মাত্র ৩৩ টাকা কেজি দরে আপেল এবং ২৮ টাকায় কাঁচামরিচ আমদানির ঘোষণা দিয়ে অস্বাভাবিক কম মূল্য দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। এভাবে ভারত থেকে প্রায় ১২৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে পুরান ঢাকার প্রতিষ্ঠান গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজ। জানা গেছে, গত তিন বছরে যেখান থেকে অধিকাংশ আমদানির তথ্য দেখানো হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানটি মূলত শাড়ি ও গহনা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এলসি ইস্যুকারী ব্যাংক ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে গেলেও বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে। অস্বাভাবিক কম দামে আমদানি দেখানোর পেছনে অর্থ পাচারের সন্দেহে পুরো ঘটনাটি এখন তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত তিন বছরে গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজের নামে মোট ২৩১টি এলসির বিপরীতে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ডলারের আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে এসব আমদানি সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখার মাধ্যমে সর্বাধিক ১৭৪টি এলসি খোলা হয়, যেখানে প্রায় ৮৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ফল আমদানি দেখানো হয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪৬টি এলসির বিপরীতে ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকার আমদানি করা হয়। অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংক ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১টি এলসির মাধ্যমে ৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা সমমূল্যের পণ্য আমদানির তথ্য দেখায়। পরবর্তীতে ইসলামী ব্যাংক আর কোনো এলসি না খোলায়, স্ট্যান্ডার্ড ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের অনিয়ম শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানতে চাইলে গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মজিবুর রহমান বলেন, ভারত থেকে তিনি ২৭ সেন্ট দরে আমদানি করেছিলেন। তবে শুল্ককর পরিশোধ, পরিবহন খরচ এবং ২৫ শতাংশ মতো ড্যামারেজ হিসাব করে দেশের বাজারে বিক্রি করেন। সব মিলিয়ে ওই সময় দেশের বাজারে তিনি ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে আপেল বিক্রি করেছিলেন। তাঁর দাবি, হুন্ডিতে কোনো টাকা লেনদেন হয়নি। ভারতে শুল্ক কর্তৃপক্ষ আছে। আবার বাংলাদেশে অন্তত ৭০ সেন্ট ধরে শুল্কায়ন করা হয়। ব্যাংক বাজার যাচাই করে এরপর এলসি ইস্যু করে। সুতরাং কম বা বেশি দর দেখানোর সুযোগ নেই।
যেভাবে সামনে এলো: গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজ গত বছরের ৩ আগস্ট ভারতের সুরাইয়া এন্টারপ্রাইজ থেকে ৫৪ হাজার ৩৯৫ ডলারের পণ্য আমদানির এলসি খোলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন মনিটরিং সিস্টেমে পরীক্ষামূলকভাবে তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রতি কেজি আপেল ২৭ সেন্ট বা ৩৩ টাকা এবং টমেটো ও কাঁচামরিচ ২৩ সেন্ট বা ২৮ টাকায় আমদানি দেখানো হয়। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম হওয়ায় বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সন্দেহ হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজের তিন বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে। প্রতিষ্ঠানটি চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত এবং ২০২৪-২৫ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট এক কোটি ২ লাখ ৮৬ হাজার ডলারের পণ্য আমদানি করে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্যমান ১২৫ কোটি ২৭ লাখ টাকার বেশি। এসব আমদানির অধিকাংশ পশ্চিমবঙ্গের সুরাইয়া এন্টারপ্রাইজ থেকে। এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনলাইন বিজ্ঞাপন থেকে দেখা যাচ্ছে, তারা মূলত শাড়ি, থ্রি-পিস, ইমিটেশন জুয়েলারি বিক্রি করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সুরাইয়া এন্টারপ্রাইজের ‘ডিউ ডিলিজেন্স রিপোর্ট’ থেকে নিশ্চিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি আসলে ফল বা শাকসবজি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তারা গার্মেন্টস ও ফ্যাশনেবল গহনা বিক্রি করে। এ বিষয়ে আমদানিকারক মজিবুর রহমানের বক্তব্য–সুরাইয়া এন্টারপ্রাইজ এখন ফলের ব্যবসা করে। আগে হয়তো করত না।
