480
ঢাকারবিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  1. অনুসন্ধানী ও বিশেষ প্রতিবেদন
  2. অপরাধ-আইন ও আদালত
  3. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প
  4. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প-ব্যাংক-বীমা-নন ব্যাংক
  5. আইটি, টেলিকম ও ই-কমার্স
  6. আবাসন-ভূমি-রাজউক-রিহ্যাব
  7. উদ্যোক্তা-জীবনী
  8. করপোরেট ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
  9. কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ
  10. গণমাধ্যম
  11. গৃহায়ন ও গণপূর্ত
  12. জনশক্তি ও পর্যটন
  13. জনসংযোগ-পদোন্নতি ও সম্মাননা
  14. জাতীয়
  15. দুর্ঘটনা-শোক-দুর্যোগ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভুয়া সম্পদ দেখিয়ে আইপিও’র শত কোটি টাকা গায়েব করে লুব-রেফ বাংলাদেশ

https://www.uddoktabangladesh.com/wp-content/uploads/2024/03/aaaaaa.jpg
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ ডেস্ক:
ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬ ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ভালো আয়ের তথ্য দেখিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা বলে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আইপিও এনে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল লুব-রেফ বাংলাদেশ। তবে যে মুনাফা ও সম্পদ দেখিয়ে ওই অর্থ তোলা হয়েছিল, তা বাস্তবে ভুয়া বলে প্রমাণ পেয়েছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। আইপিওর পাঁচ বছর পর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে লুব-রেফের এই প্রতারণার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পদ কেনার নামে ভুয়া ব্যয় দেখিয়ে আইপিও থেকে তোলা প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য তুলে ধরেছে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান ইসলাম জাহিদ অ্যান্ড কোম্পানি।

জ্বালানি খাতে তালিকাভুক্ত লুব-রেফ বাংলাদেশের প্রধান পণ্য ‘বিএনও লুব্রিক্যান্ট’। কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুবাইয়া নাহার এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তার স্বামী মোহাম্মদ ইউসুফ। পর্ষদে শেয়ারহোল্ডার পরিচালক হিসেবে রয়েছেন তাদের দুই সন্তান মো. সালাউদ্দিন ইউসুফ ও ড. ইসরাত জাহান। বিতর্কিত ইস্যু ম্যানেজার এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে ২০২১ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি।

বছরের শুরুতে শেয়ারবাজারে আইপিও ছাড়ার মাধ্যমে লুব-রেফ বাংলাদেশ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, এর মধ্যে ৪৬ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধে, ৬ কোটি টাকা আইপিও সংশ্লিষ্ট খরচে এবং ৯৮ কোটি টাকা যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্থাপনে ব্যয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। আইপিও ফান্ড ইউটিলাইজেশন রিপোর্টে কোম্পানি দাবি করে, ৮৫ কোটি টাকা যন্ত্রপাতি কেনা, জমি উন্নয়ন ও পূর্ত কাজে ব্যয় করা হয়েছে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবে এসব ব্যয়কে ‘ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে নিরীক্ষক সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে এসব সম্পদের কোনো অস্তিত্ব পাননি। এ বিষয়ে লুব-রেফের অনিয়ম প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, আইপিও ফান্ড ব্যবহারে কোনো ধরনের অনিয়ম কমিশন সহ্য করবে না এবং লুব-রেফের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ৩০ জুন ৫৮৪ কোটি ৪০ লাখ টাকার ‘স্থায়ী সম্পদ’ আছে বলে লুব-রেফ আর্থিক হিসাবে উল্লেখ করেছে। তবে কোম্পানির শিফট ইঞ্জিনিয়ারের উপস্থিতিতে সরেজমিনে যাচাইয়ে গিয়ে ১১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার সম্পদের হদিস মেলেনি। এখানেই শেষ নয়, কোনো নির্মাণাধীন প্রকল্প বা ‘ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস’ ছাড়াই টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভুয়া সম্পদ দেখিয়েছে। তারা আইপিওর টাকা দিয়ে প্রকল্প নির্মাণ করছে বা প্রকল্প কাজ চলমান হিসাবে ভুয়া তথ্য দিয়ে পুরো টাকা গায়েব করেছে।

