*গণপূর্তের সংস্থাপনে বদলি বাণিজ্য থেকে কোটি টাকার দুর্নীতি অভিযুক্ত
*ধারাবাহিক তিন পর্বের আজ প্রথম পর্ব
বিশেষ প্রতিনিধি : স্বৈরাচার বিরোধী গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর দেশের অনেক দুর্নীতিবাজ আমলার মতোই বিদেশে পালাতে চেয়েছিলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (সংস্থাপন) স্বপন চাকমা। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার কারণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সাময়িকভাবে আটকে যায় তাঁর বিদেশযাত্রা। এর মধ্যেই একের পর এক অনিয়ম–দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। পরে তাঁর পরিবারকে ‘নির্দোষ’ দেখিয়ে পুলিশ যাচাই–বাছাইয়ের প্রতিবেদন ব্যবহার করে জারি হয় পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন—যেখানে বলা হয়, স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে “বিরূপ কোনো তথ্য নেই”। অথচ সে সময়ই তাঁর বিরুদ্ধে ছিল বদলি–বাণিজ্য থেকে শুরু করে কোটি টাকার প্রকল্প দুর্নীতির প্রবল অভিযোগ।
পারিবারিক পরিচয়, প্রোফাইল আর বিদেশ যাওয়ার নোট : সরকারি নথি অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন স্বপন চাকমা। তাঁর পিতার নাম কৃষ্ণ মনি চাকমা। স্ত্রী লাবনী চাকমা। দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক তিনি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখা-১, গত ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে জারি হওয়া একটি পরিপত্র/প্রজ্ঞাপনে স্বপন চাকমার বিস্তারিত পরিচয় ও পুরো পরিবারকে নিয়ে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ আছেÑস্বপন চাকমা স্থায়ীভাবে কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল)। পদ: নির্বাহী প্রকৌশলী (সংস্থাপন), গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা। পরিচিতি নম্বর: ২০২০০৩০১২০০৬। বর্তমান ঠিকানা: ফ্ল্যাট ৩/এ, বিল্ডিং ৩০২, রোড ১৯-বি, মহাখালী ডিওএইচএস, ঢাকা
জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর: ৮২৪৩৮৫৮৪৮৪৪০৪। চাকরি হতে অবসর গ্রহণের তারিখ (পিআরএলসহ): ০১/০১/২০৩৫। পরিবারের যে সদস্যদের জন্য পাসপোর্টের আবেদনপত্র প্রেরণ করা হয়, তারা হলেন-স্ত্রী: লাবনী চাকমা, জন্ম ২০/১১/১৯৮৩, এনআইডি: ৩২৯৩৮৩৬২৪৭। পুত্র: কমলেশ্বর চাকমা, জন্ম ২১/১২/২০০৫, এনআইডি: ৭৩৭৮৮০৯৯৭৯। পুত্র: কেজেন্দ্র চাকমা, জন্ম ২৩/০৯/২০১০, জন্ম নিবন্ধন: ২০১০৮৪২৫০০৬১১৩৪৮৯। কন্যা: সিশ্বরী চাকমা, জন্ম ১৪/০২/২০১৬, জন্ম নিবন্ধন: ২০১৬৮৪২৫০০৬১১৩৪৯০।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়-“স্যাদের নামে পাসপোর্টের আবেদনপত্রটি পরবর্তী ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এতদসঙ্গে প্রেরণ করা হলো। পুলিশ বিভাগের মাধ্যমে ইতোপূর্বে তার পূর্বপরিচয় ও চরিত্র প্রতিপাদিত হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিরূপ কোনো তথ্য নেই।” সরকারি ভাষায় লেখা এই “বিরূপ কোনো তথ্য নেই” মন্তব্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে। কারণ এই প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার অনেক আগেই স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে ওঠে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ, যার তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ কমিটি।
পালাতে চাওয়া, অনুমতি পেতে দেরি: স্বৈরাচারি সরকার শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়ার পর আমলাতন্ত্রের ভেতরে থাকা ক্ষমতাবান এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বিদেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের আগস্টে স্বপন চাকমাও পরিবারসহ বিদেশে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে বিদেশ যেতে হলে প্রয়োজন হয় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অনুমতি, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, পাসপোর্ট-সংক্রান্ত নথিপত্র ইত্যাদি। আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জটিলতায় তাঁর বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা কিছুটা বিলম্বিত হয়।
এ সময়েই স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে পূর্বের অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য গণমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আলোচনায় আসতে শুরু করে। তবু ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন-১ শাখা থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হয়, যেখানে দাবি করা হয়-স্বপন চাকমা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে “বিরূপ কোনো তথ্য নেই” এবং তাঁদের পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন তখনকার প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য-এই মন্তব্য ছিল “ডাহা মিথ্যা” এবং “শুধু কাগুজে ভাষা”, যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বদলি-পোস্টিং বাণিজ্যে : গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখা সব প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার বদলি-পদায়ন, প্রমোশন কার্যকর করা ও পোস্টিং নিয়ন্ত্রণ করে। এই শাখায় বসেই স্বপন চাকমা বদলি-বাণিজ্যের মাধ্যমে অস্বাভাবিক ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন-এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ অনুযায়ী-গুরুত্বপূর্ণ জেলা, বিভাগ বা লাভজনক প্রকল্পে পোস্টিং পেতে হলে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা, বদলির নোটিফিকেশন কাকে কখন বের করা হবে, কারটা ঝুলিয়ে রাখা হবে-এসব নিয়েই গড়ে ওঠে সিন্ডিকেট। সংস্থাপন শাখার এই সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল খেলোয়াড় স্বপন চাকমা টাকা না দিলে বা সিন্ডিকেটের শর্ত না মানলে অনেকে অনাকাক্সিক্ষত জায়গায় বদলির শিকার হন। দুদকের অনুসন্ধান ও গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ সূত্রও সংস্থাপন শাখাকে “দুর্নীতির সুতিকাগার” হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবুও পাসপোর্ট-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে তাঁর বিরুদ্ধে “বিরূপ কোনো তথ্য নেই” বলা হয়; যা বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান।
এ ব্যাপারে দৈনিক অর্থনীতির কাগজ থেকে স্বপন চাকমার সাথে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি হোয়াস্টসঅ্যাপে বার্তা দিলে, বার্তার কোন উত্তর দেননি তিনি। পরে আবার ফোন করলে তিনি অফিসে গিয়ে কথা বলার জন্য বলেন। এমন চায়ের দাওয়াত দেন। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ সত্য না। আর তিনি নিউজের শিরোনামে আপত্তি জানান। সূত্র: বাংলার গৌরব





