
সরকারের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানোন্নয়নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা রয়েছে-
মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি: শিক্ষকদের নিয়োগ এবং পদোন্নতি সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে, যার মধ্যে পিএইচডি, মাস্টার্স এবং স্নাতক ডিগ্রি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। SSC ও HSC এবং গবেষণা কার্যক্রম এই প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে না। দলীয় পরিচয় বা স্বজনপ্রীতির কোনও স্থান থাকবে না।
গবেষণার সংস্কৃতি: গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সুবিধা এবং বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে, যা শিক্ষক এবং গবেষকদের নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ দেবে।
দলীয়করণ ও স্বৈরাচার পরিহার: প্রশাসনিক পদগুলোতে পেশাদারিত্ব ও সততাকে প্রাধান্য দিতে হবে, যাতে একটি ইতিবাচক ও মুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত: যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতকে যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে আনতে হবে।
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সমঝোতা: আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ গবেষণা এবং শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা, বাণিজ্যিকীকরণ থেকে বিরত থেকে গবেষণানির্ভর শিক্ষা ও জ্ঞান সৃষ্টির মাধ্যমে ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ নিশ্চিত করা।গবেষণার সংস্কৃতি জোরদার করতে কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে:বাজেট বৃদ্ধি: বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বৃদ্ধি করে গবেষণার জন্য আধুনিক সুবিধা ও সুযোগ সৃষ্টি করা।মডার্ন ফ্যাসিলিটিজ: গবেষকদের জন্য আধুনিক গবেষণার সুবিধা ও প্রযুক্তি প্রদান।গবেষণা উদ্দীপনা: শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা যাতে তারা নতুন জ্ঞান ও উদ্ভাবন করতে পারেন।সমন্বিত কার্যক্রম: শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা।এই পদক্ষেপগুলো গৃহীত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমের প্রতি উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে এবং গুণগত পরিবর্তন আনবে।তরুণ প্রজন্ম উদ্যম, সৃজনশীলতা ও দেশসেবার আগ্রহকে যথাযথ শিক্ষা ও গবেষণামুখী পরিবেশের মাধ্যমে পরিচালিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে সেই জ্ঞানভিত্তি, যেখানে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। এ প্রেক্ষিতে, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে শিক্ষকতার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত জরুরি।বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশে (যেমন: চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান) বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের জন্য পিএইচডি এবং প্রায়শই পোস্টডক্টরাল গবেষণা অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। এটি শিক্ষকের গবেষণা দক্ষতা ও জ্ঞানের গভীরতা নিশ্চিত করে, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখে।ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে একটি আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে:৫৬% শিক্ষকের উচ্চতর ডিগ্রি (পিএইচডি) নেই।উচ্চপদে (প্রফেসর) শিক্ষক বেশি, কিন্তু নিচের স্তরে (লেকচারার, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর) পিএইচডিধারীর সংখ্যা অপ্রতুল।এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত এখনও গবেষণা ও গুণগত শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে।QS ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাঙ্কিং এ ভালো অবস্থান অর্জনের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:পিএইচডিধারী শিক্ষকের অনুপাত: যত বেশি পিএইচডিধারী শিক্ষক, তত ভালো স্কোর।বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী: আন্তর্জাতিকীকরণ র্যাঙ্কিংয়ের একটি মূল বিষয়।গবেষণা প্রকাশনা: উচ্চমানের জার্নালে নিবন্ধ প্রকাশ।বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা (৫৬% শিক্ষক পিএইচডি বিহীন) আমাদের আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকার মূল কারণ।র্যাঙ্কিং ও গুণগত শিক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে, যেখানে-সেখানে জেলাভিত্তিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ:পর্যাপ্ত পিএইচডিধারী শিক্ষক পাওয়া যায় না।গবেষণার অবকাঠামো ও পরিবেশ গড়ে উঠে না।ফলে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ডিগ্রি দিতে পারে, কিন্তু গুণগত শিক্ষা বা গবেষণা চালাতে পারে না।তৃতীয় স্তরে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) ভালো একাডেমিশিয়ান হওয়ার জন্য শুধুমাত্র এসএসসি/এইচএসসির ফলাফল অর্থহীন। এখানে প্রয়োজন:গবেষণা দক্ষতা।জার্নালে প্রকাশনা।সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতা।শিক্ষাদানে নৈপুণ্য:পিএইচডি বাধ্যতামূলককরণ: নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএইচডি বাধ্যতামূলক করতে হবে।বিদ্যমান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ: যাদের পিএইচডি নেই, তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও সুযোগ তৈরি করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনে উৎসাহিত করতে হবে।পিএইচডি ছাড়া কাউকেই সহকারী অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া উচিত নয়। একসময় ভালো ছাত্র হলেও, যিনি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেননি, তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের জন্য পাঠানো উচিত নয়; বরং স্কুল স্তরে পাঠদান করার জন্য তাঁকে স্থানান্তর করা উচিত, যদিও স্কুলের জন্য শিক্ষকতার জন্য বিএড প্রয়োজন।