২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আর্থিক হিসাবে লুব-রেফ বাংলাদেশ আইপিওর অর্থে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে ২১২ কোটি ২৬ লাখ টাকা ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস (সিডব্লিউআইপি) দেখিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে হিসাবভুক্ত করা হয়। তবে এসব ব্যয়ের পক্ষে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষকের কাছে কোনো বুকস অব অ্যাকাউন্টস বা সাপোর্টিং ডকুমেন্টস উপস্থাপন করতে পারেনি। এরপর নিরীক্ষক সিডব্লিউআইপির সত্যতা যাচাইয়ে বিদ্যমান কারখানা ও জুলদা প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন চালান। পরিদর্শনে কোনো নির্মাণাধীন প্রকল্প বা ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। নিরীক্ষকের মতে, ভুয়া প্রকল্প ব্যয় দেখিয়ে আইপিও থেকে তোলা অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

নিরীক্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লুব-রেফের কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সুদজনিত ৫ কোটি টাকার ব্যয়কে ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস (সিডব্লিউআইপি) হিসেবে সম্পদ দেখিয়েছে। তবে যেহেতু বাস্তবে কোনো সিডব্লিউআইপি নেই, তাই ওই অর্থ ব্যয় হিসেবে প্রফিট অর লস বা ইনকাম স্টেটমেন্টে দেখানো উচিত ছিল। নিরীক্ষক আরও জানিয়েছেন, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে আইপিও থেকে সংগৃহীত ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় বিলুপ্ত সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে রাখা ছিল, যা সুদসহ বেড়ে ১৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটি বিলুপ্ত হওয়ায় এই অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে আইপিও ফান্ড ব্যবহার করতে না পারাকে প্রসপেক্টাসে দেওয়া ঘোষণার ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন নিরীক্ষক। কোম্পানিটির আর্থিক হিসাবে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অবণ্টিত লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৯২ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য, যা দেওয়া হয়নি। লুব-রেফের আর্থিক হিসাবে অন্যান্য পাওনাদার হিসাবে ২০২৫ সালের ৩০ জুন ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার দায় দেখানো হয়েছে, যা আগের বছর থেকে হিসাবের জের টেনে আনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষককে লেজার বা পাওনাদের ঠিকানা দেয়নি। এ কারণে সত্যতা যাচাইয়ে ওইসব পাওনাদারদের চিঠি দিতে পারেনি নিরীক্ষক। এছাড়া বিকল্প নিরীক্ষা পদ্ধতি হিসেবে কোম্পানির কাছে তিন মাসের লেজার চেয়েছিল নিরীক্ষক। সেটাও দেয়নি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। এতে করে ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার হিসাবের সত্যতা পায়নি নিরীক্ষক।

এদিকে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকার কাঁচামাল ও প্যাকেজিং পণ্য কিনেছে বলে আর্থিক হিসাবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু মূসক ৯ দশমিক ১ অনুযায়ী ওই অর্থবছরে ৩১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার কাঁচামাল ও প্যাকেজিং পণ্য কেনা হয়েছে। ২০২১ সালে শেয়ারবাজারে আসার সময় ২০১৯-২০ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ২ দশমিক ৫৬ টাকা মুনাফা দেখায় লুব-রেফ বাংলাদেশ। কোম্পানিটির বুক বিল্ডিংয়ে কাট-অফ প্রাইস হয় ৩০ টাকা। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৭ টাকা করে শেয়ার ইস্যু করা হয়।

প্রিমিয়ামে শেয়ার ইস্যু করা লুব-রেফ বাংলাদেশ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ৪ দশমিক ৫৬ টাকা লোকসান করেছে। ওই অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশও ঘোষণা করা হয়নি। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও কোম্পানিটি লোকসানে পড়ে; তখন শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল শূন্য দশমিক ৭৪ টাকা। তবে লোকসান সত্ত্বেও ওই অর্থবছরের জন্য ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল। তবে এই নামমাত্র লভ্যাংশও সময়মতো শেয়ারহোল্ডারদের পরিশোধ করতে পারেনি লুব-রেফ। ফলে ঘোষিত লভ্যাংশ না পাওয়ার অভিযোগে বহু শেয়ারহোল্ডার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) অভিযোগ দায়ের করেন। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বছর ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৩ দশমিক ৪১ টাকা, যা পরের বছর ২০২১-২২ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ১৩ টাকায় এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরও কমে ১ দশমিক ৪১ টাকায় নেমে আসে।