480
ঢাকামঙ্গলবার , ৭ জুলাই ২০২৬
  1. অনুসন্ধানী ও বিশেষ প্রতিবেদন
  2. অপরাধ-আইন ও আদালত
  3. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প
  4. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প-ব্যাংক-বীমা-নন ব্যাংক
  5. আইটি, টেলিকম ও ই-কমার্স
  6. আবাসন-ভূমি-রাজউক-রিহ্যাব
  7. উদ্যোক্তা-জীবনী
  8. করপোরেট ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
  9. কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ
  10. গণমাধ্যম
  11. গৃহায়ন ও গণপূর্ত
  12. জনশক্তি ও পর্যটন
  13. জনসংযোগ-পদোন্নতি ও সম্মাননা
  14. জাতীয়
  15. দুর্ঘটনা-শোক-দুর্যোগ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১২০ কোটির ভুয়া সম্পদ, ৪৪ কোটি টাকার ফান্ড উধাও

https://www.uddoktabangladesh.com/wp-content/uploads/2024/03/aaaaaa.jpg
অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
জুলাই ৭, ২০২৬ ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

কাগুজে সম্পদের ভিত্তিতে কাল্পনিক মুনাফা দেখিয়ে লভ্যাংশ আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির বিরুদ্ধে। অস্তিত্বহীন সম্পদ দেখানো, ব্যাংক তহবিলের গরমিল এবং আইনি ব্যয় গোপন করার মতো অনিয়মের কারণে গ্রাহকদের লাইফ ফান্ড এখন গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের বিমা খাতের আলোচিত এই প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক ও নজিরবিহীন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক বিবরণী এবং নিরীক্ষকদের গোপন প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ ভুয়া ও অস্তিত্বহীন সম্পদ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অনিয়ম ও কারচুপির ফলে প্রতিষ্ঠানটি এখন দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে, যা দেশের বিমা খাতের ওপর জনআস্থাকে বড় ধরনের আঘাত করেছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছে ৬১৮ কোটি টাকা। তবে নিরীক্ষক দল ও আর্থিক বিশ্লেষকদের চুলচেরা পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে এক নেপথ্য সত্য। এ প্রদর্শিত সম্পদের মধ্যে অন্তত ১২০ কোটি টাকার সম্পদের কোনো বাস্তব বা দৃশ্যমান অস্তিত্বই নেই। বিমা খাতের সুশাসন ও প্রচলিত হিসাববিজ্ঞান নীতিমালা অনুযায়ী, এ বিশাল অঙ্কের কাল্পনিক ও অস্তিত্বহীন সম্পদকে অবিলম্বে কোম্পানির ‘লাইফ ফান্ড’ বা জীবন তহবিল থেকে বাদ দেয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু রূপালী লাইফ কর্তৃপক্ষ তা করেনি, উল্টো এ অস্তিত্বহীন ১২০ কোটি টাকাকে লাইফ ফান্ডের অংশ হিসেবে ধরে ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত বা ‘সারপ্লাস’ প্রদর্শন করেছে।

শুধু কাগুজে হিসাবেই ভুয়া উদ্বৃত্ত দেখানো হয়নি; ওই কাল্পনিক মুনাফার ওপর ভিত্তি করেই কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা ও বিতরণ করেছে। অথচ প্রকৃত আর্থিক চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্থিক বিবরণী থেকে যদি অস্তিত্বহীন ১২০ কোটি টাকার সম্পদ লাইফ ফান্ড থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে প্রকৃত জীবন তহবিল নেমে আসে মাত্র ৩৭৭ কোটি টাকায়। এই তহবিলের বিপরীতে পলিসিধারীদের মোট দায় ৪৭২ কোটি টাকা সমন্বয় করলে উদ্বৃত্ত তো থাকেই না, বরং প্রায় ৯৮ কোটি টাকার বড় ধরনের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

হিসাববিদ ও বিমা বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্তিত্বহীন কাল্পনিক সম্পদ দেখিয়ে এভাবে কৃত্রিম উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস তৈরি করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আর্থিক অপরাধের শামিল। এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড একদিকে যেমন শেয়ারহোল্ডার ও সাধারণ পলিসিগ্রাহকের মৌলিক স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে, অন্যদিকে কোম্পানির প্রকৃত নাজুক আর্থিক অবস্থাকে আড়াল করে রাখে। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে কোম্পানির মূল তহবিল আকস্মিকভাবে সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনের অন্যতম বড় ধাক্কাটি এসেছে ব্যাংক জমার হিসাব থেকে। ২০২৪ সালের বার্ষিক আর্থিক নথিতে কোম্পানিটি দাবি করেছে যে, দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের মোট জমার পরিমাণ ৯১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এ হিসাবের বিস্তারিত বিবরণীতে দেখানো হয়েছে, কোম্পানির বিভিন্ন এসটিডি (STD) অ্যাকাউন্টে রয়েছে ৬৯ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং চলতি হিসাবে জমা রয়েছে ২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

