স্থবিরতার মুখে ‘সিটি গ্রুপ’: ৫০ বছরের সুনামের বাঁধ ভাঙার আগেই নীতিসহায়তা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি
উপশিরোনাম: বৈদেশিক বিনিময় হার অস্থিরতা, বাড়তি সুদ ও গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত ৩২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা; খেলাপি এড়াতে ৭ দফা দাবি
ঢাকা: দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারের শীর্ষস্থানীয় কনগ্লোমারেট ‘সিটি গ্রুপ’। প্রয়াত শিল্পোদ্যোক্তা ফজলুর রহমানের হাতে গড়ে ওঠা এই গ্রুপের অধীনে থাকা ৪০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান এখন আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক ও স্থানীয় নানা সংকটের কারণে গ্রুপটির কোম্পানিগুলোর ব্যাংক ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চেয়ে লিখিত আবেদন করেছে গ্রুপটি। আবেদনে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ শ্রেণীকরণ (খেলাপি) না করাসহ সাত ধরনের নীতিসহায়তা চাওয়া হয়েছে।
গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করা এই গ্রুপটির বর্তমান সংকট শুধু একটি করপোরেট গোষ্ঠীর সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার, আর্থিক খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে। প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করতে গিয়ে সিটি গ্রুপের জমা দেওয়া চিঠি, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাসঙ্গিক নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সংকটের উৎস: ডলার দোল, সুদের চাপ ও গ্যাস জট
সিটি গ্রুপের ব্যবসার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ভোজ্যতেল, চিনি, আটার মতো ভোগ্যপণ্য আমদানি ও উৎপাদন। গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান গণমাধ্যমকে জানান, গত চার বছরে ডলারের বিনিময় হার প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় সিটি গ্রুপ বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া চিঠিতে গ্রুপটি উল্লেখ করেছে, ২০২২ সালের শুরু থেকে টাকার মান ডলারের বিপরীতে প্রায় ৪২ শতাংশ কমেছে, যা সরাসরি আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
চিঠি অনুযায়ী, গ্রুপটি বিপুল পরিমাণ পণ্য স্বল্পমেয়াদি ডলারভিত্তিক অর্থায়নের (ইউপাস এলসি) মাধ্যমে আমদানি করে। টাকার এই তীব্র অবমূল্যায়নের ফলে বৈদেশিক মুদ্রাজনিত ক্ষতি নগদ প্রবাহে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। একই টাকার ঋণ সীমায় এখন আগের তুলনায় অনেক কম পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে, ফলে অনুমোদিত ঋণের ডলার সমমান প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুদের হার বৃদ্ধি। চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশীয় মুদ্রায় ঋণের সুদহার ৪-৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে, আর ডলারে নেওয়া ঋণের সুদহার ২০২২ সালে ৩-৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৯-১০ শতাংশ হয়েছে। এলসি খোলা ও নিশ্চিতকরণ খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সেই বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপানো সম্ভব হয়নি।
সংকটের তৃতীয় বড় কারণটি হলো গ্যাস সংকট। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে ছয়টি বৃহৎ শিল্প-কারখানা গড়ে তুললেও এখনো গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়নি। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত সরবরাহের পাশাপাশি হোসেন্দী জোনে কয়েক বছর অপেক্ষা করেও সংযোগ না পাওয়ায় বিপুল বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে, অথচ অর্থায়ন ব্যয় ও কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে।
আর্থিক খাতে আতঙ্ক ও বাঁচাতে চায় টান
সিটি গ্রুপের এই সংকট কেবল কোম্পানির内部 নয়, বরং দেশের আর্থিক খাতেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। চিঠিতে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির ২৪টি কোম্পানিতে মোট ৩৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) অর্থায়ন রয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বেসরকারি খাতের প্রথম সারির বাণিজ্য ব্যাংক এবং কয়েকটি বিদেশি ব্যাংকও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বৃহৎ কনগ্লোমারেটের এই আর্থিক চাপ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘খেলাপি’ ঘোষণা করা হলে তা ব্যাংক খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু সিটি গ্রুপ দাবি করছে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে টানা ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা কখনো ঋণ খেলাপি হয়নি। গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান বলেছেন, “যেসব কারণে এই পরিস্থিতি, সেগুলোর কোনোটিই আমাদের সৃষ্ট নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসহায়তা দিলে সিটি গ্রুপের পাশাপাশি দেশের ব্যাংক ও অর্থনীতি লাভবান হবে।”
সাত দফায় কী চেয়েছে সিটি গ্রুপ?
