বিশেষ প্রতিনিধি : প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখায় টোটাল ফ্যাশনের ৫০ কোটি টাকা ঋণসীমার বিপরীতে ৪৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হলেও পরে ভুয়া ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে ২০২৩ সালে ওই ঋণ হঠাৎ করে ৩৬০ কোটি টাকায় উন্নীত দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই ধরনের জালিয়াতির মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের রপ্তানিমুখী মোট ২৬টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিপুল অঙ্কের ঋণ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।
শনিবার (১৬ মে) ঢাকার পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ডোয়াস ল্যান্ড অ্যাপারেলসের মালিক আরিফুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখায় মোট ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের শিল্প। এসব প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধের পথে।
জালিয়াতির প্রক্রিয়া তুলে ধরে বক্তারা বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান হয়তো এক কোটি টাকার রপ্তানি করত। এর বিপরীতে তার ৭৫ লাখ টাকার ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধা পাওয়ার কথা। অথচ এলসি খোলা হয়েছে সাড়ে সাত কোটি টাকার। রপ্তানি আয় দিয়ে ব্যাক টু ব্যাক এলসির দায় পরিশোধের বিধান থাকলেও এ ক্ষেত্রে প্রিমিয়ার এক্সচেঞ্জ নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ডলার কিনে দায় সমন্বয় দেখানো হয়েছে। পরে তা এসব গ্রাহকের নামে ঋণ হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে।
টোটাল ফ্যাশনের মালিক বিষয়টি জানতে পেরে কীভাবে এই অতিরিক্ত ঋণ সৃষ্টি হয়েছে তা জানতে চেষ্টা করলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাননি বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা নিজেদের অ্যাকাউন্টে অনেক বেশি ‘ব্যাক টু ব্যাক’ এলসি দেখে জালিয়াতির বিষয়টি আঁচ করতে পারেন। এ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও প্রতিকার পাননি। পুরো বিষয়টি তারা বুঝতে পারেন ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর ‘সমকাল’ পত্রিকায় ‘ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে ৩০৮১ কোটি টাকা আত্মসাৎ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর। এরপর থেকে তারা বিষয়টি নিয়ে লেগে থাকলেও কোনো প্রতিকার পাননি। এমনকি কার নামে কত টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরও ব্যাংক আজ পর্যন্ত তথ্য দেয়নি বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা।
কোন প্রতিষ্ঠানের নামে কত টাকা লোপাট : বিএফআইইউর পরিদর্শন প্রতিবেদনে কোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানির জন্য আমদানির পরিমাণ কোনোভাবে ৯০ শতাংশের বেশি হবে না। টোটাল ফ্যাশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান গত পাঁচ বছরে ১৯ কোটি ৫২ লাখ ডলারের কাঁচামাল আমদানি দেখিয়েছে। আর রপ্তানি দেখানো হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের। আবার রপ্তানির কাঁচামালের বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। অথচ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাক টু ব্যাক এলসির ৯৭ শতাংশই হয়েছে স্থানীয়ভাবে। এটি অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক উল্লেখ করে আদৌ রপ্তানি হয়েছে কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ করেছে পরিদর্শক দল। কেননা রপ্তানি আয়ের বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক এলিসির দায় সমন্বয় করার কথা। অথচ এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের চলতি হিসাব থেকে টাকাকে ডলারে রূপান্তর করে দায় শোধ করা হয়েছে। আর চলতি হিসাবে অর্থের উৎস নগদ জমা বা শাখা থেকে দেওয়া ঋণ। এটিকে জালিয়াতি ও ব্যাংকিং রীতিনীতি পরিপন্থি উল্লেখ করেছে পরিদর্শক দল। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় এ ধরনের জালিয়াতি উদ্ঘাটিত না হওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক বলা হয়েছে। আবার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদিত ঋণসীমা ৫৯ কোটি টাকা। অথচ গ্রাহকের কাছে এখন পাওনা রয়েছে ৩৪৬ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অবন্তী কালার টেক্সের ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই রকম জালিয়াতি। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি ১৪ কোটি ৩৪ লাখ ডলার আমদানির বিপরীতে রপ্তানি দেখিয়েছে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ডলার। