480
ঢাকাশুক্রবার , ১২ ডিসেম্বর ২০২৫
  1. অনুসন্ধানী ও বিশেষ প্রতিবেদন
  2. অপরাধ-আইন ও আদালত
  3. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প
  4. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প-ব্যাংক-বীমা-নন ব্যাংক
  5. আইটি, টেলিকম ও ই-কমার্স
  6. আবাসন-ভূমি-রাজউক-রিহ্যাব
  7. উদ্যোক্তা-জীবনী
  8. করপোরেট ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
  9. কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ
  10. গণমাধ্যম
  11. গৃহায়ন ও গণপূর্ত
  12. জনশক্তি ও পর্যটন
  13. জনসংযোগ-পদোন্নতি ও সম্মাননা
  14. জাতীয়
  15. দুর্ঘটনা-শোক-দুর্যোগ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে দুই প্রকল্পের ‘সম্রাট’ তালহা জুবাইর

https://www.uddoktabangladesh.com/wp-content/uploads/2024/03/aaaaaa.jpg
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ ডেস্ক:
ডিসেম্বর ১২, ২০২৫ ১১:১০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

 নিয়ম ভেঙে ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা কীভাবে পিডি
 বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে মিছিল, তবু প্রমোশন
 টিস্যু কালচার নয়, ‘টাকা কালচার’
 দুই প্রকল্পেই ভুয়া বিল-ভাউচারের গরম বাজার
 রাজনৈতিক রং বদলে ‘রামরাজত্ব’
 ‘দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন’ পিডির দাপটে প্রকল্প মুখ থুবড়ে
 প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা, দায় এড়াচ্ছে মন্ত্রণালয়