বাজারের সঙ্গে আমদানি দরে বড় পার্থক্য: ভারতের ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের দরের তথ্য সরবরাহকারী সাইট ‘নাপান্টার’ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২১ আগস্ট আপেলের সর্বনিম্ন দর ছিল ১৭০ টাকা কেজি। আর সর্বোচ্চ ছিল ১৯০ টাকা কেজি। ওইদিন মানভেদে কাঁচামরিচের কেজি ৬৭ থেকে ১২০ টাকা ছিল। প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হয় ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা দরে। এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আপেল সর্বনিম্ন ৭০ সেন্ট ধরে শুল্কায়ন করবে। টমেটো ও কাঁচামরিচ শুল্কায়ন করতে হবে অন্তত ৫০ সেন্ট ধরে। ফল বিক্রেতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের আগস্টে দেশের বাজারে আপেল ৩৫০ থেকে ৪২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। মৌসুম না হওয়ায় দেশের বাজারে তখন প্রতি কেজি টমেটোর দর ছিল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। কাঁচামরিচের দর অস্বাভাবিক বেড়ে ঢাকার বাজারে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় উঠেছিল। কাঁচামরিচ আমদানির জন্য আলাদাভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। সাধারণভাবে দেশে উৎপাদন বা অন্য কোনো কারণে হঠাৎ দর বেড়ে গেলে তখন আমদানির অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়। গত বছরের আগস্টে দর বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমোদন দেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আপেলসহ যে কোনো ফল আমদানিতে ১৩৬ শতাংশ শুল্ক কর দিতে হয়। আর কাঁচামরিচ ও টমেটোতে নির্দিষ্ট শুল্ক নির্ধারিত নেই। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় শুল্ক আরোপ করা হয়। গত বছরের আগস্টে প্রতি কেজিতে শুল্ক নেওয়া হয়েছিল ৩৬ থেকে ৪০ টাকা। টমেটো আমদানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি নেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাখ্যা তলব: বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের উদ্দেশে পাঠানো চিঠিতে অস্বাভাবিক কম দামে আমদানির কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব আমদানি দেখানো হয়েছে, সেটি ভিন্ন খাতের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত—এ বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে আরও বলা হয়, গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজের আইআরসি অনুযায়ী ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যথাক্রমে ২০ ও ৫০ কোটি টাকার আমদানি সীমা নির্ধারিত থাকলেও কীভাবে তারা ২৬ কোটি ৪০ লাখ এবং ৮৫ কোটি ১৮ লাখ টাকার পণ্য আমদানি করেছে—তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। এদিকে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের কাছেও নির্ধারিত আমদানি সীমা অতিক্রম এবং বাজারমূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে ফলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে জবাব চাওয়া হয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক তাদের জবাবে জানিয়েছে, ভারতে ফলের অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে কম দামে আমদানি করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া আমদানি করা ফলের মান তুলনামূলক কম এবং প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট ছিল—এই যুক্তিও তুলে ধরা হয়। তবে এসব ব্যাখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি। আমদানিনীতি অনুযায়ী, আমদানির সময় আন্তর্জাতিক বাজারদর ও পণ্যের গুণগত মান যাচাই করা বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যাংক এ নিয়ম লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেনেশুনে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে এবং নষ্ট বা নিম্নমানের পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। এছাড়া আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে কম দামে আমদানি দেখিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, এখানে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি নিশ্চিত। এভাবে কম দরে আমদানি দেখিয়ে সরাসরি দুটি অপরাধ হয়েছে। প্রথমত, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আরেকটি হলো– নিশ্চিতভাবে বাকি অর্থ বিদেশে পরিশোধ করা হয়েছে হুন্ডিতে। তবে কারও বিরুদ্ধে শাস্তি দিতে হলে সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদনের দরকার হয়। যে কারণে বিষয়টি পরিদর্শন বিভাগে পাঠানো হয়েছে। পরিদর্শন প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)