জোনায়েদ মানসুর : গত কয়েক বছর ধরে দেশের ব্যাংকিং খাত নানা সংকট, অনিয়ম, তারল্য ঘাটতি ও আস্থাহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ইসলামী ধারার ব্যাংক এবং দুর্বল আর্থিক অবস্থায় থাকা কয়েকটি ব্যাংককে ঘিরে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে অনেক গ্রাহক ব্যাংকে অর্থ জমা না রেখে নগদ টাকা নিজের কাছেই রাখতে শুরু করেছিলেন। তবে সর্বশেষ তথ্য বলছে, সেই প্রবণতায় কিছুটা পরিবর্তনের আভাস মিলছে। মার্চ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও এপ্রিলে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ কমেছে। অর্থাৎ মানুষের হাতে থাকা কিছু নগদ টাকা আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা মুদ্রার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা। কিন্তু এক মাসের ব্যবধানে এপ্রিল শেষে তা কমে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক মাসেই ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ কমেছে ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। একই সময়ে কমেছে ছাপানো টাকা বা রিজার্ভ মানি এবং বাজারে প্রচলিত মুদ্রার (কারেন্সি ইন সার্কুলেশন) পরিমাণও। মার্চে রিজার্ভ মানির পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা, যা এপ্রিলে কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে কমেছে প্রায় ৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। অন্যদিকে মার্চে বাজারে প্রচলিত মুদ্রার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪২ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এপ্রিলে তা কমে হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে প্রচলিত মুদ্রা কমেছে ১১ হাজার ৬৬ কোটি টাকা।
২০২৬ সালের শুরু থেকেই মানুষের হাতে নগদ অর্থ দ্রুত বাড়ছিল। জানুয়ারিতে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। মার্চে প্রথমবারের মতো এই অঙ্ক ৩ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়। যা এপ্রিলে কমে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে; অর্থাৎ এক মাসে কমেছে ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। একই সময়ে রিজার্ভ মানি বা ছাপানো টাকার পরিমাণ ৪ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা থেকে কমে ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৭ কোটি টাকায় নেমেছে, যা ৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া বাজারে প্রচলিত মুদ্রা (কারেন্সি ইন সার্কুলেশন) মার্চে ছিল ৩ লাখ ৪২ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা এপ্রিলে কমে ৩ লাখ ৩১ হাজার ১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে এক মাসে বাজারে প্রচলিত মুদ্রার পরিমাণ কমেছে ১১ হাজার ৬৬ কোটি টাকা।
তবে এপ্রিলে এসে এই ধারা ভেঙেছে। যদিও এক মাসের এই পরিবর্তনকে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে দেখার আগে আরও কয়েক মাসের তথ্য পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থার সংকট নতুন নয়। বিগত কয়েক বছরে একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি, অনিয়ম, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থা সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের নানা অভিযোগ সামনে আসার পর অনেক আমানতকারী নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাসায় রাখতে শুরু করেন। এর ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। আমানত টানতে অনেক ব্যাংক উচ্চ সুদের প্রস্তাব দিলেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। আগস্টে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। ডিসেম্বর নাগাদ তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আরও কমে হয় ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আবার পরিবর্তিত হয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৬ সালের শুরুতে মানুষের হাতে নগদ অর্থ আবার বাড়তে শুরু করে। এর পেছনে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের অনিশ্চয়তা এবং কিছু ব্যাংক নিয়ে নতুন করে উদ্বেগকে কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মানুষ দীর্ঘ সময় বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ বাসায় রাখে না। নিরাপত্তা ঝুঁকি, লেনদেনের প্রয়োজন এবং সঞ্চয়ের সুবিধার কারণে শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ আবার কোনো না কোনো ব্যাংকে জমা হয়। তাদের মতে, যেসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর মানুষের আস্থা রয়েছে, সেসব ব্যাংকেই এখন নগদ অর্থ ফিরে আসছে। ফলে ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থ কিছুটা কমেছে। তবে এটি পুরো ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনও আসেনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকের বাইরে অতিরিক্ত নগদ অর্থ থাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কারণ এতে মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। বাজারে তারল্য নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং ঋণপ্রবাহ ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকারিতা কমে যায়।
অন্যদিকে নগদ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে এলে আমানত বাড়ে, ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ আরও সুশৃঙ্খল হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক মাসের তথ্য দিয়ে আস্থা পুরোপুরি ফিরে এসেছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। মানুষের আস্থা স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকি। যদি এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়, তাহলে ব্যাংকের বাইরে থাকা বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ ধীরে ধীরে আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবে। এতে যেমন ব্যাংকের তারল্য বাড়বে, তেমনি দেশের আর্থিক খাতও আরও স্থিতিশীল হবে।





