480
ঢাকাশুক্রবার , ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  1. অনুসন্ধানী ও বিশেষ প্রতিবেদন
  2. অপরাধ-আইন ও আদালত
  3. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প
  4. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প-ব্যাংক-বীমা-নন ব্যাংক
  5. আইটি, টেলিকম ও ই-কমার্স
  6. আবাসন-ভূমি-রাজউক-রিহ্যাব
  7. উদ্যোক্তা-জীবনী
  8. করপোরেট ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
  9. কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ
  10. গণমাধ্যম
  11. গৃহায়ন ও গণপূর্ত
  12. জনশক্তি ও পর্যটন
  13. জনসংযোগ-পদোন্নতি ও সম্মাননা
  14. জাতীয়
  15. দুর্ঘটনা-শোক-দুর্যোগ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আইএমএফের ঋণে অনিশ্চয়তা, বিকল্প খুঁজছে সরকার

https://www.uddoktabangladesh.com/wp-content/uploads/2024/03/aaaaaa.jpg
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, ঢাকা :
এপ্রিল ২৪, ২০২৬ ১০:৫১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতা এবং আর্থিক খাতে প্রত্যাশিত সংস্কার না হওয়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের প্রতি অসন্তোষ জানিয়েছে, ফলে ১৩০ কোটি ডলারের ঋণের কিস্তির পাশাপাশি অতিরিক্ত দুই বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে সরকারি কোষাগারে চাপ বাড়ছে, যার ফলে চলতি অর্থবছরেই অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলার জোগানের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। আইএমএফের ঋণ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির এই দ্বিমুখী চাপ মোকাবিলায় সরকার বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে মোট ৩৪৫ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা চেয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বোর্ড অব গভর্নরসের বসন্তকালীন সভা শেষে দেশে ফিরে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের আলোচনা এখনও চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও বেশ কয়েকটি সংস্কার ইস্যুতে এখনো সমাধান হয়নি। সরকার নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার আশা, চলমান আলোচনার মাধ্যমে আইএমএফের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে ৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা চেয়েছে এবং এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে এআইআইবির কাছেও ৭৫ কোটি ডলার চাওয়া হয়েছে, যেখানে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এদিকে এডিবির কাছ থেকে নিয়মিত তহবিলের আওতায় মোট ১০০ কোটি ডলার (৭৫০ মিলিয়ন + ২৫০ মিলিয়ন) বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। ঋণের বিষয়টি চূড়ান্ত হলে আগামী মে মাসে এডিবির প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের সময় এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।

জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার কাছ থেকে তাৎক্ষণিক বাজেট সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ ৫০ কোটি ডলার সহায়তা চাইলেও জাইকা তা দিতে অপারগতা জানিয়েছে। তবে আগামী অর্থবছরের জন্য তারা আলোচনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে বাংলাদেশ এখন মোট ১২০ কোটি ডলার (৫০০ ও ৭০০ মিলিয়ন) সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছে। এ বিষয়ে অগ্রগতি আনতে জাইকার একটি প্রতিনিধিদল আগামী ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশ সফর করবে।

এই বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সাবেক ডেপুটি গভর্নর নজরুল হুদা বলেন, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। এতে রিজার্ভ ও চলতি হিসাবের ভারসাম্য বজায় থাকে। দেশীয় ঋণ নিলে বিনিয়োগ কমে আর টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। তবে ঋণ নেওয়ার আগে পরিশোধ সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার কৌশলগতভাবে আইএমএফের ওপর চাপ তৈরি করতেই অতিরিক্ত ঋণের প্রস্তাব দিয়েছে। কারণ আইএমএফ কর্মসূচি থেকে সরে গেলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরাও ঋণ সহায়তায় পিছিয়ে যেতে পারে। তাই একদিকে আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে সরকার, অন্যদিকে বিকল্প উৎস থেকেও অর্থ সংগ্রহের পথ খোলা রাখছে। একাধিক সূত্র জানায়, মূলত তিন কারণে আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড়ে বিলম্ব করছে—চুক্তি অনুযায়ী কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে ব্যর্থতা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পৃথক করার উদ্যোগ থমকে যাওয়া এবং সম্প্রতি পাস হওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের কিছু ধারা নিয়ে আইএমএফের আপত্তি, যা তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো সরকারেরই নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি ও অগ্রাধিকার সব ক্ষেত্রেই আইএমএফের শর্তের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। আগের সরকারের সময়ে করা কিছু চুক্তির শর্ত বর্তমান সরকারের কাছে পুনর্বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন- বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খাদ্য বা কৃষিতে ভর্তুকি। ফলে বাস্তবায়নে ধীরগতি তৈরি হয়েছে এবং তার প্রভাব পড়ছে ঋণ ছাড়ের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ঘাটতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে।

এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একদিকে বহুমুখী উৎস থেকে বাজেট সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের বৈশ্বিক সংকট এড়াতে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। একইসঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সংস্কার কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা নজরুল হুদা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করবে— এটি স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। তার মতে, এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে বাজেট সহায়তা নেওয়া অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। এতে যেমন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে তেমনি চলতি হিসাবে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ভারসাম্য বজায় রাখতেও সহায়তা করবে। তিনি বলেন, সরকার যদি এই ঘাটতি পূরণের জন্য বিদেশি উৎসের পরিবর্তে দেশীয় উৎসের ওপর নির্ভর করত তাহলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত। কারণ দেশীয় উৎস থেকে ঋণ নিতে হলে সরকারকে হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করতে হতো, নয়তো বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে হতো।

সাবেক এই ডেপুটি গভর্নর বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে অর্থ জোগান দিলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, ফলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। তার মতে, এ পরিস্থিতিতে দাতা সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়াই তুলনামূলকভাবে বেশি বাস্তবসম্মত ও ইতিবাচক বিকল্প, কারণ বিদেশি ঋণের সুদের হার সাধারণত কম এবং পরিশোধের সময়সীমাও দীর্ঘ হয়, যা বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি দেয়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ধারাবাহিকভাবে ঋণ নেওয়ার ফলে দেশের ঋণের বোঝা বাড়ছে, তাই বিদেশি ঋণ গ্রহণের আগে পরিশোধ সক্ষমতা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।