- অযোগ্য নেতৃত্ব ও দুর্নীতির দায়;
- প্রতিবেদনে গরমিল ও আর্থিক জালিয়াতি;
- অর্থনৈতিক কাঠামোয় ধস;
- সাজানো এজিএমে প্রতিবেদন পাশ ;
সম্পদের সংকট; - এজিএম পার্টি’ ও আস্থাহীনতার বাজার;
- নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ;
জ্যেষ্ঠ্য প্রতিবেদক, ঢাকা: বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্রের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ— কোম্পানির নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করে আসছে, এজিএম (বার্ষিক সাধারণ সভা) সাজানোভাবে আয়োজন করে ভুলে ভরা প্রতিবেদন পাস করানো হচ্ছে, প্রশ্ন তোলার সুযোগ দেওয়া হয় না, আর প্রকৃত ক্ষতির হিসাব গোপন রাখা হচ্ছে।
সাজানো এজিএমে প্রতিবেদন পাশ : গত ২১ আগস্ট ২০২৫, আইডিইবি ভবনের মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মিলনায়তনে ফিনিক্স ফাইন্যান্সের এজিএম অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত ছিলেন প্রকৃত শেয়ারহোল্ডাররা, কিন্তু এক বিনিয়োগকারী বার্ষিক প্রতিবেদনের অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন করার চেষ্টা করলে বাধা দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে—কোম্পানির কিছু কর্মকর্তা, কন্টাক্ট করা শেয়ারহোল্ডার এবং ভাড়া করা কিছু লোক মিলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সভার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন করার সুযোগ পাননি। পরবর্তীতে লিখিতভাবে প্রশ্নপত্র জমা দিলেও কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোনো উত্তর দেননি। সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী এরপর বিএসইসির (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) কাছে লিখিত অভিযোগ দেন, যেখানে তিনি এই এজিএমকে “তথাকথিত সাজানো অনুষ্ঠান” হিসেবে বর্ণনা করেন।
২০২৫ শেষে কোম্পানিটির ঋণ বিতরণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকায়, এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ২ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা— যা মোট ঋণের ৮৪.৩৬ শতাংশ।
অর্থনৈতিক কাঠামোয় ধস : বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়— ফিনিক্স ফাইন্যান্সের আর্থিক অবস্থা ভয়াবহ। জুন ২০২৫ শেষে কোম্পানিটির ঋণ বিতরণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকায়, এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ২ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা— যা মোট ঋণের ৮৪.৩৬ শতাংশ। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “এমন অনুপাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মৃত্যুঘণ্টা।” কোম্পানির প্রভিশন ঘাটতি বর্তমানে ১৪ কোটি টাকার বেশি, সংস্থান ঘাটতি ও মূলধন সংকট ক্রমেই বাড়ছে। ফিনিক্স ফাইন্যান্স এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সিআরআর (নগদ জমার হার) ও এসএলআর (বিধিবদ্ধ জমার হার) সংরক্ষণেও ব্যর্থ হচ্ছে।
অযোগ্য নেতৃত্ব ও দুর্নীতির দায় : ২০০৮ সাল থেকে টানা ১৬ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা সাবেক এমডি এস এম ইন্তেখাব আলম-এর বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, “এসএ অয়েল রিফাইনারি, আমান সিমেন্ট মিলস ইউনিট-২, ম্যাক স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজসহ একাধিক গ্রাহক ঋণে অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।” অভ্যন্তরীণ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে— অনেক ঋণ ভুয়া জামানত বা অতিমূল্যায়িত সম্পদের বিপরীতে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও গ্যারান্টিও ছিল ভুয়া। এসব কারণে ঋণ আদায় কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে গরমিল ও আর্থিক জালিয়াতি : বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৩৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, অথচ কোম্পানি প্রতিবেদনে দেখিয়েছে ৮০৮ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি। প্রভিশন হিসাবও প্রশ্নবিদ্ধ— ২০২৩ সালে ৫০৪ কোটি এবং ২০২৪ সালে ৫৭১ কোটি টাকার “সংস্থান” রাখা হয়, যা বাস্তব ক্ষতির চেয়ে বহুগুণ বেশি। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থের গন্তব্য অস্পষ্ট থেকে গেছে। কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১৬৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যার প্রায় ৪৯ শতাংশই ক্ষতির মধ্যে। সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে আমানত নেওয়া হয়েছে ১,৭১৮ কোটি টাকার বেশি, কিন্তু ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ২,৫৯৩ কোটি টাকারও বেশি— অর্থাৎ ঘাটতি পূরণের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সম্পদের সংকট : ফিনিক্স ফাইন্যান্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়—২০২৩ সালে কোম্পানির বিনিয়োগ ছিল ১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ১৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকায়। ২০২৩ সালে মোট সম্পদ ছিল ২,৯১৩ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২,৭৫৮ কোটি টাকায়। দায়ের পরিমাণ এখন ৪,১৮৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ দায় সম্পদের তুলনায় ১,৪০০ কোটি টাকা বেশি। শ্রেণীকৃত ঋণের হার ৮৮.৬৬ শতাংশ, যা একই খাতের বে লিজিং (৮০.৮৪%), ইসলামিক ফাইন্যান্স (৫৮.৫৭%) বা প্রাইম ফাইন্যান্সের (৬০.২৯%) তুলনায়ও ভয়াবহ। ২০২৪ সালে কর-পরবর্তী ক্ষতি ৮০৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা; ইপিএস ঋণাত্মক ৪৮.৭৩, এনএভি ঋণাত্মক ৮২.০১। এতে বোঝা যাচ্ছে— প্রতিষ্ঠানটির মূলধন কার্যত শেষ হয়ে গেছে।

‘এজিএম পার্টি’ ও আস্থাহীনতার বাজার: বিনিয়োগকারীর অভিযোগে আরও বলা হয়— এখন একাধিক কোম্পানি ‘এজিএম পার্টি’ নামে এক ধরনের প্রহসনের আয়োজন করছে, যেখানে ভাড়া করা মানুষ দিয়ে সভা ভরিয়ে প্রতিবেদন পাশ করানো হয়। এতে প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের মতামত বা জবাবদিহিতা থাকে না।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, “এই সাজানো সভা ও মিথ্যা তথ্য বাজারে ভয়াবহ আস্থাহীনতা সৃষ্টি করছে। বিএসইসি দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ বিনিয়োগকারী আরও নিরুৎসাহিত হবে।”
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ : বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করেছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাধারণ বিনিয়োগকারীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না রেখে কিছু সংগঠনের মাধ্যমেই কাজ করছে, যাদের মধ্যেই অনেকে এই অনিয়মে জড়িত।
তারা বিএসইসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন— ফিনিক্স ফাইন্যান্সসহ যেসব প্রতিষ্ঠান সাজানো এজিএম করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং বিনিয়োগকারীদের প্রশ্নের লিখিত জবাব প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একসময় সম্ভাবনাময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। আজ সেটি পরিণত হয়েছে এক “অর্থনৈতিক দুঃস্বপ্নে”— যেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম ও দায়হীন নেতৃত্বের কারণে মূলধন, আস্থা ও সুনাম সবই হারিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপের ওপর— নতুবা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের স্বপ্ন আরও দূরে সরে যাবে।





