480
ঢাকামঙ্গলবার , ৭ জুলাই ২০২৬
  1. অনুসন্ধানী ও বিশেষ প্রতিবেদন
  2. অপরাধ-আইন ও আদালত
  3. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প
  4. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প-ব্যাংক-বীমা-নন ব্যাংক
  5. আইটি, টেলিকম ও ই-কমার্স
  6. আবাসন-ভূমি-রাজউক-রিহ্যাব
  7. উদ্যোক্তা-জীবনী
  8. করপোরেট ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
  9. কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ
  10. গণমাধ্যম
  11. গৃহায়ন ও গণপূর্ত
  12. জনশক্তি ও পর্যটন
  13. জনসংযোগ-পদোন্নতি ও সম্মাননা
  14. জাতীয়
  15. দুর্ঘটনা-শোক-দুর্যোগ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ১০০ কোটি আমানতে ৪ কোটি টাকা ‘আপ্যায়ন ব্যয়’

https://www.uddoktabangladesh.com/wp-content/uploads/2024/03/aaaaaa.jpg
অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
জুলাই ৭, ২০২৬ ১:০৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

চরম আর্থিক সংকটে থাকা বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে। উৎসে কর কেটে তা এনবিআরকে জমা না দিয়ে ব্যয় করে ফেলা হয়েছে, পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণও পরিশোধ করতে পারছে না। দীর্ঘদিন বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ায় গুনতে হচ্ছে জরিমানাও। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই মাত্র আড়াই শতাংশ সুদে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১০০ কোটি টাকা এই ব্যাংকে রাখা হয়েছে। জানা গেছে, অন্য একটি ব্যাংক থেকে তুলে সম্প্রতি এই অর্থ কমার্স ব্যাংকে জমা করা হয়। এই আমানত আনতে ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ হিসেবে চার কোটি টাকা দেখিয়েছে ব্যাংকটি, যা মূলত সিটি করপোরেশনের প্রভাবশালীদের ঘুষ হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্যাংকের ১৩ জন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে চার কোটি টাকার ঘুষের অর্থ বের করা হয়েছে, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে কম সুদে ১০০ কোটি টাকার আমানত আনতে ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ হিসেবে এই অর্থ খরচের বিষয়টি কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়দুল হক নিজেই এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। পরে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সেই প্রতিবেদন অনুমোদন দেয়। প্রতিবেদনে এই প্রক্রিয়ায় আমানত সংগ্রহকে ‘সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

‘আপ্যায়ন’ খাতে দেখানো চার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে বের করতে কমার্স ব্যাংক একটি কৌশলগত পদ্ধতি অনুসরণ করে। এ ক্ষেত্রে ১৩ জন কর্মকর্তার নামে বিভিন্ন অঙ্কের আমানত আনার তথ্য দেখিয়ে তাদের অ্যাকাউন্টে প্রথমে ‘প্রণোদনা’ হিসেবে অর্থ জমা দেওয়া হয়। গত ৪ জুন অফিস সময় শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে এসব অর্থ তাদের হিসাবে জমা হয়। পরে ৭ জুন প্রিন্সিপাল শাখা থেকে প্রত্যেকের হিসাব থেকে নগদ অর্থ তুলে নেওয়া হয়। এর আগে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হামিদুর রহমান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করেন এবং তাদের কাছ থেকে আগাম স্বাক্ষরিত চেক সংগ্রহ করা হয়। হামিদুর রহমানের নিজের অ্যাকাউন্টেও অর্থ জমা ও উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।

