
বিশেষ প্রতিনিধি : বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি পাওয়া এবং পরবর্তীতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) হিসেবে ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণকারী অতিরিক্ত সচিব মো. আতিকুর রহমান (পরিচিতি নং ৬৫৪২, বিসিএস ১৮তম ব্যাচ) এখন একাধিক গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি। তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, কর্মীদের হয়রানি ও নিয়োগ–বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত চলছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে নতুন দায়িত্ব—আরও আগে থেকেই অভিযোগের ছায়া: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৩ নভেম্বরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আতিকুর রহমানকে ডিপিই–তে অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়। একই দিন তাকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ১১ নভেম্বর তিনি অধিদপ্তরে যোগদানপত্র পাঠিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ নিশ্চিত করেন। তবে দায়িত্ব বদলের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই তার বিরুদ্ধে ইন্টারকন্টিনেন্টালে কর্মরত অবস্থায় গুরুতর অভিযোগ ওঠে।
ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের নারী প্রশিক্ষণার্থীর যৌন হয়রানির অভিযোগ : ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের মালিক বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড (বিএসএল)-এর সাবেক এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আতিকুর রহমান এক নারী প্রশিক্ষণার্থীকে নিয়মিত হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, ফোনকল, ব্যক্তিগত ছবি চাওয়া, অর্থ পাঠানো এবং অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারী ওই নারী প্রশিক্ষণার্থী চিঠি পাঠিয়েছেন-প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। অভিযোগপত্রে যা উল্লেখ রয়েছে-১২ এপ্রিল ২০২৩ আতিকুর রহমান হোয়াটসঅ্যাপে ছবি চান। ১৩ এপ্রিল চাকরির আশায় তিনি ছবি পাঠান। এরপর আতিকুর রহমান নিয়মিত ফোন-বার্তা পাঠাতে থাকেন। ১৭ এপ্রিল আবার ভিন্ন ধরনের ছবি চান। ২২ এপ্রিল তিনি ওই নারীর ব্যক্তিগত নম্বরে ৩,০০০ টাকা বিকাশ করেন। নিয়মিত ফোন করে তিনি নিজের ‘৩এক্স কনটেন্ট দেখার অভ্যাস’ সম্পর্কে বলেন-অভিযোগকারীর দাবি। ওই নারীকে একান্তে বাইরে যাওয়ার অনৈতিক প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় প্রতিশ্রুত চাকরি পরে আর দেননি। তিনি দাবি করেন, “হোটেলের আরও নারীরাও একইভাবে হয়রানির শিকার, কিন্তু ভয় ও চাকরি হারানোর আতঙ্কে কেউ মুখ খুলছেন না।”
তদন্ত-কার্যক্রম শুরু, নোটিশ জারি : আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। ভুক্তভোগীর নামে চিঠি পাঠানো হয়েছে-২ জানুয়ারি ২০২৪, সকাল ১০টা কক্ষ নং-১৯১৮, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। চিঠিতে তদন্তকারীদের সামনে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন-সিনিয়র সহকারী সচিব রুমানা ইয়াসমিন (অতিরিক্ত দায়িত্ব)।
ইন্টারকন্টিনেন্টালে দুর্নীতি-অনিয়ম ও সিন্ডিকেট অভিযোগে উত্তাল শ্রমিক-কর্মচারীরা -১৪ দফা দাবিতে আন্দোলন: ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট, শাহবাগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের প্রধান ফটক অবরোধ করে চাকরিচ্যুত ও বৈষম্যের শিকার শ্রমিক–কর্মচারীরা ১৪ দফা দাবি উত্থাপন করেন। তাদের অভিযোগে আতিকুর রহমানসহ হোটেলের-ভারতীয় জেনারেল ম্যানেজার, মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক (এইচআর ডিরেক্টর) নাজমুল হুদা, আইটি পরিচালক সুবীর বৈষ্ণব, এর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠে- শ্রমিক–কর্মচারীদের অভিযোগ, অনিয়মিত ও অবৈধ নিয়োগ। ভারতীয় জেনারেল ম্যানেজারকে গুলশানে ২ লাখ টাকার ভাড়া বাসা দিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়। কর্মীদের ওপর মানসিক নির্যাতন ও হুমকি। দিনে–দিনে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক রেখে স্থায়ী না করা। কয়েকজনকে ব্যক্তিগত কারণে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা। হোটেলের কর্মীদের মোবাইল ফোন জব্দ করা, ভয়েস রেকর্ড করা—মানবাধিকার লঙ্ঘন। আইটি ডিরেক্টরের বিরুদ্ধে ইমেইল হ্যাকিং সংশ্লিষ্ট অভিযোগ। সার্ভিস চার্জের কোটি টাকা আত্মসাৎ। জাল সার্টিফিকেটধারীদের নিয়োগ। অনিয়মিত টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দালাল-সিন্ডিকেট কর্তৃক দরপত্র বন্টন। শ্রমিকদের দাবি- “যে ফ্যাসিবাদের কারণে আগের সরকারের পতন হয়েছিল, একই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতায় ইন্টারকন্টিনেন্টালের পতন অনিবার্য।” সমালোচনার মুখে নতুন দায়িত্বে আতিকুর রহমান—প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক যাচাই নিয়ে।
যৌন হয়রানি, দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত-প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক-পদে পদায়ন করায় প্রশাসনিক মহলে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষা খাতের দায়িত্ব নেওয়ার আগে এসব অভিযোগের ব্যাপারে যথাযথ ব্যাকগ্রাউন্ড ভেটিং বা যাচাই করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও জল্পনা রয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ কী? মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, যৌন হয়রানির অভিযোগে প্রশাসনিক তদন্ত চলছে, ইন্টারকন্টিনেন্টালের শ্রমিক-কর্মচারীর উত্থাপিত অভিযোগও পর্যালোচনায় রয়েছে। প্রয়োজন হলে বিষয়টি দুদক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও যেতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত আতিকুর রহমান তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ বিষয়ে কোনো লিখিত বা প্রকাশ্য বক্তব্য দেননি।
সংশ্লিষ্টদের মতামত : অভিযোগ বিশাল ও বহুমাত্রিক হওয়ায় সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। ভুক্তভোগী, হোটেল কর্তৃপক্ষ, মন্ত্রণালয়, এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য-সবই এই তদন্তকে প্রভাবিত করবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)