ব্যাংক খাতে দুই বছরের বেশি সময়ে আমানত, বিনিয়োগ ও সম্পদে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি, আমদানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা মন্থর গতি লক্ষ করা গেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। এ সময় প্রচলিত ব্যাংকগুলো মোট আমানতের প্রায় ৭৭ দশমিক ৮২ শতাংশ নিয়ে আধিপত্য বজায় রেখেছে। অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকগুলোর দখলে আছে মোট আমানতের ২২ দশমিক ১৮ শতাংশ। এ হিসাবে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে ৩ দশমিক ৯২ ট্রিলিয়ন টাকা বা ৩ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা।
খাত-বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আমানতকারীদের একটি বড় অংশ নিরাপত্তার কারণে প্রচলিত ব্যাংকের দিকে ঝুঁকেছেন। আস্থা পুনরুদ্ধার, সুশাসন জোরদার এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের মাধ্যমে খাতটির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। একই সময়ে বিনিয়োগ খাতেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। মোট বিনিয়োগ বেড়ে ২৪ দশমিক ১২ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। তবে মুদ্রাস্ফীতি, বিনিময় হারে অস্থিরতা এবং কঠোর তদারকির কারণে ব্যাংকগুলো সতর্ক বিনিয়োগ কৌশল অনুসরণ করেছে।
ব্যাংক খাতে মোট সম্পদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বরে মোট আমানত ছিল ১৭ দশমিক ৫৪ ট্রিলিয়ন টাকা যা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪৬ ট্রিলিয়ন টাকা। এই সময়ে আমানত সংগ্রহে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর অবদান ৭৭ দশমিক ৮২ শতাংশ। আর শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অবদান ২২ দশমিক ১৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে প্রচলিত ব্যাংকগুলোয় আমানত দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৭০ ট্রিলিয়ন টাকা যা জানুয়ারিতে ছিল ১৬ দশমিক ৪৬ ট্রিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ এক মাস ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। আমানত ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১৪ দশমিক ৮৩ ট্রিলিয়ন টাকা। এ হিসাবে বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ২০২৪ সালের অস্থিরতার পর আমানতকারীদের একটি বড় অংশ নিরাপত্তার কারণে প্রচলিত ব্যাংকের দিকে ঝুঁকেছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ধীরে ধীরে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতিও আস্থা ফিরে আসছে। সুশাসনে জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই খাতের স্থিতিশীলতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তার মতে, তারল্য সহায়তা, ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ, ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতা বাড়াতে প্রশাসক নিয়োগের মতো পদক্ষেপে ইসলামি ব্যাংকগুলোর প্রতি আস্থা ফিরছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শরিয়াভিত্তিক আমানত দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৭৬ ট্রিলিয়ন টাকা যা জানুয়ারিতে ছিল ৪ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন টাকা। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ অঙ্ক ছিল ৪ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ।
সমীক্ষায় আরও দেখা যায়, আমানতকারীরা প্রধানত মুদারাবাভিত্তিক আমানতের ওপর নির্ভরশীল যা ইসলামি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের প্রায় ৮৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতের ভিত্তি ছিল বেসরকারি খাত যা মোট আমানতের প্রায় ৯০ দশমিক ৩২ শতাংশ।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিনিয়োগেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২ বছর ৪ মাসে ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে বিনিয়োগ ছিল ১৮ দশমিক ৯৯ ট্রিলিয়ন টাকা যা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ১২ ট্রিলিয়ন টাকা। এই সময়ে বিনিয়োগের ৭৫ দশমিক ৬২ শতাংশই হয় প্রচলিত ব্যাংকে। আর শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোয় ছিল বিনিয়োগের ২৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। প্রচলিত ব্যাংকগুলোয় ফেব্রুয়ারি শেষে বিনিয়োগের অঙ্ক দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ২৪ ট্রিলিয়ন টাকা যা জানুয়ারিতে ছিল ১৮ দশমিক শূন্য ৩ ট্রিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১ দশমিক ১৯ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে জানা যায়, শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫ দশমিক ৮৮ ট্রিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ করলেও ফেব্রুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যর্থ হয়। তবে বছরের ব্যবধানে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আগের বছরের একই সময় বিনিয়োগ হয় ৫ দশমিক ২৮ ট্রিলিয়ন টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংক খাতে সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মোট সম্পদ ৩৬ দশমিক ৩২ ট্রিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে পৌঁছে ৪৫ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন টাকায়। এ হিসাবে প্রবৃদ্ধির হার ২৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এই হারে ওঠানামা থাকলেও সার্বিক বিবেচনায় ইতিবাচক। ফেব্রুয়ারিতে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৯২ ট্রিলিয়ন টাকায়। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হলেও খেলাপি ঋণ, উচ্চ তহবিল ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ তাদের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর সম্পদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়ন টাকা। এতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। শরিয়াভিত্তিক অর্থায়নের চাহিদা বৃদ্ধিই এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে জানা গেছে, রপ্তানি আয় সার্বিকভাবে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ বাড়লেও ২০২৬ সালের শুরুতে কমেছে। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি আয় কমে দাঁড়ায় ৩১৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। প্রচলিত ব্যাংক এখনও ৮০ শতাংশের বেশি রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমদানি পরিশোধে স্থিতিশীলতা থাকলেও ২০২৬ সালের শুরুতে কমতে দেখা গেছে। প্রচলিত ব্যাংকে বার্ষিক ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ইসলামি ব্যাংকে ২২ দশমিক ৭২ শতাংশ কমেছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো আধিপত্য রেখেছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত ৪০ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকের দখলে। ইসলামি ব্যাংকগুলোয় জনবল বার্ষিক ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ কমেছে যা ডিজিটাইজেশন ও ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক খাতে ডিপোজিট বেড়েছে। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ। প্রচলিত ব্যাংকের পাশাপাশি এখন শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোয়ও আমানত বাড়ছে। শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোয় আগের বছরের তুলনায় আমানত বেড়েছে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ।





