নামসর্বস্ব দোকান, ভাঙারি ব্যবসা ও ডিম বিক্রেতার নামে ঋণ;
নেপথ্যে এস আলম গ্রুপের ইঙ্গিত দুদকের প্রতিবেদনে
দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হেনে ফুচকা-চটপটির দোকান, ভাঙারি ব্যবসা ও ডিম বিক্রেতাসহ ছোটখাটো ২৮৯টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১৮ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আর এই জালিয়াতির নেপথ্যে রয়েছে শীর্ষ শিল্পগ্রুপ এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ কিছু কর্মকর্তার সরাসরি যোগসাজশে বিনা জামানতে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ জালিয়াতির মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে। এস আলম গ্রুপ একাই প্রায় ১৮ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা ইউনিয়ন ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৬৪ শতাংশ।
ঋণের পেছনের গল্প: ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নেই অস্তিত্ব : তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর চিত্র—মাত্র ২৮৯টি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স দেখিয়ে এসব ঋণ অনুমোদন করা হয়। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের কোনো অস্তিত্ব নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকার ফুচকা-চটপটির দোকান, ভাঙারির ব্যবসা, ডিশ সংযোগ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, এমনকি ডিম বিক্রেতার নামেও ঋণ দেখানো হয়েছে। নামমাত্র এই ব্যবসাগুলো দিয়ে ১৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার পর তা আত্মসাত করা হয়েছে।
দুদক সূত্র আরও জানায়, এই ২৮৯টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামের পেছনে মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের। অনুসন্ধান বলছে, ঘুরেফিরে এই বিপুল অঙ্কের টাকা শেষ পর্যন্ত চলে গেছে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানিতে।
জালিয়াতির প্রক্রিয়া: ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভূমিকা : দুদকের প্রাথমিক তদন্তে ইউনিয়ন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবিএম মোকাম্মেল হক চৌধুরী, আব্দুল হামিদ মিয়া ও ওমর ফারুকসহ শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। তাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ২৪২ জন ব্যক্তির নামে এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া হয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক (ব্যাংক) মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমানের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, কমিশনের প্রাসঙ্গিক ধারায় অভিযোগটির অনুসন্ধান সম্পন্ন করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী দলে রয়েছেন সহকারী পরিচালক মো. কামিয়াব আফতাব-উন-নবী, মো. সোহাকুল ইসলাম এবং উপসহকারী পরিচালক মো. ফারুক হোসেন ও মো. সজিব আহমেদ।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি ইউনিয়ন ব্যাংকের দেওয়া দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠি থেকে জানা যায়, তদন্ত দল ঋণের নামে ১৮ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংকটির সাবেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তথ্য চেয়ে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে। ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সাবেক ১৪৮ কর্মকর্তার এনআইডি, ছাড়পত্র, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও ঋণ দেওয়ার যাবতীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে।
কোনো জামানত নেই, নেই কোনো স্বচ্ছতা: দুদক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে উঠে এসেছে, বিপুল অঙ্কের এই ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত নেওয়া হয়নি। অথচ ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী এত বিপুল অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জামানত রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই নিয়ম উপেক্ষা করেছেন। রাজধানীর পান্থপথ, গুলশান, বনানী, দিলকুশা এবং চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, খাতুনগঞ্জসহ বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে ঋণের নামে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে বলে দুদক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এস আলম সংযোগ ও সাবেক এমডির ভূমিকা: দুদক সূত্র জানায়, এস আলমের পক্ষে ইউনিয়ন ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন সাবেক এমডি মোকাম্মেল হক চৌধুরী। ২০২০ সাল থেকে তিনি ব্যাংকটির এমডি থাকলেও গত ৫ আগস্টের পর তাকে পদটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে তিনি এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকেও কর্মরত ছিলেন। ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম নিজেই। অর্থাৎ, তিনি এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোতে চাকরি করেছেন এবং পরে ইউনিয়ন ব্যাংকে থেকে এস আলমের পক্ষে অনিয়ম করেছেন—এমন অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে।
দুদকের অবস্থান : দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ১৮ হাজার কোটির বেশি টাকার ঋণ দেওয়ার বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদন্ত করছে দুদক। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় অভিযুক্তদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানো হয়েছে। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ অনুমোদনের ঘটনায় ব্যাংকটির সাবেক এমডিসহ একাধিক কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’ দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে দ্রুতই এ বিষয়ে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া আত্মসাত হওয়া অর্থ উদ্ধারে ব্যাংকের সম্পদ ও জামানতের তথ্য সংগ্রহ করছে দুদক।
যা বলছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ: এ বিষয়ে ইউনিয়ন ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনার বক্তব্য অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ব্যাংকটির বিশেষ পরিদর্শন সম্পন্ন করেছে এবং প্রতিবেদনে জালিয়াতির তীব্রতা তুলে ধরা হয়েছে। আগামী দিনে এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যাপক প্রভাব পড়বে ব্যাংকিং খাতে: বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউনিয়ন ব্যাংকের এই জালিয়াতি দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। একক একটি ব্যাংকের মোট ঋণের ৬৪ শতাংশ যদি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে আত্মসাত হয়ে যায়, তাহলে তা ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সচ্ছলতাকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করবে। আমানতকারীদের স্বার্থও হুমকির মুখে পড়বে।
দুদকের তদন্ত চলছে। ফুচকার দোকান, ডিম বিক্রেতা ও ভাঙারি ব্যবসার নামে দেশের অর্থনীতি থেকে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা যতই উন্মোচিত হবে, ততই বেরিয়ে আসবে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। অপেক্ষা শুধু এই জালিয়াতির পুরো চিত্র ও শাস্তির প্রক্রিয়ার।





