বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার দ্রুত বাড়লেও পুরোপুরি ক্যাশলেস অর্থনীতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সচেতনতার ঘাটতি এবং লেনদেন খরচ–এসব কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ, নীতিগত সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে এই বাধা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে কথা বলেছেন এক ডিজিটাল পেমেন্ট বিশেষজ্ঞ।
উবা: দীর্ঘদিন ধরে ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার কথা বলা হলেও কেন এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই?
আরফান আলী: ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি বাস্তবায়নে আমাদের বেশকিছু সমস্যা আছে। আমাদের অবকাঠামো এখনো সেই মাত্রায় উন্নত নয়। এখনো দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ নগদ লেনদেন করে। মানুষের অভ্যস্ততা, আর্থিক সাক্ষরতার অভাব এবং ডিজিটাল লেনদেনে মানুষ কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে–এগুলোই বড় সমস্যা। বিশেষ করে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার অত্যন্ত কম। নেটওয়ার্ক চার্জেসও এখনো তেমন অনুকূল না। আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ এবং অপারেটর (এসপিএসপি) খরচ। এই খরচ কমিয়ে না আনা পর্যন্ত লোকজনের কাছে ডিজিটাল পেমেন্ট ততটা গ্রহণযোগ্য হবে না। অর্থাৎ ক্যাশলেস অর্থনীতি বাস্তবায়নের জন্য কিছু মৌলিক শর্ত প্রয়োজন যেমন–সবার কাছে স্মার্টফোন এবং একটি ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট থাকা। বাস্তবে এখনো অনেক মানুষের এসব সুবিধা নেই। এছাড়া কম খরচে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার সুযোগ সীমিত থাকাও একটি বড় বাধা। ডিজিটাল লেনদেনকে নগদ লেনদেনের চেয়ে কম ব্যয়বহুল হতে হবে, তবেই মানুষ এটা ব্যবহার করবে। এছাড়া ইন্টার-অপারেবিলিটির সীমাবদ্ধতা—সব ব্যাংক ও এমএফএস প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয় এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। এই বিষয়ে প্রচারণাও বাড়াতে হবে।
উবা: ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি আমাদের জন্য কেন দরকার?
আরফান আলী: ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি আমাদের জন্য অনিবার্য। এখানে আমাদের যেতেই হবে। এর অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথমত, আর্থিক খাতের পরিবর্তন এবং পরিশোধ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দ্বিতীয়ত, অর্থের সঞ্চয়ান এবং অবৈধ অর্থের লেনদেন থেকে মুক্তি পাওয়া, তৃতীয়ত, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে ত্বরান্বিত করতে হলে ডিজিটাল ছাড়া সম্ভব না। আমাদের দেশে ব্যাংকগুলোর যে ধীরগতি, তাতে সবার জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হবে না। ফলে পরিশোধ ব্যবস্থা ডিজিটাইজেশন ছাড়া খুব বেশি কিছু অর্জন করা যাবে না। সেই অর্থে ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকও এই খাতে গুরুত্বারোপ করে বেশকিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে।
উবা: ক্যাশলেস বাংলাদেশ বিনির্মাণে লেনদেনের খরচ কতটা প্রভাব ফেলবে?
আরফান আলী: ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মার্চেন্টদের পেমেন্ট রিসিভ করার খরচ বা (এমডিআর) একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এই চার্জ যত কমানো যাবে, ডিজিটাল পেমেন্টের গ্রহণযোগ্যতা তত বাড়বে। ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করলে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত চার্জ বহন করতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিরুৎসাহিত করে। তাই মার্চেন্ট চার্জ যত কমানো যাবে, তত দ্রুত ডিজিটাল পেমেন্টের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
উবা: এই সমস্যা সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
আরফান আলী: বাংলাদেশ ব্যাংক এই সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করছে এবং ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসারে বিভিন্ন প্রচারণা চালাচ্ছে। মার্চেন্টরা যেন অতিরিক্ত চার্জের ভয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে অস্বীকৃতি না জানায়, সেই পরিবেশ তৈরি করতে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিমালা প্রণয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকগুলোর ওপর নির্দেশনা দেওয়ার মাধ্যমে কাজ করছে। একই সঙ্গে ক্যাশলেস কার্যক্রম তদারকির জন্য ব্যাংকগুলোয় আলাদা ইউনিট গঠনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি একটি সার্কুলার জারি করেছে যেখানে প্রতিটি ব্যাংকের হেড অফিসে ক্যাশলেস বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য একটি আলাদা ইউনিট রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ইউনিটগুলো ক্যাশলেস লেনদেনের সুবিধা-অসুবিধা তদারকি করবে, যা পরোক্ষভাবে এমডিআরের মতো খরচগুলো নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে।
উবা: হোয়াইট লেভেল এজেন্ট’ উদ্যোগটি কী?