‘ইনসেনটিভ’ হিসেবে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা করে জমা দিয়ে পরে তা তুলে নেওয়া হয় হামিদুর রহমান এবং প্রধান কার্যালয়ের আদায় বিভাগের মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক উল্লাহর অ্যাকাউন্ট থেকে। কাগজে-কলমে দেখানো হয়, তারা প্রত্যেকে ২০ কোটি টাকা করে আমানত সংগ্রহ করেছেন। একইভাবে প্রিন্সিপাল শাখার তাসনুভা মজুমদার, আহসান হাবিব ও আদনান আশ-শফিকের হিসাবে ৪০ লাখ টাকা করে মোট এক কোটি ২০ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। আইসিসিডি বিভাগের মনিরুল হকের হিসাবে দেওয়া হয় ৩২ লাখ টাকা। মার্কেটিং বিভাগের সালেহ আহমেদ ও দিলকুশা শাখার কর্মকর্তা সাইফুর রহমানের হিসাবে ২০ লাখ টাকা করে মোট ৪০ লাখ টাকা জমা করা হয়। প্রধান কার্যালয়ের রিফাতুল মুরসালিন পান ১৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া এফএডির সুজন দাশ, মো. শাহিনুর রহমান, মার্কেটিং বিভাগের মো. সরোয়ার এবং প্রিন্সিপাল শাখার মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনের প্রত্যেককে আট লাখ টাকা করে মোট ৩২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই দেখানো হয়, তারা দুই কোটি টাকা করে আমানত এনেছেন।

জানতে চাইলে হামিদুর রহমান এ বিষয়ে কমার্স ব্যাংকের এমডির সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান। যাদের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকেছে– এমন তিনজনের সঙ্গে এ প্রতিবেদক কথা বলেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, টাকা দেওয়ার আগেই তাদের কাছ থেকে চেক সই করিয়ে নেওয়া হয়। এভাবে অ্যাকাউন্টে টাকা নিতে তাদের বাধ্য করা হয়। বিএফআইইউ, দুদক বা এনবিআরের দিক থেকে কোনো সমস্যা হলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দেখবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে অস্বস্তি থাকলেও চাকরির ভয়ে কিছু বলেননি বলে জানান তারা।

কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ওবায়দুল হক গত ৯ এপ্রিল যোগদান করেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক থেকে অবসরে ছিলেন।চার কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়ে বক্তব্য চাইলে ওবায়দুল হক বলেন, ‘এ বিষয়ে টেলিফোনে কিছু বলা যাবে না। সামনাসামনি এলে বুঝিয়ে বলব।’ গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্বে) মো. গোলাম কিবরিয়াকে টেলিফোন করলে তিনি বলেন, আয়-ব্যয় কর্মকর্তা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং সিইও। এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবেন। আমানত রাখার সময় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা মুহাম্মদ সোহেল হাসান (বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব) বলেন, একটি ব্যাংকে অনেক টাকা রাখা ছিল। তারল্য সংকটের কারণে যেহেতু বিভিন্ন ব্যাংক আমানতকারীদের ঠিকমতো টাকা দিতে পারে না, এ কারণে টাকাটা ভাগ করে রাখা হয়।

আমানত আনতে কমার্স ব্যাংকের চার কোটি টাকার আপ্যায়ন খরচের বিষয়ে জানতে চাইলে সোহেল হাসান বলেন, ‘এটা ব্যাংকের হিসাব। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’ ভালো ব্যাংকে টাকা না রেখে চরম সংকটাপন্ন কমার্স ব্যাংকে রাখার কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘যুক্তি একটাই, ঝুঁকি কমাতে এক ব্যাংকে অনেক টাকা না রেখে আরেক ব্যাংকে রাখা হয়েছে। ঝুঁকিমুক্ত করার জন্যই এটা করা হয়েছে।’ অবশ্য তাঁর এই বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আর্থিকভাবে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা সাউথ বাংলা ব্যাংকের গাজীপুর শাখা থেকে ১০০ কোটি টাকা নিয়ে কমার্স ব্যাংকে রাখা হয়। এই ব্যাংকেই গাজীপুর সিটির আরও অনেক টাকা রয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ঘুষ দেওয়া বা নেওয়া—দুটিই অপরাধ। কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবসা উন্নয়ন বা ‘আপ্যায়ন’ খরচের আড়ালে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই তদন্ত করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনভিত্তিক সুদহার প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসএনডি হিসাবে ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি আমানতে সরকারি মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক, বিডিবিএল ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রায় ৬ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। অন্যদিকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংকগুলো স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিটে (এসএনডি) ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত সুদ অফার করছে।