সরকারি চাকরিজীবীদের দশম থেকে ২০তম গ্রেডের বেতন-ভাতায় কোনো কাটছাঁট করা হচ্ছে না, কারণ জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত করেছে সচিব কমিটি; তবে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে কমিশনের প্রস্তাবে কিছু কাটছাঁট হতে পারে, যদিও এর পরিমাণ এখনও নির্ধারিত হয়নি এবং জুলাই থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে—এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পাশাপাশি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১০-২০তম গ্রেডে কমিশনের সুপারিশকৃত কাঠামোই বহাল থাকছে, কিন্তু ১ম-৯ম গ্রেডে পরিবর্তন আসতে পারে, যা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, দশম গ্রেডে বেতন ১৬ হাজার থেকে ৩২ হাজার টাকা, ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, ১২তম গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, ১৩তম গ্রেডে ১১ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকা, ১৪তম গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা, ১৫তম গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২২ হাজার ৮০০ টাকা, ১৬তম গ্রেডে ৯ হাজার ৩০০ থেকে ২১ হাজার ৯০০ টাকা, ১৭তম গ্রেডে ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ১০০ টাকা, ১৮তম গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার টাকা, ১৯তম গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০তম গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রথম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না; এ ক্ষেত্রে সচিব কমিটি কিছু কাটছাঁট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যদিও কাটছাঁটের পরিমাণ এখনও নির্ধারিত হয়নি—তবে এমন পরিবর্তন আসছে, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম গ্রেডে বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার, দ্বিতীয় গ্রেডে ৬৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার, তৃতীয় গ্রেডে ৫৫ হাজার ৫০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার, চতুর্থ গ্রেডে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ, পঞ্চম গ্রেডে ৪৩ হাজার থেকে ৮৬ হাজার, ষষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭১ হাজার, সপ্তম গ্রেডে ২৯ হাজার থেকে ৫৮ হাজার, অষ্টম গ্রেডে ২৩ হাজার থেকে ৪৭ হাজার ২০০ এবং নবম গ্রেডে ২২ হাজার থেকে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে বেতনের পুরো অংশ কার্যকর করা হবে, আর দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা বাস্তবায়ন করা হবে। জানা গেছে, আগামী জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর শুরু হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের সময় গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, অর্থবছরের শুরু অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই বেতন কাঠামো কার্যকর করা হবে। বাজেট বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি কর্মচারীরা প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোয় আছেন এবং মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন কাঠামো চালু করার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ জমা দেওয়ার সময় কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান জানিয়েছিলেন, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে বাড়তি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। তবে সরকার এই সুপারিশ পর্যালোচনা ও কাটছাঁটের জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটি তিন ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।
প্রস্তাবিত বাজেট আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও নতুন পে-স্কেলের জন্য এতে সরাসরি কোনো দৃশ্যমান বরাদ্দ রাখা হয়নি; তবে সরকার নীতিগতভাবে একই তারিখ থেকে পে-স্কেলের একটি অংশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত ৫৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা বেতন খাতে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে বলে বাজেট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন ১ জুলাই থেকেই ধাপে ধাপে শুরু হবে, যেখানে প্রথম ধাপেই বেতনের শতভাগ কার্যকর করা হবে, যদিও জাতীয় বেতন কমিশনের মূল সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে না। একই পদ্ধতিতে জুডিশিয়াল সার্ভিস ও সশস্ত্র বাহিনীর পে-কমিশনও একযোগে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতি বছরের বাজেটের ‘বিবরণী-২খ’-এ পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। সেখানে কর্মকর্তা বেতন, কর্মচারী বেতন ও ভাতাদি— এই তিন খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ ছিল ৮৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ বেড়েছে ৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। একইভাবে ‘বিবরণী-৪’-এ পরিচালন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ৮৪ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকার তুলনায় ৪ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা বেশি। তবে আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাজেট সংক্ষিপ্তসারের ‘বিবরণী-২ক’-এ। সেখানে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে আগামী অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকার তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত এ বরাদ্দের মধ্যে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশন ভোগীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য রাখা হয়েছে।





