রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডের দখলে থাকা ২২২ বিঘা সরকারি জমি চিহ্নিত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের অনুমোদিত নকশার চেয়ে ৭৪ দশমিক ১৮ একর বেশি জমি দখল করে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। ইতোমধ্যে বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং আগামী সোমবার জরুরি সভা ডেকেছে মন্ত্রণালয়।
অনুমোদনের চেয়ে বেশি জমি দখল
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের প্রকল্পের জন্য অনুমোদিত জমির পরিমাণ ৩ হাজার ৩১৪ দশমিক ৮৯ একর। কিন্তু বাস্তবে বাড্ডা, ভাটারা, খিলখেত ও ক্যান্টনমেন্ট থানার ৯টি মৌজায় প্রতিষ্ঠানটির দখলে রয়েছে ৩ হাজার ৪০৪ দশমিক ৪০ একর জমি। ফলে অতিরিক্ত ৭৪ দশমিক ১৮ একর জমি সরকারি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় পরিমাপ অনুযায়ী যা প্রায় সাড়ে ২২২ বিঘা জমির সমান।
গত ৫ মে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। চিঠিতে বলা হয়, বিষয়টির লিখিত সারসংক্ষেপ গণপূর্ত মন্ত্রী দেখেছেন এবং মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য সম্মতি দিয়েছেন।
সর্বশেষ জমির তথ্য যাচাই করে বেরিয়ে এসেছে অসঙ্গতি
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাভুক্ত করতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর মন্ত্রণালয় ও রাজউকের একটি দল মিলে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে।
ওই উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই তাদের প্রকল্পের ম্যাপ ও জিআইএস ডাটাবেস গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। ওই ম্যাপ ও ডাটাবেস অনুযায়ী, ঢাকা জেলার ভাটারা, বাড্ডা, খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন ভাটারা, কাঠালদিয়া, ডুমুনী পাতিরা, বড় বেরাইদ, ছোট বেরাইদ, সাতারকুল, জোয়ারসাহারা ও বড়ুয়া মৌজায় প্রতিষ্ঠানটির দাবিকৃত মোট জমির পরিমাণ ১০ হাজার ২১৩ বিঘার কিছু বেশি। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ২২২ বিঘা জমি সরকারি খাসজমি বলে নিশ্চিত হয়েছে মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে।
অনুমোদনের ইতিহাস
সারসংক্ষেপের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর কিছু শর্তসাপেক্ষে ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টকে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন দেয় রাজউক। পরে ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি প্রায় ৯ হাজার ৯০৫ বিঘা জমির (সরকারি জমি বাদে) ওপর বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে শর্তসাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
বাসিন্দাদের দেওয়া বাড়তি ফি ফেরতের নির্দেশনা
ইতোমধ্যে রাজউক বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা ২০০৪ (সংশোধিত ২০১২ ও ২০১৫) অনুযায়ী বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের অনুমোদিত লে-আউটে অবস্থিত নাগরিক সুবিধার জন্য চিহ্নিত সংরক্ষিত জমি দ্রুত ডিএনসিসির কাছে হস্তান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্লট ও ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময় উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের কাছে যে ফি আদায় করা হয়, তা বাতিলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আগামী ১১ মে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে সভা ডাকা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব যা বললেন
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি শনিবার (৯ মে) সন্ধ্যায় বলেন, ‘বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা এমনিতেই ডিএনসিসির অধীনে রয়েছে। খাসজমি উদ্ধার শুধু বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়ই নয়, সারা দেশেই উদ্ধার করা হবে। যা হবে, সব আইনগতভাবেই হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক জায়গায় জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চলমান রয়েছে। এসব কিছুই আইনগতভাবে দেখছে সরকার।’
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার পরিচিতি
উল্লেখ্য, ২০টি ব্লকে বিভক্ত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বর্তমানে ৩৫ হাজারের বেশি প্লট রয়েছে। বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ইংলিশ ও বাংলা মিডিয়াম স্কুলসহ আধুনিক সব নাগরিক সুবিধা রয়েছে এখানে। ১৯৮৭ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পটি ঢাকার একটি পরিকল্পিত ও সুরক্ষিত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। তবে নানান সার্ভিস চার্জ নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ ছিল। নতুন সরকার গঠনের পর এলাকাটি ডিএনসিসির অধীভুক্ত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কী হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিসভার নীতিগত অনুমোদন সাপেক্ষে দখলকৃত সরকারি জমি উদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার উন্নয়নকৃত রাস্তাঘাট ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা রাজউকের অনুমোদিত লে-আউট নকশা ও দলিলসহ ডিএনসিসির কাছে হস্তান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গত ৫ মে প্রস্তুতকৃত সারসংক্ষেপে এসব তথ্য উঠে আসায় এখন দেখার বিষয়, সরকার কত দ্রুত এই বিশাল পরিমাণ সরকারি জমি উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা অবৈধ ফি ও চার্জের বোঝা থেকে মুক্তি পান কিনা।





