
ছোট শহর চাপাইনবাবগঞ্জ। এখানে নেই আকাশছোঁয়া ভবন, নেই কর্পোরেট কিংবা তীব্র কোলাহল। দুই-তিনতলা বাড়ি, সাদামাটা দোকান, মফস্বলী সরলতায় মোড়ানো এ শহরের নিজস্ব ধীরস্থির ছন্দ। কিন্তু এই নিরীহ শহরের বুকেই যেন হঠাৎ দাঁড় করানো হয়েছে এক বৈপরীত্যের নাম। শহরের প্রাণকেন্দ্র বড় ইন্দারার মোড়ে সোনালী ব্যাংকের গলিতে সাধারণ দোতলা-তিনতলা ভবনের মাঝে মাথা তুলেছে উচ্চাভিলাষী ‘আজিজী টাওয়ার’। নির্মাণ শেষ হয়েছে পাঁচতলা, লক্ষ্য দশতলা। ঝকঝকে এসকেলেটর, লিফট, কার্গোলিফট, শতাধিক গাড়ির পার্কিং—এই সব আধুনিকতায় স্থানীয়দের বিস্ময়ের সীমা নেই। এই বহুতলের মালিক মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবর আজিজী, যিনি সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার (তদন্ত) পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
পেশাগত জীবনে তিনি বিচার বিভাগের ৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা এবং পরে জেলা জজ হিসেবে দায়িAdd Postত্ব পালন করেন। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি সিকদার গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ করে তার অবস্থান পরিবর্তন হয়। পুরনো আনুগত্য ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক চেতনার পতাকাবাহী হয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কৌশলী প্রক্রিয়ায় জায়গা করে নেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার (তদন্ত) পদে।
তথ্য অনুযায়ী, ‘আজিজী টাওয়ার’ নির্মাণের জন্য ২০১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংকের রাজশাহী শাখা থেকে ১২ কোটি টাকার হাউজিং ঋণ অনুমোদন পান তিনি। কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় সুদসহ তার বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ফলে তিনি ঋণখেলাপিতে পরিণত হন।

চাকরি বিধিমালা স্পষ্টভাবে বলে, কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি দুদকের কমিশনার হওয়ার যোগ্য নন। কিন্তু তার পরও ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর তাকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আরও বিস্ময়কর হলো, নিয়োগের মাত্র ১৬ দিনের মাথায়, ২৬ ডিসেম্বর তার খেলাপি ঋণ রহস্যজনকভাবে পুনঃতফসিল হয়ে যায়। ফলে তিনি দ্রুত খেলাপি তকমা থেকে মুক্তি পান। এ সময় ন্যাশনাল ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ পাচার ও লোপাট সংক্রান্ত তদন্তের নথি তার অধীনেই থাকায় ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্যখাতের আলোচিত ব্যক্তি মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু গ্রেফতার হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পান। তার জামিন বাতিলের ব্যাপারে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি দুদক। মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে সমঝোতার ভিত্তিতে চার্জশিট পর্যায় থেকে দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা এক অভিযোগে আরও গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, শিবগঞ্জের শাহ নেয়ামতউল্লাহ মাজার কমপ্লেক্সের নামে অনুদান সংগ্রহ করা হতো। সেখানে একটি এতিমখানা ও মাদ্রাসা রয়েছে। আজিজীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মনিরুল ইসলাম (যিনি নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে পরিচয় দেন)-এর মাধ্যমে বিভিন্ন অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। একটি গ্রুপ অব কোম্পানির মালিকের কাছ থেকে মামলায় খালাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এতিমখানার নামে প্রায় ১৬ কোটি টাকা অনুদান নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
চাপাইনবাবগঞ্জের শান্ত শহরের বুকেই তাই এখন দাঁড়িয়ে আছে এক তীব্র বৈপরীত্য—একদিকে সাধারণ মানুষের সাদামাটা জীবন, অন্যদিকে বিতর্কে ঘেরা এক বহুতল সাম্রাজ্য। আর এই দৃশ্য দেখে অনেকের মুখেই এখন এক তির্যক বাক্য ঘুরে বেড়ায়: ‘দুদকের সততা, আজিজীর বহুতল’।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)