480
ঢাকাসোমবার , ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  1. অনুসন্ধানী ও বিশেষ প্রতিবেদন
  2. অপরাধ-আইন ও আদালত
  3. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প
  4. অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প-ব্যাংক-বীমা-নন ব্যাংক
  5. আইটি, টেলিকম ও ই-কমার্স
  6. আবাসন-ভূমি-রাজউক-রিহ্যাব
  7. উদ্যোক্তা-জীবনী
  8. করপোরেট ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
  9. কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ
  10. গণমাধ্যম
  11. গৃহায়ন ও গণপূর্ত
  12. জনশক্তি ও পর্যটন
  13. জনসংযোগ-পদোন্নতি ও সম্মাননা
  14. জাতীয়
  15. দুর্ঘটনা-শোক-দুর্যোগ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক জাহেদুলের ভাড়া জালিয়াতির অভিযোগ

https://www.uddoktabangladesh.com/wp-content/uploads/2024/03/aaaaaa.jpg
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ
নভেম্বর ১৭, ২০২৫ ১২:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বিশেষ প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার শাকপুরা এলাকায় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি’র শাখা ভবন ভাড়ায় জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকেরই বর্তমান পরিচালক ও সাবেক নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহেদুল হকের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে—তিনি নিজের প্রভাব খাটিয়ে ভাড়ার পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন, প্রকৃত খতিয়ান গোপন করে চুক্তিতে ভিন্ন জমির দাগ ব্যবহার করেছেন এবং এর মাধ্যমে নিজের আর্থিক স্বার্থ রক্ষা করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্ট্রিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগপত্র জমা পড়ার পর বিষয়টি এখন তদন্তাধীন। অভিযোগের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছে।

চুক্তিতে জালিয়াতির অভিযোগ : অভিযোগপত্র ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বোয়ালখালী শাকপুরা শাখা ভবনটি নির্মিত হয়েছে শাকপুরা মৌজার বি.এস. ৩৩৭০ নম্বর খতিয়ানের ৪৩০৮, ৪৩০৯ ও ৪৩১২ দাগের জমির ওপর, যা পাঁচ ভাই— মোহাম্মদ ছাইদুল হক, মোহাম্মদ নেছারুল হক, মোহাম্মদ জাহেদুল হক, মোহাম্মদ এনামুল হক ও মোহাম্মদ জসিমুল হকের যৌথ মালিকানাধীন। কিন্তু ব্যাংকের সঙ্গে করা ভাড়াচুক্তিতে পরিচালক জাহেদুল হক ইচ্ছাকৃতভাবে উল্লেখ করেছেন ভিন্ন খতিয়ান (৫০৪৪ নম্বর) এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন দাগের জমি—৪৩১৪, ৪৩১৫, ২৯১২, ৪৪৯৯ ও ৪৪৩৪। প্রকৃত ভবনের সঙ্গে এই জমির কোনো সম্পর্কই নেই। এতে প্রকৃত মালিকদের মধ্যে দুজন—ছাইদুল হক ও নেছারুল হক—ভাড়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যৌথ সম্পত্তিকে নিজের একক মালিকানা হিসেবে দেখিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে প্রতারণা করার অভিযোগও উঠেছে।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও ব্যাংকের ক্ষতি : প্রায় ৩ হাজার বর্গফুট আয়তনের ফ্লোরের মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৫১ হাজার টাকা, যা স্থানীয় মানদণ্ডে অস্বাভাবিকভাবে বেশি। বোয়ালখালী এলাকায় একই আয়তনের ভবনের সর্বোচ্চ ভাড়া সাধারণত ৩০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া ব্যাংকের পক্ষ থেকে ভবনভাড়ার বিপরীতে ভ্যাট ও করও পরিশোধ হচ্ছে ব্যাংকের তহবিল থেকে, যা নিয়মবিরুদ্ধ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব অনিয়মকে “গুরুতর আর্থিক অনিয়ম” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। চুক্তিটি কার্যকর হয় ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর, মেয়াদ ৮ বছর। অর্থাৎ ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই উচ্চমূল্যের চুক্তির দায়ভার ব্যাংকই বহন করছে।

প্রকৃত মালিকদের অভিযোগ: চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো অভিযোগে মোহাম্মদ ছাইদুল হক ও নেছারুল হক লিখেছেন—“২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর থেকে ভবনের ভাড়া থেকে আমাদের বঞ্চিত করে আসছেন জাহেদুল হক। ভবন এক দাগের জমিতে হলেও চুক্তিতে অন্য দাগ দেখিয়ে ব্যাংকের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন।” তাদের দাবি, ভাড়ার টাকায় নিজেদের অংশ না দিয়ে জাহেদুল হক ও তার ভাই এনামুল হক ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হচ্ছেন।

