
অনুমোদনহীন ২৮ তলা ভবন, পাচারের অভিযোগ; তদন্তে আরও বড় তথ্য উদঘাটনের সম্ভাবনা
**রাজধানীর বনানীতে ডিএনসিসি নিয়ন্ত্রিত সরকারি জমিতে ‘বনানী সুপার মার্কেট কাম হাউজিং’ প্রকল্পে অনিয়ম, প্রতারণা ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে ইউনিক গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ নূর আলী এবং তার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বোরাক রিয়েল এস্টেট প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত ৭ মে বনানী থানায় দায়ের করা এই মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন ওই ভবনে হোটেল ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে ১১৫ কোটি ৫৮ লাখ ২৪ হাজার ৭০৭ টাকা অবৈধ আয় ও পরবর্তীতে তা মানিলন্ডারিং করার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
সূত্র ও অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, অনুমোদনের লঙ্ঘন, চুক্তি ভঙ্গ ও সরকারি সম্পত্তি বেদখলের মাধ্যমে নির্মিত এই ভবনটি দীর্ঘদিন ধরেই আইনি জটিলতা ও প্রশ্নবিদ্ধ কার্যকলাপের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সিআইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলাটির তদন্ত চলাকালীন বেদখলকৃত সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের পর লন্ডারকৃত অর্থের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অভিযোগগুলোর মূল বক্তব্য নিম্নরূপ:
নির্মাণ ও অনুমোদন সংক্রান্ত অনিয়ম: রাজধানীর বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে ডিএনসিসির জমিতে মাত্র ১৪ তলা ভবন নির্মাণের চুক্তি থাকলেও বোরাক রিয়েল এস্টেট তা ভঙ্গ করে রাজউক এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন)-এর প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র না নিয়েই অবৈধভাবে ২৮ তলা ভবন নির্মাণ করে। এই অতিরিক্ত উচ্চতা বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণে ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে শীর্ষ এই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ জোরালরূপে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
চুক্তি লঙ্ঘন ও প্রভাব বিস্তার: অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না করে এবং ডিএনসিসিকে প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে না দিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রভাব খাটিয়ে অস্বাভাবিক উপায়ে চুক্তি সংশোধন করানো হয়েছে। ২০০৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পায় ৭০ শতাংশ এবং ডিএনসিসি পায় মাত্র 30 শতাংশ।
অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিং: অনুমোদনহীন ওই ভবনে পাঁচ তারকা হোটেল ‘শেরাটন’-এর ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে অভিযুক্তরা অবৈধভাবে ১১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি আয় করে এবং তা হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে পাচার করেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। আইন অনুযায়ী, এই ধরনের অপরাধ আমলযোগ্য, অ-আপোষযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য।
গত শতকের আশির দশকে জনশক্তি রপ্তানি খাতে পথচলা শুরু নূর আলীর। এরপর গত চার দশকে আবাসন, জ্বালানি, হোটেল ও হসপিটালিটি, হাসপাতাল, কৃষি, শিক্ষা, আর্থিক খাত ও মিডিয়াসহ নানা খাতে ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটিয়ে ‘ইউনিক গ্রুপ’ নামে সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। তবে ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি নানা বিতর্ক ও অনিয়মের অভিযোগ সর্বত্রই তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
শুধু শেরাটন ভবন নয়, গত বছর সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি করতে গিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ৪০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে নূর আলীসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় আরেকটি মামলা করে সিআইডি।
জনশক্তি রফতানি খাতের একটি সিন্ডিকেটের হোতা হিসেবে নূর আলীর ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে বিভিন্ন অনুসন্ধানে। ২০১৬ সালে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনুমতি পাওয়া ১০ বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি ‘নূর আলী সিন্ডিকেট’ নামে চিহ্নিত হয়। অভিযোগ, জনপ্রতি সর্বনিম্ন দেড় লাখ টাকা হারে অধিক অর্থ আদায়ের মাধ্যমে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। পরে ২০১৮ সালে ছয় হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়।
পাশাপাশি, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানিকারকদের একটি সিন্ডিকেটে নূর আলীসহ ৩১ জনের নাম পাওয়া গেছে, যারা সরকার নির্ধারিত ফি'র চেয়ে তিনগুণের বেশি অর্থ আদায় করেছেন।
সিআইডি মামলাটি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২-এর ৪(২)/৪(৪) ধারায় দায়ের করেছে। এই আইনের অধীন অপরাধসমূহ আমলযোগ্য, অ-আপোষযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য। ধারা ৪ অনুযায়ী, কেউ মানিলন্ডারিং অপরাধ করলে তা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং অনধিক ১২ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগ পরিচালনা করছে। অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদঘাটন ও অভিযুক্তদের গ্রেফতারের স্বার্থে সিআইডির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তদন্ত চলাকালীন বেদখলকৃত সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ ও অর্থপাচারের পরিমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনে দুদক ও অন্যান্য সংস্থার সহায়তা নেয়া হবে।
জানা গেছে, বনানীর কাঁচাবাজার ও মার্কেট সংলগ্ন আরো ১৬ কাঠা জমি নূর আলীর প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে দখল করেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় হাজার কোটি টাকা। এই জমির বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)