বিশেষ প্রতিনিধি : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে প্রকল্প পরিচালকদের বেপরোয়া ঘুষ-দুর্নীতির কারণে মুখ থুবড়ে পড়ছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম। এর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) তালহা জুবাইর মাসরুর। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়ম ভেঙে পিডির পদ বাগিয়ে নেওয়ার পর থেকে ‘মিস্টার ১০%’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন অধিদপ্তরের ভেতরেই। অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, তাঁর নেতৃত্বে শুধু টিস্যু কালচার প্রকল্পই নয়, ফার্মার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ (ছোট হিমাগার) প্রকল্পেও চলছে হরিলুট, ভুয়া বিল-ভাউচারের খেলায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নিয়ম ভেঙে ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা কীভাবে পিডি? : উন্নয়ন প্রকল্পের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালক হওয়ার কথা বিসিএস কৃষি ক্যাডারের ৫ম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার। কিন্তু বাস্তবে সেই বিধানকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখিয়ে ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা তালহা জুবাইর মাসরুরকে পিডি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ আর ক্ষমতাসীন ‘লীগ’ ঘরানার রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়েই তিনি টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পিডির পদটি নিজের নামে পাকা করে নেন। শুধু এই প্রকল্পই নয়, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আরেকটি প্রকল্পে মনিটরিং অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পান তিনি। ফলে একাধারে দুই প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ চলে আসে এক ব্যক্তির হাতে। অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে বলেন, “ডিপিপিতে স্পষ্ট লেখা আছে, পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা পিডি হবেন। কিন্তু এখানে ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তাকে বসানো হয়েছে। এটা সরাসরি নিয়মভঙ্গ আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত না হলে কী?”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে মিছিল, তবু প্রমোশন : ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে রাজধানীর কৃষি খামারবাড়ি এলাকায় প্রকাশ্যে মিছিল-সমাবেশ হয়। অভিযোগ, ওই কর্মসূচির নেতৃত্বে ছিলেন পিডি তালহা জুবাইর।
ঐ সময়ের ‘ফ্যাসিস্ট লীগপন্থী’ পরিচিতির এই পিডির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট কার্যকলাপের অভিযোগ উঠলেও, পরবর্তীতে অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়েন; কিন্তু তালহা জুবাইরের বিরুদ্ধে প্রকৃত কোনো ব্যবস্থা তো নেওয়া হয়নি, বরং তাঁকে আরও একটি নতুন প্রকল্পের পিডি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এক সিনিয়র কর্মকর্তা দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে বলেন, “ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতায় প্রকাশ্যে মিছিল করেও তিনি পুরোনো পদে বহাল, আবার নতুন প্রকল্পের পিডিও হয়েছেন। এটা যদি পুরোদস্তুর রাজনৈতিক পুরস্কার না হয়, তাহলে আর কী?”
টিস্যু কালচার নয়, ‘টাকা কালচার’ : সূত্র জানায়, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পে বাস্তব উন্নয়ন খুব একটা চোখে না পড়লেও, পিডি তালহা জুবাইরের ব্যক্তিগত আর্থিক উন্নয়ন নিয়ে অধিদপ্তরে এখন গল্প-কথা চলে প্রকাশ্যে। অভিযোগ, আনুষঙ্গিক খাতে কোটেশন দেখিয়ে, ভুয়া বিল-ভাউচার বানিয়ে, মেরামত-সংস্কার, নির্মাণ ও বিভিন্ন কেনাকাটার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। অধিদপ্তরের ভেতরে তাঁর আরেকটি পরিচিত নাম—‘মিস্টার ১০%’। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি কাজ, সরবরাহ অর্ডার বা বিল পাস—যে কোনো ক্ষেত্রেই ‘কমিশন’ ছাড়া ফাইল এগোয় না। এক কর্মকর্তা দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে বলেন, “ফাইলে যদি তালহা সাহেবের সাইন লাগে, তাহলে সবাই বোঝে—ওপর থেকে কিছু নামাতে হবে। তাই অনেকে এখন ওঁকে ‘মিস্টার ১০%’ বলে ডাকে।”
দুই প্রকল্পেই ভুয়া বিল-ভাউচারের গরম বাজার: শুধু টিস্যু কালচার প্রকল্পই নয়, ফার্মার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ / ছোট হিমাগার প্রকল্পেও একই কায়দায় চলছে অনিয়ম—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সংস্কার ও মেরামত কাজের ভুয়া বিল তৈরি, বাজারদরের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি দামে সরঞ্জাম ক্রয় দেখানো, একই কাজকে একাধিক খাতে দেখিয়ে বিল তোলা, ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, কর্মশালা—এসব সফট খাতে অতিরঞ্জিত ব্যয় দেখানো, এসবের মাধ্যমে লক্ষ-কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তালহা জুবায়েরের বিরুদ্ধে। আরেক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, “টিস্যু কালচার প্রকল্পের ল্যাব, গবেষণা, টেকনিক্যাল পার্ট নিয়ে যতটা কথা হওয়ার কথা, তার চেয়ে বেশি আলোচনা হয় বিল-ভাউচার, এস্টিমেট আর কমিশন নিয়ে।”
রাজনৈতিক রং বদলে ‘রামরাজত্ব’ : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভেতরের সূত্র বলছে, পতিত লীগ সরকারের আমলে তালহা জুবাইর ছিলেন ‘লীগ-ঘনিষ্ঠ’ কর্মকর্তা। সেই পরিচয়কে পুঁজি করেই তিনি প্রকল্পের পিডি হয়েছেন, সিন্ডিকেট গড়েছেন, কর্মকর্তাদের ওপর ‘ত্রাস’ তৈরি করেছেন। এখন আবার অন্তবর্তী সরকারের সময়ে তিনি নিজেকে বিএনপি-ঘেঁষা বলে প্রচার করছেন, এমন কথাও ঘুরছে অধিদপ্তরের করিডোরে। অভিযোগ, বর্তমান কৃষি উপদেষ্টার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার গল্প সাজিয়ে তিনি একইভাবে প্রভাব খাটাচ্ছেন, যাতে আগের দুর্নীতির হিসাব কেউ তুলতে না পারে। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে বলেন, “আগে ছিলেন লীগের দোসর, এখন বলেন—উপরের নতুন মহল নাকি তাঁর খুব আপন। যারাই ক্ষমতায় থাকুক, উনি তাদের নাম ব্যবহার করে নিজের রাজত্ব চালান।”
‘দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন’ পিডির দাপটে প্রকল্প মুখ থুবড়ে : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভেতরে কথিত আছে—দুর্নীতির কারণে ‘চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে চিহ্নিত তিন পিডির অন্যতম তালহা জুবাইর। তাঁর বেপরোয়া ঘুষ-দুর্নীতির কারণে টিস্যু কালচার প্রকল্পের মূল কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে। মাঠপর্যায়েও প্রকল্পের দৃশ্যমান সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক কর্মকর্তা। অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রকল্পের টাকায় কৃষকের উন্নয়ন হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—প্রকল্পের উন্নয়ন কম, পিডি সাহেবের উন্নয়ন বেশি।” আরও একজন মন্তব্য করেন, “এভাবে চলতে থাকলে প্রকল্পগুলো ধ্বংসের দারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়াবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও মাঠে কোনো ফল আসবে না।”
প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা, দায় এড়াচ্ছে মন্ত্রণালয় : ঘুষ, অনিয়ম, পদোন্নতিতে নিয়মভঙ্গ, ভুয়া বিল-ভাউচার, রাজনৈতিক পক্ষপাত—এমন অসংখ্য অভিযোগ জমা থাকলেও, কৃষি মন্ত্রণালয় এখনো পর্যন্ত তালহা জুবাইরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি।
মন্ত্রণালয়ের এ নীরবতা নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছেন অধিদপ্তরের ভেতরের সৎ কর্মকর্তারা। তাদের ভাষায়, “দুর্নীতির অভিযোগে ছোট-খাটো কর্মকর্তাকে সহজেই ওএসডি করা হয়। কিন্তু প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার খেলায় যাদের নাম উঠে আসে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তও হয় না—এটা কি তবে প্রভাবশালীদের সুরক্ষা বলয় নয়?”
এখনই ব্যবস্থা না নিলে কী হবে? অভিযোগ-আলাপ, গুঞ্জন-ফাইল—সব মিলিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে এখন একটা কথাই ঘুরছে, “তালহা জুবায়েরের দুনীতি এখন চরমে, এখনই থামাতে না পারলে ধ্বংসের মুখে পড়বে প্রকল্পগুলো।” স্বচ্ছ তদন্ত, প্রকল্প ব্যয়ের পূর্ণ অডিট, ডিপিপি-বহির্ভূত সিদ্ধান্তের জবাবদিহি এবং পদের শর্তভঙ্গের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা—এই চারটি দাবি তুলছেন সৎ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মহল। কৃষি মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং অন্তবর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকরা এখন এই অভিযোগের মুখে কী পদক্ষেপ নেন, তার ওপরই নির্ভর করবে-কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্পগুলো কৃষকের উপকারে যাবে, নাকি কিছু সিন্ডিকেটধারীর ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির উপকরণ হয়েই থেকে যাবে।
এসব বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের তিনি বলেন, আপনারা সংবাদ করেন, কিছু আসবে-যাবেনা। আপনি সংবাদ করেন, তাতে কিছু আসে-যায় না। আমাকে দেয়া অভিযোগ সত্য না বললেন তিনি।