
নিজস্ব প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এনআরবিসি ব্যাংক টানা দ্বিতীয় বছরের মতো শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটির মুনাফা ৭৮ শতাংশ বাড়লেও পরিচালনা পর্ষদের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। একইসঙ্গে কোম্পানিটি এখন অতিরিক্ত ১০ শতাংশ করের মুখেও পড়ছে। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—যখন একটি ব্যাংকের মুনাফা বাড়ছে, তখন কেন শেয়ারহোল্ডারদের সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা হচ্ছে? আর কেন বারবার এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে কোম্পানিকে অতিরিক্ত করের বোঝা বহন করতে হচ্ছে?
মুনাফা বেড়েছে ৭৮ শতাংশ, তবু ‘শূন্য’ লভ্যাংশ: এনআরবিসি ব্যাংকের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ০.১৬ টাকা। এতে ব্যাংকটির মোট নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা। কিন্তু এই মুনাফার বিপরীতে কোনো নগদ বা বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। ফলে পুরো মুনাফাই রিটেইন আর্নিংসে স্থানান্তর করা হবে।
এর আগে ২০২৪ সালেও ব্যাংকটি শেয়ারপ্রতি ০.০৯ টাকা আয় করেছিল এবং তখনও কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। সে সময় প্রায় ৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা মুনাফা রিটেইন আর্নিংসে রেখে দেওয়ায় অতিরিক্ত প্রায় ৭১ লাখ টাকা কর গুনতে হয়েছিল ব্যাংকটিকে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি যদি অর্জিত মুনাফার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ না করে, তাহলে রিটেইন আর্নিংসে রেখে দেওয়া অংশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিতে হয়।
এনআরবিসি ব্যাংক ২০২৫ সালে পুরো ১৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা মুনাফাই কোম্পানির ভেতরে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এই অর্থের ওপর অতিরিক্ত প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা কর দিতে হবে।
অর্থাৎ, শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ না দিয়ে উল্টো কোম্পানিটিকে বাড়তি করের বোঝা নিতে হচ্ছে।

কার স্বার্থে রিটেইন আর্নিংস? : বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কোম্পানি যখন ধারাবাহিকভাবে মুনাফা ধরে রাখে কিন্তু শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয় না, তখন সেটি করপোরেট সুশাসনের প্রশ্ন তোলে।
একজন মার্চেন্ট ব্যাংকার বলেন, “রিটেইন আর্নিংস ব্যবসা সম্প্রসারণ বা মূলধন শক্তিশালী করতে ব্যবহার করা হতে পারে। কিন্তু সেই অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে—তা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।”
আরেক বিশ্লেষক বলেন, “শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা মূলত লভ্যাংশ ও মূলধনী মুনাফার আশায় বিনিয়োগ করেন। বারবার লভ্যাংশ না দিলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ: ২০২১ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এনআরবিসি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে ৮২৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪০.৯৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক সাধারণ বিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডাররা।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, ব্যাংকটি বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করলেও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।
একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বলেন, “মুনাফা বাড়ছে, কিন্তু লভ্যাংশ নেই। তাহলে আমরা লাভ কোথায় পাব?”
আরেক বিনিয়োগকারীর ভাষ্য, “দুই বছর ধরে লভ্যাংশ না দিয়ে ব্যাংকটি আসলে শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি দায়বদ্ধতার সংকট দেখাচ্ছে।”
শেয়ারের দরেও নেতিবাচক প্রভাব: বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত শেয়ারের দরের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বুধবার (২০২৬ সালের ২০ মে) ব্যাংকটির শেয়ার দর ছিল ৭ টাকা ৫০ পয়সা। অনেক বিনিয়োগকারীর মতে, লভ্যাংশহীন নীতির কারণে শেয়ারের প্রতি আগ্রহ কমছে।
একজন ব্রোকারেজ হাউস কর্মকর্তা বলেন, “ব্যাংক খাতে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীল লভ্যাংশ প্রত্যাশা করেন। সেখানে টানা দুই বছর লভ্যাংশ না দেওয়া বাজারে নেতিবাচক বার্তা দেয়।”
মূলধন শক্তিশালী নাকি ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা?: ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ আনুষ্ঠানিকভাবে লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেনি। তবে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, মূলধন সংরক্ষণ, খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি বা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার যুক্তি দেখানো হতে পারে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—যদি মূলধন পরিস্থিতি এতটাই চাপে থাকে, তাহলে মুনাফা বাড়ার পরও কেন বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হলো না?
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ না দেওয়া এবং অতিরিক্ত করের ঝুঁকিতে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও নজর দেওয়া উচিত।
বিশেষ করে Bangladesh Securities and Exchange Commission (বিএসইসি) ও Bangladesh Bank-এর কাছে প্রশ্ন উঠছে—সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত?
আস্থার সংকটে ব্যাংকিং শেয়ার: সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, কম মুনাফা ও দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্সের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে। এর মধ্যে এনআরবিসি ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের টানা দুই বছর লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরো খাতের জন্যও নেতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে কোম্পানিগুলোকে শুধু মুনাফা দেখালেই হবে না, সেই মুনাফার ন্যায্য অংশ শেয়ারহোল্ডারদের কাছেও পৌঁছাতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)