পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের প্রতিষ্ঠান মেঘনা সিমেন্ট মিলস পিএলসি ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে পড়েছে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯০ কোটি টাকা। ঋণখেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংক ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারা এবং কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোম্পানিটির টিকে থাকা নিয়েই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা, কারণ প্রতিষ্ঠানটি অবলুপ্তির পথে।
দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রাচীনতম একটি কোম্পানি মেঘনা সিমেন্ট। প্রায় তিন দশক আগে ১৯৯৭ সালে পুঁজিবাজারে যাত্রা শুরু করা এই কোম্পানিটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পত্রিকার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যাংক ঋণের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে কোম্পানিটি এখন পুরোপুরি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার উপক্রম হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে কোম্পানিটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯০ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের (৩১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা) প্রায় নয় গুণ ।
মূলে কী ঘটেছে? ঋণখেলাপির দুষ্টচক্র: অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেঘনা সিমেন্টের প্রধান সমস্যা শুরু হয় ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে। একপর্যায়ে কোম্পানিটি ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণপত্র (এলসি) খুলে দিতে রাজি হয়নি । এলসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদেশ থেকে ক্লিংকার (সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল) আমদানি করা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
কাঁচামালের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানিটির নিজস্ব উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। শুধু নিজেদের কারখানার চাকা সচল রাখতে অন্য কোম্পানির হয়ে উৎপাদন (কনভার্সন আয়) দিয়ে কোনো রকম টিকে আছে প্রতিষ্ঠানটি ।
লোকসানের ভয়াবহ চিত্র: কোম্পানি সূত্র ও নিরীক্ষিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিক্রি কমার সঙ্গেই তাল মিলিয়ে নিট লোকসানের হার আকাশচুম্বী হয়েছে।
বিক্রির পরিমাণ: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে পণ্য বিক্রি হয়েছিল ১৮৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকায় ।
লোকসানের হিসাব: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২২ কোটি ৬১ লাখ টাকা লোকসানের পর, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান দাঁড়ায় ১১৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আর চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ৯ মাসেই লোকসান ১৫২ কোটি ৪ লাখ টাকা ।
মোট ক্ষতি: সর্বশেষ ২ বছর ৯ মাসের মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯০ কোটি ১৯ লাখ টাকা ।
শেয়ারহোল্ডারদের কী অবস্থা?: এই বিপুল লোকসানের প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগকারীদের টাকায়। কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) বর্তমানে ঋণাত্মক ৫১.৩৩ টাকায় নেমে এসেছে । অর্থাৎ কোম্পানির যত সম্পদ আছে, তার চেয়ে দায় অনেক বেশি। নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, এখনই কোম্পানিটি অবসায়ন (লিকুইডেট) করলে শেয়ারহোল্ডাররা এস আলম গ্রুপের আলোচিত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের মতো কিছুই পাবেন না ।
নিরীক্ষকের শঙ্কা ও কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা: আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করে কোম্পানির নিরীক্ষক ইসলাম আফতাব কামরুল এন্ড কোং স্পষ্ট ভাষায় শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "কোম্পানিটির টিকে থাকা (Going Concern) নিয়ে গুরুতর শঙ্কা রয়েছে" ।
এ বিষয়ে মেঘনা সিমেন্ট কর্তৃপক্ষ স্টক এক্সচেঞ্জকে জানিয়েছে, ঋণখেলাপি ও এলসি জটিলতার কারণে কাঁচামাল সংগ্রহ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি রেগুলার উৎপাদন থেকে সরে গিয়ে কম লাভজনক কনভার্সন আয়ের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয় ।
পটভূমি: অতীতের অনিয়মের ইতিহাস: বর্তমান সংকট একদিনে সৃষ্টি হয়নি। ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে আমরা প্রকাশ করেছিলাম যে, মেঘনা সিমেন্ট আর্থিক প্রতিবেদনে প্রায় ৪৬৭ কোটি টাকার নির্মাণাধীন সম্পদ দেখালেও তা ব্যবহার শুরু করার পরেও স্থায়ী সম্পদে রূপান্তর ও অবচয় ধার্য করেনি । অর্থায়নের এই স্বচ্ছতার অভাব আজকের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করছিল। যদিও ওই প্রতিবেদনে কোম্পানি লভ্যাংশ দিচ্ছিল, তবে শুরুতেই সতর্ক সংকেত ছিল।
শেয়ারবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যেখানে কোম্পানিটির মালিকানার ৫৮ শতাংশ ধারণ করছেন , সেখানে আজ তারা তাদের বিনিয়োগ হারানোর পথে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ২৯০ কোটি টাকা লোকসান এবং উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া কোনো সুস্থ কোম্পানির লক্ষণ নয়। পত্রিকা মনে করে, কোম্পানিটির আশু উদ্ধারে বিএসইসি (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। নতুবা এই তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি চিরতরে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)