ঢাকা: সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংকট আবারও সামনে এসেছে। ইকুইটি এক্সচেঞ্জ হাউজ লিমিটেড, ব্যাংক অব বাংলাদেশ লিমিটেড (বিডিবিএল) এবং ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিকালস লিমিটেড—এই তিন প্রতিষ্ঠানের অডিট প্রতিবেদনে গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অডিট আপত্তি না তোলায় প্রায় ২০ লাখ টাকার দাবির কোনো সঠিক জবাব মেলেনি, আর কয়েক কোটি টাকার অর্থ ব্যয়ের রেকর্ডও রয়ে গেছে অস্পষ্ট। ফলে পুরো অডিট প্রক্রিয়া নিয়েই উঠেছে বড় প্রশ্ন।
ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিকালসে অনিয়মের ছায়া: অডিট নথির এক অংশে দেখা গেছে, ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিকালস লিমিটেড ২০১৫ ও ২০১৬ সালে মোট ১৫ কোটি টাকার শেয়ার ইস্যু করে। সেখান থেকে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার লভ্যাংশ প্রদানের দাবি করা হলেও তার বড় একটি অংশের পরিশোধের রেকর্ড স্পষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানটির ২০১৫ সালে লভ্যাংশ হার ছিল ১৪.৫০ শতাংশ, পরিমাণ ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০১৬ সালে লভ্যাংশ হার ১৪.৫০ শতাংশ, পরিমাণ ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০১৭ সালে লভ্যাংশ হার ১৪.৫০ শতাংশ, পরিমাণ ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে লভ্যাংশ হার ১৪.৫০ শতাংশ, পরিমাণ ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০১৬ সালে দ্বিতীয়বার ১৩.৫০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ প্রদান করা হয়, পরিমাণ ১ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে ১৩.৫০ শতাংশ হারে লভ্যাংশের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে একই হারে অর্থাৎ ১৩.৫০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া হয়, যার পরিমাণ ১ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মোট লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
অর্থ বিশেষজ্ঞদের মতে, একই সময়কালে একাধিক বছরের লভ্যাংশ একত্রে প্রদর্শন ও অস্পষ্ট অডিট প্রতিবেদন আর্থিক স্বচ্ছতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অডিটরদের ‘নীরবতা’ নিয়ে প্রশ্ন : ইকুইটি এক্সচেঞ্জ হাউজ লিমিটেড ও বিডিবিএলের অডিটে নিরীক্ষকরা ছয় মাসব্যাপী কাজ করেও কোনো আপত্তি তোলেননি। অভিযোগ অনুযায়ী, পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই ইকুইটি এক্সচেঞ্জ হাউজের নামে মতামত প্রদান করা হয়। কোম্পানির নামে প্রদত্ত অর্থের সঠিক হিসাব ও সমন্বয় অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও, নিরীক্ষকরা প্রতিবেদন সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (বিএফআরসি) গেজেট নং-ওএস-০৪/২০১৫/৮৬২, মহাপরিচালক (অডিট) বিজ্ঞপ্তি/অডিট/২০১৪/১৬/৮৬৩ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আইএএস ৩৪১ ও আইএএস ৫৮৬ অনুযায়ী অডিট পরিচালনার কথা থাকলেও, এসব মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ফলে, ২০ লাখ টাকার জাব্দা দাবির (ঙনলবপঃরড়হ ঝবঃঃষবসবহঃ) বিষয়টি এখন তদন্তাধীন। অডিটরদের এই নীরবতা তাদের পেশাগত সততা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
১৫ কোটি টাকার বিতরণে অপারেশন স্থগিত : অডিট প্রতিবেদনের আরেক অংশে উল্লেখ আছে, আইসিসি (ওঈঈ) কর্তৃক ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি ৫ কোটি এবং ২০১৬ সালের ২৯ মে আরও ১০ কোটি—মোট ১৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। শর্ত ছিল, অর্থ বিতরণের তিন মাসের মধ্যে পাবলিক সেক্টর অপারেশন স্থাপন করতে হবে। কিন্তু অনুমোদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অর্থ গ্রহণ করা হলেও নির্ধারিত সময়ে কোনো অপারেশন চালু করা হয়নি এবং প্রয়োজনীয় আবেদনও জমা দেওয়া হয়নি। এর ফলে আইসিসি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির কোলাটির আইডি বন্ধ করে দেয়। বিড কোটেশন ও বিড এক্সট্রাক্ট জমা না হওয়ায় ১৩ কোটি টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, আর বাকি ২ কোটি টাকার বিড ব্যয়ের হিসাবও অনুপস্থিত। তদুপরি, ২০১৮ সালে আইসিসি ফান্ডের ১০ শতাংশ অর্থাৎ ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা অবৈধভাবে ব্যয়ের অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে।
অডিটে শৈথিল্য ও প্রশাসনিক উদাসীনতা : নথিতে দেখা গেছে—কোম্পানি সময়মতো অডিট প্রতিবেদন দাখিল করেনি; আইসিসি অনুমোদিত ফান্ডের ব্যবহারিক অগ্রগতি প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে; ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরীক্ষকদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করেননি; ২০১৯-২০২০ অর্থবছর পর্যন্ত অডিট নিষ্পন্ন না হওয়ায় অডিট কমিটি বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তরের সুপারিশ করেছে।
দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির সংকট : অর্থনীতিবিদদের মতে, অডিট প্রক্রিয়া যে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার মেরুদণ্ড। সেখানে দায়বদ্ধতা না থাকলে তা ফাইনান্সিয়াল রেগুলেশন লঙ্ঘনের শামিল।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “অডিট আপত্তি না তোলার মাধ্যমে নিরীক্ষক ও কোম্পানি উভয়েরই দায় তৈরি হয়েছে। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং আইনগত তদন্তের বিষয়।”
২০ লাখ টাকার অডিট আপত্তি থেকে শুরু করে ১৫ কোটি টাকার অনিষ্পন্ন ফান্ড ও ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার অস্পষ্ট লভ্যাংশ—সব মিলিয়ে অডিট, প্রশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গভীর দায়বদ্ধতার সংকট ফুটে উঠেছে। বিষয়টি এখন তদন্তাধীন থাকলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে, অডিট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ইমেইল, হোয়াস্টঅ্যাপ এবং ফোনে যোগাযোগ করলেও ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস লি. এর চেয়ারম্যান মিসেস হাফিজা ইয়াসমিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ.এফ.এম. আনোয়ারুল হক এবং কোম্পানি সচিব মহি উদ্দিন কোনো তথ্য দেননি, যোগাযোগও করেননি।