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যাক টু ব্যাক এলসির ৯৭ দশমিক ৩৪ শতাংশই স্থানীয়। এ ক্ষেত্রেও চলতি হিসাব থেকে টাকাকে ডলারে রূপান্তর করে এলসির দায় শোধ করা হয়েছে। অবন্তী কালার টেক্সের কাছে এখন ব্যাংকের পাওনা ১৯৮ কোটি টাকা। একই উপায়ে কাপড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ডোয়াসুল্যান্ড অ্যাপারেলস ৩ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের রপ্তানির বিপরীতে আমদানি দেখিয়েছে ১৭ কোটি ৪২ লাখ ডলার। ব্যাক টু ব্যাক এলসির ৮৯ দশমিক ৩৯ শতাংশই স্থানীয়। প্রতিষ্ঠানটির ৭৩ কোটি টাকা ঋণসীমার বিপরীতে এখন ব্যাংকের পাওনা ২৭০ কোটি টাকা। ক্রনি অ্যাপারেলসের ৮০ কোটির বিপরীতে ১৪৯ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ১ কোটি ৬৭ লাখ ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি দেখিয়েছে ৪ কোটি ৫৬ লাখ ডলার, যার ৯১ দশমিক ৩৯ শতাংশই স্থানীয়। এইচকে অ্যাপারেলস ৪ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের রপ্তানির বিপরীতে আমদানি দেখিয়েছে ১০ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। এর ৯৯ দশমিক ৯৩ শতাংশই দেখানো হয়েছে স্থানীয় আমদানি। প্রতিষ্ঠানটির ৪৫ কোটি টাকা সীমার বিপরীতে ১১৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। আমানা নিট ফ্যাশন ও আরটি ফ্যাশনের ২৮ কোটি টাকা সীমার বিপরীতে ৮৬ কোটি টাকা দিয়েছে ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি ৯৫ লাখ ডলারের রপ্তানির জন্য ৩ কোটি ৫ লাখ ডলারের আমদানি দেখিয়েছে, যার ৯০ শতাংশই আবার স্থানীয়।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হুবহু একই রকম অনিয়মের মাধ্যমে ৪৩ প্রতিষ্ঠানকে ঋণের নামে অর্থ বের করে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ শাখা। সব ক্ষেত্রেই যে পরিমাণ রপ্তানি দেখানো হয়েছে, কাঁচামাল আমদানি দেখানো হয়েছে এর অনেক বেশি। যে আমদানি দেখানো হয়েছে, তার ৯০ শতাংশের বেশি স্থানীয়। রপ্তানি আয় থেকে যেভাবে আমদানি দায় পরিশোধের কথা, এর একটি ক্ষেত্রেও তা হয়নি। শাখা থেকে ঋণ সৃষ্টি করে কিছু টাকা প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়েছে। তা আবার ডলারে রূপান্তর করে কিছু ক্ষেত্রে হয়েছে ব্যাক টু ব্যাক এলসির দায় সমন্বয়। অনেক ক্ষেত্রে রাখা হয়েছে অসমন্বিত। প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদিত ঋণসীমার চেয়ে অনেক বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে। যদিও রহস্যজনক কারণে প্রধান কার্যালয় এ নিয়ে কখনও আপত্তি তোলেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর শাখাটিতে পরিদর্শন করলেও তারাও এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়নি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে পরিদর্শক দল এসব বিষয় প্রতিবেদনে আনেনি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অপটিমাম ফ্যাশনের ১০৬ কোটি টাকা ঋণসীমার বিপরীতে দেওয়া হয়েছে ২১৮ কোটি টাকা। আরএজেড অ্যাপারেলসের ৭১ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিপরীতে ১১৭ কোটি, আহানা নিট কম্পোজিটের ১৮ কোটি টাকা অনুমোদিত সীমার বিপরীতে ১০৪ কোটি, ওয়েস্ট অ্যাপারেলসের ৫৫ কোটি টাকা সীমার বিপরীতে ৯৩ কোটি, নিট রিফলেক্সের ৪৪ কোটি ৫০ লাখের বিপরীতে ৮৭ কোটি, এমবি নিট ফ্যাশনের ৫৫ কোটি টাকা সীমার বিপরীতে ৬৫ কোটি, আমানা নিটেক্স লিমিটেড ও আমানা নিটেক্সের ৪৬ কোটির বিপরীতে ৫৮ কোটি, নিট গার্ডেনের ২২ কোটি টাকা অনুমোদিত সীমার বিপরীতে ৪০ কোটি, নিউ রেজুলি অ্যাপারেলসের ২৪ কোটির বিপরীতে ২৯ কোটি টাকা ব্যাংকের অনাদায়ী রয়েছে। এ ছাড়া আইএফএস টেক্সওয়ারের কাছে ব্যাংকের পাওনা আছে ১০৩ কোটি টাকা। অবশ্য প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত সীমা ১৮৪ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রেও ঋণের টাকা ডলারে রূপান্তর করে ব্যাক টু ব্যাক এলসির দায় পরিশোধ করা হয়েছে। একই উপায়ে দেওয়া ঋণের মধ্যে ইউনাইটেড নিটওয়্যারসের ৬২ কোটি, নিট গার্ডেনের ৪৭ কোটি, লতিফ নিটিং মিলসের ৪০ কোটি, জাবন অ্যাপারেলসের ২৫ কোটি, মোডিস অ্যাটায়ারসের ১০ কোটির বিপরীতে ১৩ কোটি, জননী ফ্যাশনের ১১ কোটি টাকা এখন বকেয়া রয়েছে।
ব্যবস্থা নিতে দুদকে প্রতিবেদন: জালিয়াতির বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে গত ২২ এপ্রিল দুদকে চিঠি দেয় বিএফআইইউ। সেখানে অনিয়মের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরে বলা হয়, জালিয়াতির সঙ্গে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শাখা ব্যবস্থাপক মো. শহীদুল হাসান মল্লিক, শাখার সেকেন্ড অফিসার মুশফিকুল আলম, ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনচার্জ দীপক কুমার দেবনাথ এবং ক্রেডিট ইনচার্জ মোহাম্মদ মেহেদি হাসান সরকার জড়িত বলে প্রতীয়মান হয়। পাশাপাশি প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তা, ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ইন্টারনাল অডিট ও আন্তর্জাতিক বিভাগের কর্মকর্তারা দায় এড়াতে পারেন না। বিএফআইইউর প্রতিবেদন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপনের পর চার কর্মকর্তাসহ ছয়জনকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রধান কার্যালয়ের সংযুক্ত করা হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদককে অনুরোধ জানানো হয়।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনের আলোকে ভুয়া বিলের মাধ্যমে ঋণের নামে ৩ হাজার ৮১ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। বিএফআইইউর তদন্তে যে চার কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়, তারা যেন দেশ ছাড়তে না পারেন– সে জন্য প্রথমে গত ২৩ জুন আদেশ দেন আদালত। শহীদুল হাসান মল্লিক, মুশফিকুল আলম, দীপক কুমার দেবনাথ ও মেহেদি হাসান সরকার ছাড়াও আর কার কার, কী দায় রয়েছে তা খোঁজা হচ্ছে। অনুসন্ধান শেষে সংস্থাটির পক্ষ থেকে দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলে জানা গেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)