480
ঢাকাবুধবার , ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  1. অনুসন্ধানী ও বিশেষ প্রতিবেদন
  2. অপরাধ-আইন ও আদালত
  3. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প
  4. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প-ব্যাংক-বীমা-নন ব্যাংক
  5. আইটি, টেলিকম ও ই-কমার্স
  6. আবাসন-ভূমি-রাজউক-রিহ্যাব
  7. উদ্যোক্তা-জীবনী
  8. করপোরেট ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
  9. কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ
  10. গণমাধ্যম
  11. গৃহায়ন ও গণপূর্ত
  12. জনশক্তি ও পর্যটন
  13. জনসংযোগ-পদোন্নতি ও সম্মাননা
  14. জাতীয়
  15. দুর্ঘটনা-শোক-দুর্যোগ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নতুন সরকারের মূল্যস্ফীতি সামলানোই বড় চ্যালেঞ্জ

https://www.uddoktabangladesh.com/wp-content/uploads/2024/03/aaaaaa.jpg
জোনায়েদ সবুর, ঢাকা
ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬ ১:৩০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

জোনায়েদ সবুর : নতুন সরকার গঠন হয়েছে গতকাল। এ সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক থাকলেও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও প্রকট। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক-আর্থিক খাতসহ প্রায় সব খাতেই ব্যাপক লুটপাট, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ফলে দেশের মূল অর্থনীতি অনেকটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেও পুনরুদ্ধারের তেমন গতি বাড়াতে পারেনি। এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নতুন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হবে- অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি কমানো, কর্মসংস্থান বাড়ানো, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন।

নতুন সরকারের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গত জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, নির্বাচন, রোজা ও সরকারি কর্মীদের বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়তে পারে। তবে অর্থবছর শেষে তা কিছুটা কমতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকালীন মূল্যস্ফীতির প্রভাব যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে তা স্বল্পমেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হবে না। তারা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন-পরবর্তী তিন থেকে ছয় মাসে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক হতে সময় লাগে, যদি না আগেভাগে বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা দেখানো হয়।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি নিয়ে চেষ্টা করেছে। নীতি সুদহার ১০ শতাংশ এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৪-১৫ শতাংশ করা হলেও সেটি কাজে আসেনি। এতে বোঝা যাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আইএমএফের প্রেসক্রিপশন কাজ করেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।’

নির্বাচিত সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিকল্প কৌশল খুঁজতে হবে উল্লেখ করে সিপিডি সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই দাম বাড়িয়ে দেন। একইসঙ্গে ভোক্তারাও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনে মজুদ করেন। তিনি বলেন ‘নতুন সরকারের মূল্যস্ফীতি নাগালে রাখার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নির্বাচনকালীন সময়ে নগদ অর্থের লেনদেন ও ভোগ ব্যয় সাধারণত ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তিনি আরো বলেন, ডলার সঙ্কট ও আমদানি ব্যয়ের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ, যা আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। এই পটভূমিতে নির্বাচন একটি বাড়তি চাপ হিসেবে কাজ করছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে প্রতি মাসে হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সর্বশেষ ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা হয়েছে জানুয়ারির তথ্য। এতে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর আগে গত ডিসেম্বর ও নভেম্বরেও তা বেড়েছিল। সে হিসাবে টানা তিন মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ধারায়।
বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালের পর থেকেই দেশে মূল্যস্ফীতি উসকে উঠতে শুরু করে। ডলার সংকটের কারণে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে। প্রতি ডলার ৮৪ থেকে বেড়ে মাত্র আড়াই বছরে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। অল্প সময়ের ব্যবধানে টাকার প্রায় ৪৫ শতাংশ অবমূল্যায়নের ধাক্কায় দেশের মূল্যস্ফীতিও তীব্র আকার ধারণ করে। তা নিয়ন্ত্রণে ২০২৩ সাল থেকে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান তথা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। কিন্তু সংকোচনমুখী মুদ্রানীতিতেও মূল্যস্ফীতি তেমন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে, এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি। চাল, ভোজ্যতেল ও সবজির দামে সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই সঙ্কুচিত করে তুলছে।

সাবেক ব্যাংকার রুহুল আমিন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভেঙে যাওয়ার সুফল পাওয়ার কথা ছিল জনগণের। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে সেটির বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়নি। বরং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই এ সরকারের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে ব্যবসায়ী সৈয়দ মো. তাজুল বাশার তাপু বলেন, খাদ্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা, পাইকারি পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা, পরিবহনব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং আমদানিতে গতি আনতে নতুন সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে।

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী থাকায় দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ার কথা। কিন্তু উল্টো টানা চার মাস ধরে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্যই ছিল সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা।

এদিকে দেশের প্রধান খাদ্যপণ্য চালের বাজারে গত এক মাসে স্পষ্ট অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারি খাদ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩৯-৪০ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন হয় এবং চলতি আমন মৌসুমে উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি হয়নি। তবুও খুচরা বাজারে মোটা চালের কেজি এখন বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়, যা ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ছিল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। মাঝারি ও সরু চালের দাম একই সময়ে কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে চাল কিনতে আসা নিম্ন আয়ের মানুষ বলছেন, চালের দামে এই বাড়তি চাপ তাদের মাসিক ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে সরবরাহ প্রবাহ ধীর। মিল পর্যায়ে চালের মজুদ বাড়ছে। খাদ্য অধিদফতরের তথ্যে দেখা যায়, সরকারি গুদামে চালের মজুদ ১৫-১৬ লাখ টনের মধ্যে থাকলেও বেসরকারি পর্যায়ে মজুদের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অনেক মিল মালিক ভবিষ্যৎ পরিবহন ব্যয় ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় বাজারে ধীরে ধীরে চাল ছাড়ছেন, যা সরবরাহে চাপ তৈরি করছে।
অপরদিকে ভোজ্যতেলের বাজারেও একই চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২২-২৩ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ভোজ্যতেল আমদানির ব্যয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২-১৫ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাম ও সয়াবিন তেলের দামের ওঠানামা, ডলার সঙ্কট এবং এলসি খোলার জটিলতা এর প্রধান কারণ।

এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। সরকার নির্ধারিত দামে বোতলজাত সয়াবিন তেল অনেক বাজারেই মিলছে না। খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে এক মাসের ব্যবধানে ৮ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচন কেন্দ্রিক সময়টা আমদানিকারকরা ঝুঁকি কমাতে পণ্য ছাড়ছেন সীমিত পরিমাণে। এতে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকছে না। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে।