জনকল্যাণ, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এলকেএসএস‑হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার‑কে ঘিরে একে এক গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)‑এর সংশ্লিষ্ট এই সমবায়‑ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য, নথি জালিয়াতি, কর ফাঁকি, কর্মীর অর্থ আত্মসাৎ এবং সরকারি তহবিল থেকে ব্যক্তিগত দায় মেটানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র।
লাইসেন্স জালিয়াতি ও টেন্ডার বাণিজ্য
২০১৭ সাল থেকে আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হলেও, এলকেএসএস ২০১৮ সালে লাইসেন্স আবেদন করে যাচাইয়ে বিস্তর অসঙ্গতির কারণে তা বাতিল হয়। তবুও লাইসেন্স ছাড়াই লাইসেন্স আবেদনের ফটোকপি ব্যবহার করে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডারে এগিয়ে এসে কার্যাদেশ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করে, এভাবে তারা হাজার কোটি টাকার সরকারি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেছে।
কর ফাঁকি: টিআইএন‑ভ্যাট জালিয়াতি
২০১৮ সাল থেকে প্রায় দশ বছর ধরে ভুয়া টিআইএন (TIN) ও ভ্যাট (BIN) নম্বর ব্যবহার করে এলকেএসএস হাজার কোটি টাকার কার্যাদেশ উত্তোলন করেছে। প্রকৃত TIN ইস্যু হয় ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ এবং VAT নিবন্ধন ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, তার আগে প্রায় ৫৬০০ কর্মীর বেতন থেকে বছরে ১৫% হারে কর ধার্য করে মোট প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎয়ের অভিযোগ আছে। তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে, অবৈধ বিল বা হিসাব পত্রের মাধ্যমে এই অর্থ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাথে ভাগাভাগি করা হয়েছিল বলে গত বছরগুলোতে অভিযোগ উঠেছে।
নিয়োগ বাণিজ্য ও “প্রভাব খাটানো”
এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল সরবরাহের নামে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র সুবিধা নিয়েছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের একটি গোষ্ঠী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার পরিবর্তে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে পছন্দের ক্ষেত্রে কাজ পাইয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া এভাবে বিকৃত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কর্মীদের প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ
লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর প্রায় এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ কর্মীদের জন্য যৌথ ব্যাংক হিসাবে জমা রাখার বাধ্যবাধকতার কথা বলে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ থেকে প্রায় ৫৬০০ জন কর্মী সরবরাহ করেছে বলে দাবি করেছে। সে হিসেবে কর্মীদের হিতার্থে জমা হওয়ার কথা প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি। তবে সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, এই অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
নথি জালিয়াতি, ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও ঠিকানা বিতর্ক
তদন্তের সময় বিভিন্ন দরপত্রে জমা দেওয়া অভিজ্ঞতার সনদ, কাগজপত্র ও হিসাবে গুরুতর বিস্তর গরমিল পাওয়া গেছে। এছাড়া, প্রকৃত লাইসেন্স গ্রহণকৃত নাম এলকেএসএস‑হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার (TRAD/DNCC/03607/2021) হলেও কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে “এলকেএসএস‑এইচআরসি” নামে। ঢাকা নর্থ ও সাউথ সিটি কর্পোরেশনের নথি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ঠিকানায় “এলকেএসএস‑এইচআরসি” নামে কোনো বৈধ প্রতিষ্ঠান নেই বলে দেখানো হয়েছে। এটি ঠিকানা ও নামে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও জালিয়াতির অভিযোগ তৈরি করেছে।
সরকারি টাকায় ‘ফুড ভিলেজ’ ও সাড়ে ১৩ কোটি টাকার গচ্চা
সিরাজগঞ্জের হাটিকামরুল মোড়ের একটি জনপদে এলকেএসএস “ফুড ভিলেজ” নির্মাণ করে, যা এলজিইডির প্রকল্পের অর্থে তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভবনটি পরে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া দেওয়া হয় এবং প্রায় ৬ কোটি টাকা অগ্রিম উত্তোলন করা হয়। কিন্তু টাকাটি সরকারি হিসাবে জমা দেওয়া হয়নি। পরে সরকার জায়গাটি অধিগ্রহণ করলে ভাড়াদারের উন্নয়ন বাবদ তাকে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়, যা এলজিইডির তহবিল থেকে পরিশোধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা এই অর্থ ব্যবহারকে সরাসরি সরকারি টাকার তছরুপ হিসেবে দেখছে।





