সরকারি শুল্ক সুবিধার অপব্যবহার করে জাল ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) দেখিয়ে এশিয়ান গ্রুপের চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেড প্রায় ৭৯২ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে বলে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের এক বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। নিরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি শুল্ক সুবিধায় প্রায় ৩ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে অবৈধভাবে অপসারণ করেছে এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির তথ্য ইউডিতে উল্লেখ না করে ভ্যাটও ফাঁকি দিয়েছে। এদিকে, চার বছর আগে বন্ড কমিশনারেট থেকে বিচারাদেশ জারি হলেও সরকার এখনো পাওনা অর্থ আদায় করতে পারেনি বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, দেশের প্রতিটি সরকার তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি বাড়াতে দীর্ঘদিন শুল্ক সুবিধা দিয়ে আসছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এই সুবিধা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি তা সহজলভ্যও করেছে। কিন্তু সরকারের এই শুল্ক সুবিধার অপব্যবহারও হচ্ছে। আবার শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পেয়ে মামলা করেও রাজস্ব পাচ্ছে না সরকার। এমনি এক প্রতিষ্ঠান এশিয়ান গ্রুপের চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটিতে এক বছরের নিরীক্ষায় বিশাল অঙ্কের শুল্ক-কর ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে। প্রতিষ্ঠানটি শুল্ক সুবিধায় বেশি কাঁচামাল আমদানি করে তার বিপরীতে রপ্তানি করেনি। অর্থাৎ সরকারি সুবিধায় পণ্য আমদানি করে অবৈধভাবে অপসারণ করেছে বলে জানিয়েছেন বন্ড কমিশনারেট কর্মকর্তারা।
চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেডের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ থেকে যে ইউডির মাধ্যমে কাঁচামাল শুল্ক সুবিধায় খালাস দেখানো হয়েছে, সেসব ইউডির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি; এমনকি বিজিএমইএর ওয়েবসাইটেও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি ইউডি সংশোধনের কপি বন্ড কমিশনারেটে জমা দিলেও সেগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। বিশেষ নিরীক্ষার ভিত্তিতে প্রথমে ৩২৭ কোটি টাকার শুল্ক-কর ফাঁকির অভিযোগে মামলা করে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট; পরে আমদানি-রপ্তানি তথ্য ও ইউডির মধ্যে অমিল এবং রপ্তানি না করে অবৈধভাবে পণ্য অপসারণের অভিযোগে আরও চারটি মামলা করা হয়। এ বিষয়ে শুনানির জন্য মালিকপক্ষকে ডাকা হলেও সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আমদানি করা কাঁচামালের বিপরীতে পণ্য রপ্তানির দাবি করা হলেও তার পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি তারা।
নিরীক্ষায় আরও জানা যায়, সর্বশেষ ইউডিতে উল্লেখ করা মাস্টার এলসিতেও পণ্য রপ্তানির কোনো প্রমাণ পায়নি বন্ড কমিশনারেট। এর বাইরে কিছু ইউডি সংশোধন করলেও বিজিএমইএ এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) ওয়েবসাইটে তার কোনো প্রমাণ পাননি বন্ডের কর্মকর্তারা। এশিয়ান অ্যাপারেলসের দাবি করা সংশোধিত ইউডির বিষয়ে জানতে চেয়ে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএতে চিঠি দিয়েও দাবির পক্ষে সত্যতা পাননি বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা। যার কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কর ফাঁকির মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় বিচারাদেশ হলেও চার বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি থেকে অর্থ আদায় করতে পারেনি বন্ড কমিশনারেট।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের তৎকালীন কমিশনার এ কে এম মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এশিয়ান অ্যাপারেলসে বিশেষ নিরীক্ষায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায়। সেই অনুযায়ী বন্ড কমিশনারেট থেকে বন্ড ফাঁকির মামলাও করা হয়েছে।’ শুধু মোটা অঙ্কের কর ফাঁকিই নয়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আরও অনিয়মের তথ্য পেয়েছে বন্ড কমিশনারেট। পরে কোম্পানির দেওয়া তথ্য-উপাত্ত এবং নথিপত্র যাচাই করে আরও ৩৭৯ কোটি টাকার মামলা দেয় বন্ড কমিনারেট। একই সঙ্গে আমদানি পণ্যের অবৈধ অপসারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট ফাঁকিরও প্রমাণ মেলে।
ইপিজেডভুক্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলসকে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে পণ্য ক্রয় করতে হয়, তবে এখানেও তারা অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ১২৯টি ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির তথ্য বিজিএমইএর ইউডিতে উল্লেখ করেনি, যার ফলে ২ কোটি ১৭ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে বন্ড কমিশনারেট। পাশাপাশি ২০২০ সালে প্রায় ৬ কোটি ডলারের ফেব্রিক্স আমদানি করলেও এর বিপরীতে আংশিক রপ্তানির প্রমাণ দিলেও ৫৭ লাখ ৯১ হাজার ডলারের পণ্যের কোনো রপ্তানি তথ্য দেখাতে পারেনি। ফলে শুল্ক সুবিধায় আমদানি করা এসব পণ্য অবৈধভাবে অপসারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় শুল্ক-কর বাবদ ৭৯ কোটি টাকার ফাঁকির মামলা করা হয়েছে; পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট ফাঁকির জন্য আরও ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার মামলা করা হলেও বছরের পর বছর এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানটির কাছেই বকেয়া রয়ে গেছে।
এ বিষয়ে জানতে এশিয়ান অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসিম আহমেদের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে নাসিম আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, বন্ড কমিশনারেটের করা মামলাগুলো সঠিক নয় এবং ইউডি জালিয়াতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিছু শুল্ক সুবিধার বিপরীতে বিজিএমইএর ইউডি সংশোধনের বিষয়টিও তিনি নাকচ করে দেন। তিনি আরও জানান, বন্ড থেকে শুল্ক-কর ফাঁকির মামলার রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন এবং বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)