তবে নিরীক্ষক দল যখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে বাস্তব যাচাই-বাছাই করে, তখন সামনে আসে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির চিত্র। তাদের অনুসন্ধানে দেখা যায়, রূপালী লাইফের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ মাত্র ৪৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা। অথচ কোম্পানির নথিতে উল্লেখিত হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেলে প্রায় ৪৪ কোটি টাকার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব, বৈধ রসিদ বা আইনি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, বিপুল এই অর্থ কার্যত উধাও। এ ধরনের বড় আর্থিক গরমিল এবং নথিপত্রের গুরুতর ঘাটতির বিষয়টি নিরীক্ষকরা তাদের আনুষ্ঠানিক ‘কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন’-এ গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেছেন। উদ্বেগজনকভাবে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরেই কোম্পানির ব্যাংক জমা নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন বারবার উঠলেও, তা সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

তহবিল তছরূপের আরও এক অভিনব হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘এজেন্ট ব্যালান্স’ খাতকে। মাঠপর্যায়ে সাধারণ গ্রাহকেরা তাদের কষ্টার্জিত বিমা পলিসির প্রিমিয়ামের টাকা জমা দিয়েছিলেন রূপালী লাইফের অনুমোদিত এজেন্টদের কাছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের সে এজেন্টরা গ্রাহকের সে টাকা কোম্পানির কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা না দিয়ে সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করেছেন। অথচ রূপালী লাইফ কর্তৃপক্ষ এ অনাদায়ী ও বকেয়া অর্থকে বছরের পর বছর ধরে তাদের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে ‘এজেন্ট ব্যালান্স’ বা কোম্পানির কার্যকর সম্পদ হিসেবে প্রদর্শন করে আসছে।

সবচেয়ে গুরুতর অনিয়মটি ঘটেছে এই খাতেই। এজেন্টদের কাছে আটকে থাকা বা হারিয়ে যাওয়া অনাদায়ী অর্থকেই সম্পদ হিসেবে দেখিয়ে রূপালী লাইফের পরিচালকেরা কৃত্রিম উদ্বৃত্ত (সারপ্লাস) তৈরি করেছেন। আর সেই ভুয়া উদ্বৃত্তের ভিত্তিতে বছরের পর বছর নিজেদের জন্য মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ তুলে নিয়েছেন। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাত বছরের আর্থিক নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘এজেন্ট ব্যালান্স’ খাতে মোট ২৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে ৭ কোটি ৭২ লাখ, ২০১৮ সালে ৪ কোটি ৯৮ লাখ, ২০১৯ সালে ৪ কোটি ৪৬ লাখ, ২০২০ সালে ৩ কোটি ৬৯ লাখ এবং ২০২১ সালে ৪ কোটি ৮ লাখ টাকা বকেয়া থাকলেও সেগুলোকে সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ এই বিপুল অনাদায়ী অর্থ আদায়ের কোনো বাস্তব প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও তা দিয়ে মুনাফা দেখানো হয়েছে, যা স্পষ্টতই আর্থিক জালিয়াতির ইঙ্গিত দেয়।

কোম্পানির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও শাখাগুলোতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ‘ক্যাশ ইন হ্যান্ড’ খাতে দেখানো হয়। রূপালী লাইফের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এ খাতে ছিল ৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়াই প্রতি বছর এই অঙ্ক অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ‘ক্যাশ ইন হ্যান্ড’ দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বিমা খাতের অভিজ্ঞ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও হিসাববিদদের মতে, এত বড় অঙ্কের অর্থ দীর্ঘ সময় ধরে অফিসে বা ব্যক্তিগত জিম্মায় নগদ রাখা ব্যবসায়িকভাবে অযৌক্তিক। সাধারণত এমন অর্থ লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা হয়। ফলে বিপুল এই নগদ অর্থ দেখানোর পেছনে বড় ধরনের অনিয়ম বা জালিয়াতির আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া, প্রতিবেদনে উল্লেখিত এই ১৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা প্রকৃতপক্ষে কার কাছে, কোথায় বা কীভাবে সংরক্ষিত—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য বা ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোম্পানির মূল তহবিল থেকে বড় অঙ্কের অর্থ বেনামী খাতে সরিয়ে নেওয়া বা আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই ‘ক্যাশ ইন হ্যান্ড’ খাতে এই অস্বাভাবিক অঙ্ক দেখানো হয়েছে। তাদের মতে, এ ধরনের অনিয়ম অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সাধারণ গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থ ফেরত পাওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এ বিষয়ে জানতে রূপালী লাইফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাকে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।