সৃষ্ট সংকট উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে ৭ দফা সুপারিশ করেছে সিটি গ্রুপ। সেগুলো হলো:
১. ঋণ শ্রেণীকরণ স্থগিত: আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্যমান ঋণ খেলাপি (শ্রেণীকরণ) না করার নির্দেশনা।
২. চলতি মূলধন সহায়তা: ব্যাংকগুলো যেন নিয়মিত পরিশোধের শর্তে ‘ইউসি’ (নিয়মিত) মর্যাদা বজায় রেখে শূন্য মার্জিনে অতিরিক্ত কার্যকর মূলধন দেয়।
৩. ঋণসীমার ছাড়: প্রযোজ্য ক্ষেত্রে একক গ্রুপভিত্তিক ঋণসীমা অতিক্রমের অনুমতি, যা ব্যাংকগুলোর রেগুলেটরি মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
৪. সুদহার নির্ধারণ: ঋণের সুদহার ঋণদাতার তহবিল ব্যয়ের সঙ্গে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ (এক অঙ্কে) নির্ধারণ এবং জরিমানা সুদ না আরোপ।
৫. ডাউন পেমেন্ট ছাড়: কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনঃতফসিল করতে চাইলে বকেয়া ঋণের ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে গ্রহণের অনুমতি।
৬. বিনিময় হার ক্ষতি পুনরুদ্ধার: ২০২২ সালের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ক্ষতির ৮০ শতাংশ (১,৭৮৩ কোটি টাকা) টার্ম লোন সুবিধা হিসেবে পাওয়ার জন্য নির্দেশনা।
৭. নমনীয় এলসি সুবিধা: শূন্য শতাংশ মার্জিনে অতিরিক্ত এলসি সুবিধা প্রদান।
এছাড়া গ্রুপটি জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে তাদের সামগ্রিক ঋণ পোর্টফোলিও পর্যালোচনার জন্য আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং (ইওয়াই) নিয়োগ করেছে এবং ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে একটি বিস্তারিত ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনা বাংলাদেশ ব্যাংকে উপস্থাপন করবে।
শুধু সিটি গ্রুপ নয়, বড় প্রশ্ন অর্থনীতির জন্য
সিটি গ্রুপের এই সংকটকে অনেকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটের একটি উপসর্গ হিসেবে দেখছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারি কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, গ্রুপটি দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোজ্যতেল, ৪০ শতাংশ চিনি ও ২৫ শতাংশ আটার বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। গ্রুপটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ২৫ হাজার কর্মী এবং লক্ষাধিক খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী।
একজন শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটি একটি ‘টু বিগ টু ফেইল’ পরিস্থিতি। যদি সিটি গ্রুপ ডিফল্ট করে, তবে শুধু ব্যাংক খাতই নয়, পুরো ভোগ্যপণ্যের বাজামূল্য স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। অন্যদিকে, পৃথকভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে এতটা নীতিগত সুবিধা দেওয়া নৈতিক বিপদজনক (মোরাল হ্যাজার্ড) হতে পারে।”
বাংলাদেশ ব্যাংক এখন কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখে। একদিকে দেশের সর্ববৃহৎ একটি শিল্পগোষ্ঠী ও ভোগ্যপণ্যের বাজার টিকিয়ে রাখা, অন্যদিকে শৃঙ্খলাহীনতার পথ না খুলে দেওয়া— এই দোলাচলে পড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ‘জনস্বার্থের’ সংজ্ঞাটি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সিটি গ্রুপের আবেদনের নিষ্পত্তি আগামী দিনের অর্থনীতির দিকনির্দেশনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
[প্রতিবেদনটি বণিক বার্তা ও অন্যান্য সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে]





