীভাবে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন—তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে বলেও জানা গেছে। এই প্রতিবেদনে আব্দুল বারেকের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ওঠা অভিযোগ, সম্পদ অর্জনের উৎস নিয়ে প্রশ্ন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য তুলে ধরা হলো-

বর্তমান দায়িত্ব ও কর্মজীবন: গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, আব্দুল বারেক বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী (চিফ ইঞ্জিনিয়ার)। একই সঙ্গে তিনি এলজিইডির সারাদেশে খাল-পুকুর উন্নয়ন প্রকল্প (আইপিসিপি)-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি- এলজিইডির নগর শাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (আইইউজিআইপি)-এর প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। গাজীপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে-একজন সরকারি চাকরিজীবী প্রকৌশলী, যার মাসিক বেতন-ভাতা সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে, তিনি কীভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন?

টেন্ডার দুর্নীতির অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, আইইউজিআইপি প্রকল্পের পরিচালক থাকাকালে আব্দুল বারেক প্রায় ১২০টি টেন্ডার অনুমোদন দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি টেন্ডার থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে ঘুষের পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি টাকা। এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।

গাজীপুরে সরকারি জমি দখল ও রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগ : গাজীপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রায় ৫ বিঘা জমির ওপর একটি রিসোর্ট নির্মাণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে-রিসোর্টটি সরকারি জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে। এর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা। প্রশ্ন উঠেছে, এই জমি ও রিসোর্ট নির্মাণের অর্থের উৎস কী?

আইইউজিআইপি প্রকল্পে অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ: অভিযোগ অনুযায়ী, এডিবির আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আব্দুল বারেক আইইউজিআইপি প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর-প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই পুরোনো ১৮৩ জন কর্মীকে বাদ দেওয়া হয়। নতুন করে ২২৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। যদিও আব্দুল বারেক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, এলজিইডির একাধিক সূত্র অভিযোগগুলোর ভিত্তি রয়েছে বলে দাবি করেছে।

ঘুষ না পেলে কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ : ২০২২ সালে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় এলজিইডির একটি সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ঘুষ না পাওয়ায় কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী- কাজ পাইয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। অভিযোগে উপজেলা প্রকৌশলী মো. বিল্লাল হোসেন সরকারের নাম আসে।

সে সময় গাজীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে আব্দুল বারেক অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকেই দোষারোপ করেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প পরিচালক পদে ফিরে আসার চেষ্টা। দুর্নীতির অভিযোগের পর আব্দুল বারেককে আইইউজিআইপি প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে পরে তিনি আবার ওই পদে ফেরার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রথম পর্যায়-তোফায়েল আহমেদের নিয়োগ ও বাতিল: ২০২৫ সালের ৪ মে মো. তোফায়েল আহমেদকে আইইউজিআইপি প্রকল্পের পরিচালক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে-এই নিয়োগের জন্য দুই দফায় মোট ৬ কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল। তবে এডিবির আপত্তির মুখে মাত্র দুই দিনের মাথায় সেই নিয়োগ বাতিল হয়। পরে আব্দুল বারেক আবারও প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান।

দ্বিতীয় পর্যায়- ‘বিল্লাল মাস্টার’-এর মাধ্যমে ফেরার চেষ্টা: অভিযোগ অনুযায়ী, এলজিআরডি উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বাবা মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন (বিল্লাল মাস্টার)-কে এক কোটি টাকা দিয়ে আবারও আইইউজিআইপি প্রকল্পে ফিরে আসার চেষ্টা করেছিলেন আব্দুল বারেক। তবে শেষ পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন সিদ্ধান্তে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান মো. তোফায়েল আহমেদ।

অবৈধ সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন: আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো-সরকারি চাকরির বেতন-ভাতা দিয়ে তার বর্তমান সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। অভিযোগ অনুযায়ী-১২০টি টেন্ডার থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা ঘুষ। গাজীপুরে ৫ বিঘা জমির ওপর রিসোর্ট। কর্মী নিয়োগে ঘুষ গ্রহণ। প্রকল্প পরিচালক পদে ফেরার জন্য এক কোটি টাকা লেনদেনের চেষ্টা।

সমালোচকদের প্রশ্ন, একজন সরকারি প্রকৌশলী চাকরিজীবনে যে পরিমাণ বেতন পান, জীবনযাত্রার ব্যয় বাদ দিলে তার মাধ্যমে এমন বিপুল সম্পদ অর্জন কীভাবে সম্ভব?

দুদকের তদন্ত : আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে। তবে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গাজীপুরে দুদকের গণশুনানিতে ভূমি-সংক্রান্ত ২৪টিসহ প্রায় ১০০টি অভিযোগ উত্থাপিত হয়। সরকারি জমি দখলের অভিযোগও এসব আলোচনার অংশ ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে, গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধেও দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে তদন্ত কতটা কার্যকরভাবে এগোবে?

এলজিইডিতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় এলজিইডিকে “দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ” ধারণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় যেসব বিষয় উঠে এসেছে-নিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বা দলীয় প্রভাব। দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব।

প্রকল্প তদারকিতে দুর্বলতা। কাজের গুণগত মান ও অর্থব্যয়ে অনিয়ম। বাজারদরের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যয় নির্ধারণ, যা দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে। সমালোচকদের মতে, আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এই প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যারই প্রতিফলন।

সুপারিশ : সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের মতে-দুদকের অনুসন্ধান দ্রুত শেষ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। অবৈধ সম্পদ চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। এডিবি ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এলজিইডিতে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বাধীন অডিট ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে টেন্ডার ঘুষ, সরকারি জমি দখল, নিয়োগ বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রকল্প পরিচালক পদে ফিরে আসতে প্রভাব খাটানোর মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সত্যতা নির্ধারিত হবে। জনগণের অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সুশাসনকর্মী ও সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা।

এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল বারেকের কাছে জানতে চাইলে বলেন, আমি কাজে ব্যস্ত আছি, পরে জানাবো। কিন্তু এরপর একাধিকবার ফোন, হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ, নিউজ এর বক্তব্য চেয়ে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোন বক্তব্য বা উত্তর আসেনি। এরপর একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।