সবুর হাওলাদার : টানা তিন অর্থবছর ধরে নিম্নমুখী ধারায় থাকা দেশের অর্থনীতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে আরও স্পষ্ট মন্দার সংকেত দিল। চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে—যা করোনা-পরবর্তী পুনরুদ্ধার সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চূড়ান্ত প্রাক্কলন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, সাময়িক হিসাবের ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ থেকে ৪৮ বেসিস পয়েন্ট কমে চূড়ান্ত প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। চূড়ান্ত হিসাবে দেশের অর্থনীতির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় ৩১ ডলার বেড়ে ২ হাজার ৭৬৯ ডলারে উন্নীত হলেও ২০২১-২২ অর্থবছরের সর্বোচ্চ ২ হাজার ৭৯৩ ডলারের রেকর্ড এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিলো ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। পরের ২০২১-২২ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। এর পরের টানা তিন অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমতির দিকে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়ায় । সর্বশেষ এই প্রাক্কলন গত তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক মন্দাভাবেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা এনে দিয়েছিল, যার নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থবছর ধরেই ছিল ।
বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ে ধস: দেশের প্রবৃদ্ধি মূলত উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি। তিনি বলেন, “যদি কোনো পণ্য উৎপাদন করা লাভজনক হয়, তবেই উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি বরং তা স্থবির হয়ে আছে। সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যায়নি। গত বছরের হিসাবগুলো মেলালেও দেখা যায় বিনিয়োগের পরিস্থিতি সন্তোষজনক ছিল না। এছাড়া বর্তমানে পণ্য উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন বাড়েনি।”
মুস্তফা কে মুজেরি আরও বলেন, “বর্তমানে বিনিয়োগের হার ৬ শতাংশের আশপাশে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। বর্তমানে যে পরিবেশ বিরাজ করছে তা বিনিয়োগের জন্য মোটেই সহায়ক নয়। বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসার মূল শর্ত হলো একটি বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং সামাজিক ও সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি নিশ্চিত করা। এই বিষয়গুলোর উন্নয়ন না করলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না এবং নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে না। অলস পড়ে থাকা অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলেই আমাদের বর্তমান অবস্থার উন্নতি ঘটবে।”
বিবিএসের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিলো ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। টানা দুই বছর কমার পর মাথাপিছু আয় ৩১ ডলার বেড়ে ২ হাজার ৭৬৯ ডলারে উন্নীত হয়েছে । তবে ২০২১-২২ অর্থবছরের সর্বোচ্চ ২ হাজার ৭৯৩ ডলারের রেকর্ড এখনও অটুট রয়েছে ।
খাতভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে। তবে একই সময়ে শিল্প খাতে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
কৃষিখাতে চূড়ান্ত হিসাব অনুয়ায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ। আগের সাময়িক হিসাব ছিল ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিলো ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ কমেছে।
বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিল্প খাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাবের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। অন্যদিকে সেবা খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে প্রবৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। যার সাময়িক হিসাব ছিল ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেবা খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।
অন্যদিকে বিবিএসের দেওয়া তথ্য মতে, বিনিয়োগ, দেশজ সঞ্চয় ও জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাতের হার কমতির দিকে রয়েছে। দেখা গেছে, গত এক বছরে বিনিয়োগের পরিমাণ ২ দশমিক ১৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ । ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যা ছিল ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ । দেশজ সঞ্চয় ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ কমে হয়েছে ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আর জাতীয় সঞ্চয় গত এক বছরে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
সামনের পথ: অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান এই মন্দাবস্থা কাটিয়ে উঠতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগে প্রাণ ফেরানো সম্ভব । মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আমদানি ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপও জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির জন্য অলস অর্থ সঠিক খাতে কাজে লাগানো এখন সময়ের দাবি।





