জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : দেশের ব্যাংক খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ কমানো এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় ধরনের ছাড় বা ‘এক্সিট সুবিধা’ দিয়েছে। এর ফলে গ্রাহকেরা এখন মন্দ বা খেলাপি ঋণের পুরো অর্থ এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে দায়মুক্ত হতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের ওপর আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের পূর্বের কঠোর শর্তও শিথিল করা হয়েছে। মূলত আদায় অযোগ্য ঋণ কমানো এবং ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ–সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে তা পাঠানো হয়েছে। ব্যাংকাররা বলছেন, নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে যেসব খেলাপি ঋণ অনাদায়ী পর্যায়ে চলে গেছে, ব্যাংক চাইলে সেসব ঋণের আসল অংশটুকু আদায় করে পুরো সুদ মওকুফ করে দিয়ে হলেও সেই ঋণদাতাকে এক্সিট সুবিধা দিতে পারবে। এত দিন আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে ব্যাংকগুলোর পক্ষে এই সুবিধা দেওয়ার সুযোগ ছিল কম।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। তবে বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা নেতিবাচকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ কমানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, যেসব ঋণগ্রহীতা বিভিন্ন কারণে আর্থিক সংকটে পড়লেও ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের আন্তরিকতা বজায় রেখেছেন, তাঁদের জন্য এককালীন বিশেষ এক্সিট সুবিধা দেওয়া হবে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমার পাশাপাশি নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে, যা দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ এই সুবিধার আওতায় আসবে। তবে এই সুবিধা দিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন লাগবে এবং তা নির্ধারিত হবে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে। এই সুবিধার প্রধান শর্ত হলো, ঋণগ্রহীতাকে তাঁর সব দায় এককালীন পরিশোধ করতে হবে। আর এটি নিশ্চিত করতে পারলে ঋণগ্রহীতাদের সব ধরনের আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের পথ সহজ করা হয়েছে। আগে সুদ মওকুফ করতে গেলে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় (কস্ট অব ফান্ড) আদায় নিশ্চিত করার যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা এবার শিথিল করা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর আয় খাত বিকলন করে সুদ মওকুফ না করার যে শর্ত ছিল, সেটিও শিথিল থাকবে। অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকই এখন এক্সিট সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে সুদ মওকুফ করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে পুনঃতফসিল করা মন্দ বা ক্ষতিজনক শ্রেণির ঋণগুলো এই প্রজ্ঞাপনের আওতায় বিশেষ এক্সিট সুবিধা পাবে। পাশাপাশি এ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে কৃষি খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং সিএমএসএমই খাতের কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র ঋণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর অধীন প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক এই নির্দেশনা জারি করেছে। সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষ এই নীতিমালার সুবিধা ও নির্দেশনা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।





