## সম্প্রসারণে ব্যাংকিং ঝুঁকি, বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য ও পরিবেশগত বিতর্ক।
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা : দেশের বৃহত্তম ইস্পাত প্রস্তুতকারক বিএসআরএম মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বছরে ১৫ লাখ টন উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন সমন্বিত হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিল কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার আমদানি প্রতিস্থাপন হবে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে এবং দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে। তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প ঘিরে ইতোমধ্যে অর্থায়ন, ব্যাংকিং ঝুঁকি, বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য, বিদ্যুৎ সংকট এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি শিল্পোন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি করলেও যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হলে এটি ভবিষ্যতে বাজারে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে।
ঋণের কাঠামো অস্বচ্ছ, বাড়ছে ব্যাংকিং ঝুঁকি: প্রকল্পটির অর্থায়নের বড় অংশ স্থানীয় ব্যাংকের কনসোর্টিয়াম ও বিএসআরএমের নিজস্ব ইক্যুইটির মাধ্যমে করার পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট ঋণ কাঠামো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত ঝুঁকি কতটুকু হবে, তা স্পষ্ট নয়। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এত বড় অঙ্কের ঋণ সীমিতসংখ্যক ব্যাংকের ওপর কেন্দ্রীভূত হলে ক্রেডিট কনসেনট্রেশন ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ঋণকেন্দ্রিক ঝুঁকির বিষয়টি আগেই উঠে এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব বা ব্যয় বৃদ্ধি পেলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও চাপে পড়তে পারে।
বাজারে একচেটিয়া আধিপত্যের আশঙ্কা: বর্তমানে দেশের ইস্পাত বাজারে বিএসআরএম অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বাজারের প্রায় ২৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব একাই প্রতিষ্ঠানটির হাতে। আবার চারটি বড় কোম্পানি মিলে নিয়ন্ত্রণ করছে মোট বাজারের ৫৩ শতাংশ। নতুন সমন্বিত ফ্ল্যাট স্টিল কারখানা চালু হলে বিএসআরএমের বাজার নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রতিযোগিতা বিশ্লেষকরা। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিএসআরএম আমদানিকৃত হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিলের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১০ বছরের নীতিগত সুরক্ষা চেয়েছে। এমন সুবিধা দেওয়া হলে নতুন উদ্যোক্তাদের বাজারে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়বে এবং ভোক্তাদের জন্য মূল্য প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও বাজারে একচেটিয়া পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যুতের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা, উৎপাদনে অনিশ্চয়তা। প্রকল্পটিতে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (EAF) প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে, যা গ্যাসের পরিবর্তে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎনির্ভর। যদিও এই প্রযুক্তিকে তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব বলা হয়, তবে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে অস্থিরতা এবং শিল্পখাতে বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। গ্রিডে সামান্য সমস্যা দেখা দিলেও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশ নিয়ে পুরোনো অভিযোগ আবারও সামনে: বিএসআরএম দাবি করছে, নতুন প্রযুক্তিতে কার্বন নির্গমন কম হবে। তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, শুধু কার্বন কমলেই পরিবেশগত ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। ধুলো, শিল্পবর্জ্য, বর্জ্যজল, তাপীয় দূষণ এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনও বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে ২০২১ সালে মিরসরাইয়ে বিএসআরএমের গভীর নলকূপের মাধ্যমে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন করেছিলেন। তাদের দাবি ছিল, এলাকার পানির স্তর ৫০–৭০ ফুট থেকে নেমে প্রায় ১৫০ ফুটে পৌঁছে যায়, যার ফলে সাধারণ মানুষ পানির সংকটে পড়েন। নতুন প্রকল্পেও একই ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হবে কি না, সে প্রশ্ন এখনও অনুত্তরিত। স্থানীয় জনগণ ও শ্রমিকদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত? বিশাল শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ভূমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় জনগণের পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ, কর্মসংস্থান এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়া এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে স্থানীয় অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় বিএসআরএম: বিএসআরএম গ্রুপের ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষ হলে এবং সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দিলে মূল নির্মাণকাজ শুরু হবে। তার দাবি, স্থানীয়ভাবে হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিল উৎপাদন শুরু হলে ডাউনস্ট্রিম শিল্পের ভ্যালু চেইন আরও শক্তিশালী হবে। তবে সরকারি সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্ব থাকলেও কোনো ধরনের নীতিগত সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাজারে প্রতিযোগিতা ও ভোক্তার স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ: অর্থনীতি ও শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি— শুল্ক সুরক্ষা সীমিত সময়ের (৩–৫ বছর) মধ্যে রাখা। উৎপাদন অগ্রগতির ভিত্তিতে সরকারি সুবিধা প্রদান। ব্যাংক কনসোর্টিয়ামের জন্য বাধ্যতামূলক স্ট্রেস টেস্ট ও ধাপে ধাপে ঋণ বিতরণ। কঠোর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। বাজারে মূল্য পর্যবেক্ষণ ও প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যকর নজরদারি জোরদার করা। বিএসআরএমের ১০ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প দেশের ইস্পাত শিল্পে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় ধরনের ঝুঁকিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমদানি নির্ভরতা কমানো ও শিল্পায়নের লক্ষ্য যতই ইতিবাচক হোক, অস্বচ্ছ অর্থায়ন, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, বাজারে একচেটিয়া আধিপত্যের সম্ভাবনা, বিদ্যুৎ নির্ভরতা এবং পরিবেশগত উদ্বেগ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, শক্তিশালী নীতিগত শর্ত, স্বাধীন তদারকি এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না করে প্রকল্পটিকে অতিরিক্ত সুবিধা দিলে দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হতে পারে ভোক্তা, ব্যাংকিং খাত এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে। তাই প্রকল্প অনুমোদনের আগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।





