আগামী অর্থবছর থেকে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর নতুন করে কর আরোপের প্রস্তাব আসতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর আদায় করা হতে পারে। এতে প্রতি এক হাজার টাকার লেনদেনে দুই টাকা করে কর দিতে হবে। করের আওতা বাড়াতে আগামী বাজেটে এ ধরনের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
খুচরা বিক্রেতাদের ওপর আরোপিত এই অগ্রিম আয়কর পরবর্তীতে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ অগ্রিম হিসেবে অতিরিক্ত কর কেটে নেওয়া হলে, করদাতা রিটার্ন জমা দেওয়ার পর তা সমন্বয় করে অতিরিক্ত অংশ ফেরত পাবেন। আগামী বাজেটে করজাল সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আরও কয়েকটি প্রস্তাব থাকতে পারে। এর মধ্যে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলক করা, এবং কেন্দ্রীয় তথ্য সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ডেটাবেজকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংকিং সেবা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং লেনদেন ও বিভিন্ন পরিষেবা গ্রহণসংক্রান্ত তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যাচাই করার সুযোগ পাবে। এতে করজালের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এদিকে আগামী বাজেটে মৌলিক কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব থাকতে পারে। এর মধ্যে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ প্রায় ৬০টি পণ্যের ক্ষেত্রে উৎসে কর শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে এসব খাতে বিভিন্ন হারে এক, দুই ও পাঁচ শতাংশ অগ্রিম কর প্রযোজ্য রয়েছে। অগ্রিম কর কমানো হলে পণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
উৎসে করকে অগ্রিম বিবেচনা
এতদিন করযোগ্য বা কম আয় থাকা সত্ত্বেও উৎসে কর্তিত কর বাধ্যতামূলক বা উৎসে করকে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এতে অতিরিক্ত কর কেটে নেওয়া হলেও তা ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এর ফলে ব্যবসায়ীদের পুঁজির সংকট হতো। আগামী অর্থবছরে উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব থাকছে। এর ফলে উৎসে করের মাধ্যমে পরিশোধিত অতিরিক্ত কর ফেরত পাবে আয়করদাতা। এর মাধ্যমে দেশীয় ব্যবসার সহজ পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাঁচ বছর মেয়াদি ব্যক্তি আয়করমুক্ত সীমা
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি করদাতার আয়করমুক্ত সীমা নিয়ে আগামী পাঁচ অর্থবছরের একটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই অর্থবছর (২০২৬–২৭ ও ২০২৭–২৮) ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা থাকতে পারে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এরপর পরবর্তী দুই অর্থবছর (২০২৮–২৯ ও ২০২৯–৩০) এ সীমা চার লাখ টাকা এবং তার পরের অর্থবছরে তা সাড়ে চার লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব থাকতে পারে। এ ছাড়া নারী করদাতা ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য করমুক্ত আয়ে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় থাকতে পারে। তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের জন্য অতিরিক্ত এক লাখ ২৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধাদের জন্য এক লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বাবা-মা বা আইনগত অভিভাবকদের ক্ষেত্রে প্রত্যেক প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সীমা প্রযোজ্য হতে পারে।
এদিকে ২০২৮-২৯, ২০২৯-৩০ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ করের হার ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকছে আগামী বাজেটে। তিন কোটি টাকার বেশি অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর এ কর আরোপ করা হবে। বর্তমানে দুই কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ আয়কর দিতে হয়।
অপরিবর্তিত থাকছে করপোরেট করহার
করপোরেট কর হারে তেমন কোনো পরিবর্তন আসছে না আগামী বাজেটে। বর্তমানে করপোরেট করের যে হার রয়েছে আগামী অর্থবছরে তা অপরিবর্তিত থাকছে। ফলে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের বিদ্যমান সাড়ে সাত শতাংশ ব্যবধানই বজায় থাকছে। তবে অপরিবর্তিত থাকলেও করের আদায় বৃদ্ধি পেলে যেসব সেক্টরে করের হার বেশি আগামী দিনগুলোতে সেসব করের হার কমানোর আভাস দেওয়া হবে বাজেটে।
যেসব খাতে উৎস কর কমছে
কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ফিল্টার আমদানিতে উৎসে কর পাঁচ শতাংশ থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব থাকছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন, ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে বিদ্যমান পাঁচ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে শূন্য করার প্রস্তাবও থাকতে পারে। এ ছাড়া কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডেটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে পাঁচ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে দুই শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব আসতে পারে।
স্থানীয়ভাবে মোবাইলফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়করের পরিমাণ পাঁচ শতাংশ থেকে কমিয়ে এক শতাংশ করা, রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ প্রণোদনার উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে পাঁচ শতাংশ, মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ, অনিবাসীকে পরিশোধিত সুদের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকছে বাজেটে।
উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা
সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব থাকতে পারে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের টার্নওভারের ওপর শূন্য শতাংশ কর নির্ধারণের বিষয়টিও প্রস্তাবনায় থাকতে পারে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ লাখ টাকা এবং এসএমই ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখার প্রস্তাব আসতে পারে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় স্থাপিত যেকোনো উৎপাদনমুখী শিল্প, পর্যটন বা ক্রীড়া খাতের স্থাপনা এবং যন্ত্রপাতি বিনিয়োগে প্রথম বছর ৬০ শতাংশ ও দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ হারে ত্বরান্বিত অবচয় সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও বাজেটে থাকতে পারে।





