জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : এক সময় বাংলাদেশে টিভি, ফ্রিজ বা এসির মতো ইলেকট্রনিকস পণ্য ছিল পুরোপুরি আমদানিনির্ভর, তবে সময়ের পরিবর্তনে এখন এসব পণ্যের বড় অংশই দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত হচ্ছে। এই ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে করনীতি সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশীয় ইলেকট্রনিকস শিল্পে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যেখানে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর ও এয়ারকন্ডিশনার (এসি) উৎপাদন পর্যায়ে বর্তমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ উদ্যোগের লক্ষ্য স্থানীয় উৎপাদনকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা; পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমলে ভোক্তা পর্যায়েও কিছুটা মূল্যসুবিধা মিলতে পারে বলে নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা।
সরকারের এই পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করার একটি বড় অর্থনৈতিক লক্ষ্য। বিশেষ করে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে ব্যবসা সহজীকরণ এবং উৎপাদনমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যবসায়িক চাপের পরিস্থিতিতে নতুন কর আরোপের পরিবর্তে নির্দিষ্ট কিছু খাতে কর ও ভ্যাট কমানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। দেশীয় ইলেকট্রনিকস শিল্পের বিকাশও তুলনামূলকভাবে নতুন, যেখানে এক দশক আগেও টিভি বা ফ্রিজের জন্য প্রায় পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হতো। তবে শুল্ক-কর সুবিধা এবং নীতিগত সহায়তার ফলে ধীরে ধীরে স্থানীয় উৎপাদন কাঠামো গড়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশে বিক্রি হওয়া টেলিভিশনের প্রায় ৯০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা সংযোজিত হচ্ছে। ফ্রিজের ক্ষেত্রে এ হার ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ এবং এসির বাজারেও স্থানীয় উৎপাদন ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
ওয়ালটন, ভিশন, সিঙ্গার, মিনিস্টার, যমুনা, গ্রি-হাইকো ও হিসেন্সসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান এখন দেশের ভেতরই টিভি, ফ্রিজ ও এসি উৎপাদন বা সংযোজন করছে। এই শিল্পের বিকাশে যেমন বিনিয়োগ বেড়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে হাজারো কর্মসংস্থান। তবে এই অগ্রগতির মধ্যেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে নিশ্চিত করেছেন, স্থানীয় উৎপাদনকে আরও গতিশীল করতে কর-কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। টিভি ও ফ্রিজের মতো বড় ইলেকট্রনিকস পণ্যে উৎপাদন পর্যায়ের ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব আসতে যাচ্ছে বাজেটে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কারণে তাদের ওপর চাপ বেড়েছে। ডলারের বাজারে অস্থিরতা, কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার ওঠানামার কারণে শিল্প খাত কিছুটা সংকটের মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ভ্যাট কমানো হলে শিল্পে নতুন গতি আসবে বলে মনে করেন ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিয়াকত আলী ভুঁইয়া। তার মতে, উৎপাদন ব্যয় কমলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হবে এবং বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতাও সহজ হবে। তিনি আরও জানান, নীতিগত সহায়তার অভাবে গত দেড় বছরে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক-কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, যা এ খাতের বর্তমান চাপের চিত্র তুলে ধরে। অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করছেন, এ খাতের সম্ভাবনা এখনো ব্যাপক। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ লাখ ফ্রিজ বিক্রি হয়, যার বড় অংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত। এসির বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, যেখানে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ ইউনিট; তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এ চাহিদা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন বলেছেন, দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণের কারণে ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজার দ্রুত বাড়ছে। তাই এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা জরুরি। তার মতে, ভ্যাট কমানো হলে শুধু উৎপাদনই নয়, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়বে। স্থানীয়ভাবে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ উৎপাদনে বর্তমানে ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে। এ সুবিধার মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এনবিআর সেটি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। উদ্দেশ্য দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো। সব মিলিয়ে, আসন্ন বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; বরং এটি হয়ে উঠতে পারে দেশের ইলেকট্রনিকস শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ভ্যাট কমানোর এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন বাড়বে, বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হবে, আর সবচেয়ে বড় কথা— দেশীয় শিল্প আরও একধাপ এগিয়ে যাবে আত্মনির্ভরতার পথে।
বাজেটে আরও যেসব কর সুবিধা
বেশ কিছু খাতের পণ্য আমদানিতে বিদ্যমান অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং স্থানীয় পর্যায়ে উৎসে কর কর্তনের (টিডিএস) হার কমানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে এআইটি ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২ ধরনের উপকরণের ক্ষেত্রে এআইটি ১ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারীদের জন্য ১০ বছরের কর অব্যাহতির প্রস্তাব থাকতে পারে। রিসাইকেল শিল্পকে উৎসাহিত করতে কাঁচামাল সরবরাহ পর্যায়ে এআইটি ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার আমদানিতে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের পাশাপাশি ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল ও চার্জিং স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ এআইটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব আসতে পারে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ফি অর্ধেকে নামিয়ে আনার কথাও ভাবা হচ্ছে। একইসঙ্গে রিফাইনারির ফুয়েল সাপ্লাইয়ের টিডিএস ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ, মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবায় ১২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ, প্যাকেজিং যন্ত্রপাতিতে ৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ এবং ট্রান্সপোর্ট, ক্যারিং ও ভেহিক্যাল রেন্টাল সেবায় টিডিএস ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব থাকতে পারে।