পরিচালক পদে থেকে তদন্তে প্রভাব : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, জাহেদুল হক এখনো স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক পদে বহাল আছেন, ফলে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অনিয়মের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে “দ্বিধাগ্রস্ত”। একজন সিনিয়র ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পরিচালক জাহেদুল হক বোর্ডের প্রভাবশালী সদস্য। তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চাকরির ঝুঁকিতে পড়বেন—এমন ধারণা থেকেই বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলে আছে।”
রাজনৈতিক প্রভাব ও বিতর্কিত অতীত : চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা এবং সাবেক বোয়ালখালী উপজেলা চেয়ারম্যান জাহেদুল হকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগও নতুন নয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত, এবং তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ অভিযোগ তুলতে সাহস পায়নি। ২০২৪ সালের ৫ জুলাই, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন চট্টগ্রাম নগরের চিটাগং ক্লাবের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় যুবশক্তি ও এনসিপি’র নেতা-কর্মীরা তার গ্রেপ্তারের দাবিতে অবস্থান নেন। তাদের অভিযোগ ছিল, জাহেদুল হক ‘জুলাই আন্দোলন’-এর সময় একাধিক হত্যা মামলার আসামি। ওই দিন ক্লাবে তার ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হলেও পরদিন তিনি বিদেশে চলে যান। বর্তমানে তিনি দেশে ফিরে আবারও প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

কে এই জাহেদুল হক : চট্টগ্রামের পশ্চিম শাকপুরা গ্রামের সন্তান মোহাম্মদ জাহেদুল হক ব্যবসা ও সমাজসেবায় দীর্ঘদিন সক্রিয়। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্ট লুইসিয়ানা ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেন ১৯৯২ সালে। তার পিতা, আলহাজ মো. নূরুল হক সওদাগর, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের একজন স্পন্সর ডিরেক্টর এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ছিলেন। জাহেদুল হক বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি’র পরিচালক ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান, পাশাপাশি তিনি মেসার্স জাহেদ ব্রাদার্স, নূর অয়েল অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড, আরাফাত লিমিটেড, এনএলজেড ফ্যাশন লিমিটেডসহ একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও মালিক। তাছাড়া তিনি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, আর্মি গলফ ক্লাব, চট্টগ্রাম বোট ক্লাব, চিটাগং ক্লাব, মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশন ও হোসেন অয়েল মিলস–এর সঙ্গেও জড়িত।

ব্যাংক খাতে প্রভাবশালী পরিবারের আধিপত্য : স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের স্পন্সর ডিরেক্টর হিসেবে নূরুল হক সওদাগরের পরিবারের একাধিক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। ব্যাংকখাতে “পরিবার-নির্ভর প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক” হিসেবে এই পরিবারটির নাম বারবার আলোচনায় এসেছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত শেষ হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ : বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ভবন ভাড়ায় “অসঙ্গতি ও স্বার্থের সংঘাত” প্রমাণিত হয়েছে। এখন ব্যাংকের ব্যাখ্যা পাওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপের পরিদর্শনে গিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “যদি প্রমাণিত হয় যে পরিচালক নিজ স্বার্থে ব্যাংকের অর্থ ব্যবহার করেছেন, তা হলে ফিট অ্যান্ড প্রপার গাইডলাইন অনুযায়ী তার পরিচালক পদ বাতিল হতে পারে।” স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি বহু বছর ধরেই নানান অনিয়ম ও প্রভাবশালী পরিচালকদের স্বার্থরক্ষার অভিযোগে আলোচিত। এবার বোয়ালখালীর এই ভবন ভাড়ার ঘটনা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। প্রশ্ন উঠছে—ব্যাংকের বোর্ডের প্রভাবশালী একজন সদস্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে  অভিযুক্ত জাহেদুল হক বলেন, ৮ বছর মেয়াদী ভাড়াটিয়া চুক্তি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে ৮ বছর পর নেসারুল হক এবং সাইদুল হক অতি সুবিধা নিতে মিথ্যা দাবি করছেন। চুক্তিপত্র করেছেন মো. এনামুল হক এবং মো. জাহেদুল হক – সকল পরিবারের সদস্যদের অনুমতিতে। কিন্তু ঢাকার বাহিরে এত ভাড়া । বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়ম অমান্য করার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। সূত্র: বাংলার গৌরব