আরফান আলী: বাংলাদেশ ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক এবং জয়তুন বিজনেস সলিউশন যৌথভাবে ‘হোয়াইট লেভেল এজেন্ট বুথ’ নিয়ে একটি পাইলট প্রজেক্ট শুরু করতে যাচ্ছে। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে লেনদেনের খরচ কমিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাংকিং সেবা আরও সহজলভ্য করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জয়তুন বিজনেস সলিউশন এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের পার্টনারশিপ মূলত ‘হোয়াইট লেভেল এজেন্ট’ বা ‘ফিন্যান্সিয়াল কিওস্ক’ পরিচালনার মাধ্যমে ক্যাশলেস ব্যাংকিং সেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করবে। এই পার্টনারশিপের অধীনে এমন কিছু এজেন্ট বুথ তৈরি করা হবে যেখানে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকের ব্যানার থাকবে না। এটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ‘ফাস্ট ট্র্যাক’-এর মতো একটি অবকাঠামো হবে, কিন্তু এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সহায়তায় জয়তুনের এই বুথগুলো থেকে যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস সেবা গ্রহণকারী গ্রাহক লেনদেন করতে পারবেন। আবার যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, তাদের জন্য জয়তুনের এই বুথগুলোয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে বা অনলাইনে (ই-কেওয়াইসির মাধ্যমে) নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা থাকবে। এই পার্টনারশিপের মাধ্যমে গ্রাহকরা তাদের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (যেমন–বিকাশ বা নগদ) অ্যাকাউন্টেও টাকা জমা দেওয়ার সুবিধা পাবেন। বর্তমানে তাদের ৩০০টি বুথ রয়েছে। তবে জয়তুন ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের লক্ষ্য হলো আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে (৮৭ হাজার) একটি করে ফিন্যান্সিয়াল কিওস্ক বা বুথ স্থাপন করা, যাতে প্রতিটি গ্রামের মানুষ ঘরের কাছেই ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা পায়। জয়তুন এই প্রযুক্তিগত অবকাঠামো অর্থাৎ বিলি ডিজিটাল বুথের সুবিধা দিবে এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ব্যাংকিং পার্টনার হিসেবে এর আর্থিক লেনদেনের বৈধতা ও নিশ্চয়তা দেবে। এটি একটি নতুন ধরনের ফিন্যান্সিয়াল কিওস্ক, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকের ব্যানার থাকবে না। সব ব্যাংকের গ্রাহক এখানে লেনদেন করতে পারবেন। এটি এক ধরনের সর্বজনীন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। এই কিওস্কগুলো থেকে যেকোনো ব্যাংকে টাকা জমা ও উত্তোলন, নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে লেনদেন করা যাবে। ফলে মানুষ খুব সহজে ও দ্রুত ব্যাংকিং সেবা পাবে। বর্তমানে কয়েক শ’ বুথ চালু রয়েছে।
উবা: এর জন্য কী করণীয়?
আরফান আলী: ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আমাদের অনেক পলিসি বা নীতি তো আছেই, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব নীতি রয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়ন বাড়াতে হবে। যেমন–আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে সবার জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগ ও সমন্বয়ের অভাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অগ্রগতি হচ্ছে না। এ ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশে দেখেছি, সরকার ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। যদিও ডিজিটালি কেউ লেনদেন করলে তাকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে সরকার থেকে আসেনি। তবে এগুলো থাকা উচিত, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে নগদবিহীন লেনদেন করতে অভ্যস্ত হয়।
উবা: দেশের ৮৫ শতাংশ মানুষই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে যুক্ত। তাদের কীভাবে ডিজিটাল অর্থনীতির আওতায় নিয়ে আসা যাবে?
আরফান আলী: এজন্য সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে বেশকিছু উদ্যোগ নিতে হবে। ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সস্তা করে আনতে হবে এবং মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। তাহলেই মানুষ নগদ লেনদেনের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনে এগিয়ে আসবে। এজন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, ব্যাংকিং লেনদেনের চার্জ কমিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং সেবার মান বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকগুলোকে তাদের সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে টার্গেট অরিয়েন্টেড হয়ে গ্রামীণ বা প্রান্তিক এলাকার গ্রাহকদের সেবা দিতে বাধ্য করতে হবে। চতুর্থত, সরকার ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে পারে। পঞ্চমত, অবকাঠামো যারা তৈরি করে এবং পেমেন্টকে স্মুথ করে, সরকার তাদের সাপোর্ট করবে। অপারেটর, পিএসপি, পিএসওদের এগিয়ে আসতে হবে। ষষ্ঠত, সরকার এক্ষেত্রে কিছু প্রণোদনা বা কর রেয়াতের ব্যবস্থা করতে পারে। বাংলাদেশে ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও এখনো বেশ কিছু কাঠামোগত ও আচরণগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তবে সমন্বিত উদ্যোগ, প্রযুক্তির বিস্তার এবং মানুষের সচেতনতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।





