দেশের এক সময়কার ফ্যানের ব্যবসায় জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ছিল চট্টগ্রামের এশিয়া ফ্যান। ফ্যান ব্যবসার পাশাপাশি ইস্পাত কারখানা, জুতার কারখানা, ওভেন ব্যাগ, পাইপ ফিটিংসসহ বৈচিত্র্যময় ব্যবসার মাধ্যমে গড়ে তোলা হয় এশিয়া গ্রুপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম। এশিয়া গ্রুপের একাধিক কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত এক বছর ধরে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে তারা। বর্তমানে এ গ্রাহকের কাছে ব্যাংকটির খেলাপি পাওনার পরিমাণ ২২৪ কোটি টাকা। এর আগে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি হয়েছিল ৪৯ কোটি ২৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা। এছাড়া আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স, আইপিডিসির লেনদেন তেমন ভালো যাচ্ছে না।
এশিয়া গ্রুপ সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৫ সালে পরিবহন খাতের ব্যবসার মাধ্যমে এশিয়া গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর এশিয়া গ্রুপ হাবিব ফ্যান ব্র্যান্ডের নামে ফ্যান উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্প খাতে পথচলা শুরু করে। মূলত পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে ফ্যান ব্যবসা শুরু হয়েছিল। পাশাপাশি হাবিব মহিউদ্দিন, শফিক মহিউদ্দিন ও মাহবুব মহিউদ্দিনের মালিকানাধীন এশিয়া গ্রুপ চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ, বায়েজিদ ও কালুরঘাট মোহরা শিল্প এলাকায় স্টিল মিল, জিআই পাইপ, এমএস পাইপ, নন ওভেন ফেবিক্স উৎপাদন এবং আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। কিন্তু করোনার প্রভাবে ইস্পাত খাতের ব্যবসা সংকুচিত হয়। বর্তমানে এ স্টিল মিলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে। যার প্রভাবে গ্রুপের অন্যান্য ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলাফল বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণের পাওনা পরিশোধে হিমশিম খেতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। এতে একাধিক ব্যাংকের খেলাপি তালিকায় নাম উঠেছে এশিয়া গ্রুপের এশিয়া এলাইড ফেব্রিক্স লিমিটেড, এশিয়া ইভা ওয়্যার প্রোডাক্টস লিমিটেড, মাল্টি স্টিল কাস্টিংস লিমিটেড এবং মাহবুব ইলেকট্রিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ ইত্যাদি।
এক্সিম ব্যাংক পিএলসি সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামভিক্তিক এশিয়া গ্রুপের তিনটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে এক্সিম ব্যাংক পিএলসির সিডিএ অ্যাভিনিউ শাখা থেকে ঋণ সুবিধা নেওয়া হয়। কিন্তু গত এক বছর ধরে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে তারা। গত ১১ জানুয়ারিতে ব্যাংকটির খেলাপি গ্রাহকে পরিণত হয় হাবিব মহিউদ্দিন, শফিক মহিউদ্দিন ও মাহবুব মহিউদ্দিনের মালিকানাধীন এশিয়া গ্রুপের তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ব্যাংকটির কাছে এশিয়া গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের খেলাপি পাওনার পরিমাণ ২২৩ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে এশিয়া এলাইড ফেব্রিক্স লিমিটেডের ৯১ কোটি ২৪ লাখ, এশিয়া ইভা ওয়্যার প্রোডাক্টস লিমিটেডের ১৮ কোটি ১৭ লাখ এবং মাল্টি স্টিল কাস্টিংস লিমিটেডে ১১৪ কোটি ৩২ লাখ ৯১ হাজার টাকা। এ ব্যর্থতার দায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ব্যাংকের বন্ধকীতে থাকা এসব কোম্পানির বায়েজিদ শিল্পাঞ্চলের জমিসহ স্থাপনা, কালুরঘাট মোহরা শিল্পাঞ্চলে জমিসহ স্থাপনা, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা এলাকার একাধিক ইন্ডাস্ট্রিজের জমি, যন্ত্রপাতি নিলামে বিক্রিয়ের উদ্যোগ নিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এ নিলামে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি সিডিএ অ্যাভিনিউ শাখায় অনুষ্ঠিত হবে। এতে আগ্রহী ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠান উপস্থিত হয়ে এসব সম্পত্তি নিলামে কিনতে পারবেন।
অপরদিকে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামভিক্তিক এশিয়া গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাহবুব ইলেকট্রিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ ব্যবসার জন্য সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ওআর নিজাম রোড শাখা থেকে ঋণ সুবিধা নেয়, যা গত বছরের এপ্রিলে খেলাপি হয়ে পড়েছিল। এর আগে এক বছর ধরে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন। বর্তমানে ব্যাংকটির কাছে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি পাওনার পরিমাণ ৪৯ কোটি ২৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা। আর এ পাওনা আদায়ে ব্যাংকটি চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে, যা চলমান আছে। এ বিষয়ে ওয়ান ব্যাংক, আল আরাফা ইসলামী ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলেন, ‘এশিয়া গ্রুপের বিভিন্ন ব্যাংকের লেনদেন খারাপ যাচ্ছে। তাদের নিয়ে আমরা অনেক চিন্তায় আছি। উদ্যোক্তারা পাওনা নিয়মিত পরিশোধের কথা দিলেও কথা রাখতে পারছে না।’
খেলাপি ঋণ বিষয়ে এশিয়া গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ ওসমান বলেন, ‘সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক দুটিই এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে পড়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের লেনদেন এখন খারাপ যাচ্ছে। তবে আমাদের সঙ্গে অন্যান্য ব্যাংকের লেনদেন নিয়মিত। তাদের ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করার জন্য বলা হলেও তারা ঋণ নিয়মিত করছে না। তারা পুরো ঋণ পরিশোধে চাপ দিচ্ছে। এখন ব্যবসা-বাণিজ্যির অবস্থা খারাপ। এসব বিষয় তো বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এলে তখন ব্যবসা-বাণিজ্যি ভালো হবে।
এ বিষয়ে এক্সিম ব্যাংকের সিডিএ এভিনিউ শাখা ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এশিয়া গ্রুপের তিন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এশিয়া এলাইড ফেব্রক্সি লিমিটেড, এশিয়া ইভা ওয়্যার প্রোডাক্টস লিমিটেড এবং মাল্টি স্টিল কাস্টিংস লিমিটেড এখন আমাদের খেলাপি গ্রাহক। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের প্রায় ২২৪ কোটি টাকা খেলাপি। গত এক বছর ধরে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন। তারা ঋণ নিয়মিত করার কথা বলেন, কিন্তু কোনো টাকা পরিশোধ করেন না। তাদের ব্যবসা বাণিজ্যিও অনেক কমেছে। আবার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক উৎপাদন বন্ধ আছে। এছাড়া চেক প্রত্যাখ্যানেরও একাধিক মামলা চলমান আছে। ফলে খেলাপি পাওনা আদায় নিয়ে বেশ চিন্তিত আছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকের চেক প্রত্যাখ্যানের মামলার মতো হওয়া উচিত। মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসামিকে গ্রেপ্তার করা জরুরি। তাহলে খেলাপিরা সময় নষ্ট করার সুয়োগ নিতে পারবে না। কারণ টাকাগুলো এসব টাকা সাধারণ জনগণের আমানত। আমাদের জনগণের টাকা মুনাফাসহ ফেরত দিতে হবে। তাই খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হতে হবে।’





