শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির আগের আর্থিক বিবরণীর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড-এর প্রি-আইপিও হিসাব গভীরভাবে যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেন—উপ-পরিচালক মো. রফিকুন্নবী, সহকারী পরিচালক মো. শাকিল আহমেদ এবং বিভাস ঘোষ।
কমিশনের এক সভায় কোম্পানিটির প্রি-আইপিও সময়ের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অধিকতর যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সেই সিদ্ধান্তের আলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কোম্পানির আইপিওতে আসার আগের তিন বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সার্বিক তথ্য খতিয়ে দেখবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।
বিএসইসি মনে করছে, শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এই তদন্ত প্রয়োজন। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ধারা ২১ এবং সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় এ তদন্ত পরিচালিত হবে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ৯৮৫তম কমিশন সভায় এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তদন্তের অংশ হিসেবে কোম্পানির তিন বছর বা তার বেশি সময়ের প্রি-আইপিও নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করা হবে। আর্থিক প্রতিবেদনে সম্পদ, দায়, ইকুইটি, মুনাফা ও নগদ প্রবাহ সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না তা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক হিসাব মান (আইএএস), আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) এবং আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মান (আএসএ) অনুসরণ করা হয়েছে কি না সেটিও পরীক্ষা করা হবে।
এছাড়া বিক্রয়, কস্ট অব গুডস সোল্ড, হিসাব গ্রহণযোগ্য, মজুদ, কাঁচামাল ক্রয়সহ সংশ্লিষ্ট তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হবে। কোম্পানির কারখানা, যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম, ভবন, জমি ও জমি উন্নয়নসহ বিভিন্ন সম্পদের বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হবে। কর-পূর্ব ও কর-পরবর্তী নিট মুনাফার সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে দাখিলকৃত তথ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না সেটিও তদন্তের আওতায় থাকবে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ২.১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ০.৭১ টাকা, যা আগের বছর ছিল ০.৯০ টাকা। আলোচ্য সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৪.৩২ টাকা।
প্রকৌশল খাতের এই কোম্পানিটি ২০১৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এবং বর্তমানে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১১৩ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং মোট শেয়ার সংখ্যা ১১ কোটি ৩৮ লাখ ২৮ হাজার ৩৬৮টি। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শেয়ার ধারণ অনুযায়ী উদ্যোক্তাদের হাতে ২৭.৫৭ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৯.৯৭ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫২.৪৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে ২ কোটি শেয়ার ছেড়ে ২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। তবে তালিকাভুক্তির পর থেকেই আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়ম, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল এবং শেয়ারের দরপতন নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও অস্বস্তিতে ফেলে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই তদন্তের মাধ্যমে কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজের আর্থিক স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