BAC ও UGC যৌথভাবে বাংলাদেশি জার্নালগুলোর একটি মানসম্পন্ন র্যাঙ্কিং সিস্টেম চালু করতে পারে।উচ্চমানের জার্নালগুলোকে স্কোপাস বা WoS-এ অন্তর্ভুক্ত করতে সহায়তা করা।বিআইডিএস জার্নাল-এর মতো জাতীয় জার্নালগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ গবেষণা প্রকল্প।বিদেশি শিক্ষক আমন্ত্রণ।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময় কার্যক্রম।বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থান অর্জনের জন্য পিএইচডিধারী শিক্ষকের অনুপাত বৃদ্ধি করা জরুরি। একই সাথে, গবেষণা সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে এবং জার্নালগুলোর মানোন্নয়ন করতে হবে। BAC ও UGC-এর সমন্বিত উদ্যোগ এবং সরকারের দৃঢ় নীতিগত সিদ্ধান্তই পারে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও শিক্ষাদানে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে।একথা সত্য যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী সবাই ভালো শিক্ষক নাও হতে পারেন, এবং পিএইচডি ছাড়াও কেউ কেউ ভালো শিক্ষক হতে পারেন। তবে একটি মৌলিক সত্যও হলো, একজন মাস্টার্স ডিগ্রিধারী যিনি খারাপ শিক্ষক, পিএইচডি গবেষণার মাধ্যমে তার জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও শেখানোর পদ্ধতির উন্নতি হওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা থাকে। পিএইচডি একটি শিক্ষককে গভীর তাত্ত্বিক জ্ঞান, স্বাধীন গবেষণার দক্ষতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তা শিখিয়ে থাকে, যা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাদানের মৌলিক প্রয়োজন।বাধ্যতামূলক পিএইচডি: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের (BAC) জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত যাতে সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক শর্ত হয়।
শিক্ষকদের কেবল পাঠদানের বোঝা না দিয়ে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময়, অবকাঠামো ও প্রণোদনা দিতে হবে। ইউজিসি'র উচিত গবেষণা ভিত্তিক নিবন্ধ প্রকাশের জন্য বাধ্যতামূলক নিয়ম চালু করা।
শিক্ষা সংস্কার:ঢাকা স্কুল অফ ইকোনমিক্স (DScE) কে বিআইডিএস গ্র্যাজুয়েট স্কুলের সাথে একীভূত করে একটি উচ্চতর গবেষণা-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গঠন করা।ভর্তি প্রক্রিয়ায় কেবল পরীক্ষার ফল নয়, সমালোচনামূলক চিন্তা ও সৃজনশীলতার মূল্যায়ন যুক্ত করা।অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষার পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও যোগাযোগ বিষয়ক কোর্স বাধ্যতামূলক করা।প্রথাগত মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে কেস স্টাডি, সমস্যা-ভিত্তিক শিখন (PBL), ধারণা ম্যাপিং ও প্রযুক্তি-সহায়ক শিক্ষার (রাস্পবেরি পাই ল্যাব, VR ক্লাসরুম) প্রবর্তন করা।বিমসটেক ও সার্ক জোটকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং আসিয়ানের সদস্যপদ অর্জনের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাজার, বিনিয়োগ ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ বৃদ্ধি করা।বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথভাবে উন্নয়ন অর্থনীতি, পরিবেশ অর্থনীতির মতো বিষয়ে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করা।রূপান্তর কৌশল বাস্তবায়নে ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করতে হবে। তহবিলের উৎস হতে পারে:প্রবাসী বন্ড;তৈরি পোশাক রপ্তানির উপর বিশেষ কর;হালাল পণ্য, ওষুধ ও হালকা প্রকৌশল খাতের উন্নয়ন;ADB, NDB, IFC-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ঋণ।প্রধান লক্ষ্যমাত্রা (২০৫০):দারিদ্র্যের হার ১৫%-এ নামানো।রপ্তানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।মাথাপিছু জিডিপি USD ৬,৫০০ ;প্রযুক্তি খাত থেকে বার্ষিক ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়।প্রতিষ্ঠানিকীকরণ (২০২৬-২০২৭): প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে 'জাতীয় উৎপাদনশীলতা কাউন্সিল' গঠন। গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও যশোরে তিনটি 'দক্ষতা কারখানা' চালু। জাতীয় এআই আইন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ আইন প্রণয়ন।বিস্তৃতি (২০২৭-২০২৮): সারা দেশে ১০টি 'দক্ষতা কারখানা' স্থাপন। এআই চাকরি ম্যাচিং প্ল্যাটফর্ম চালু। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:১৫।একীকরণ (২০২৮-২০২৯): অবকাঠামো প্রকল্পে (ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, মোংলা বন্দর অটোমেশন) দক্ষতা উন্নয়ন যুক্ত করা। কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালু ও মডুলার পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন শুরু। ২০২৯ কে Industry 6.0 দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য।একটি ব্যক্তিগত কেস স্টাডি: প্রাতিষ্ঠানিক
ঢাকা স্কুল অফ ইকোনমিক্স (DScE)-এর কার্যক্রম একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত। শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ এই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তহবিল পেলেও পর্যাপ্ত যোগ্য অধ্যাপক (যেমন: পিএইচডিবিহীন পরিচালক) নেই, জার্নাল বন্ধ, এবং কার্যকর শিক্ষাদান ব্যাহত হচ্ছে। করদাতাদের অর্থে চলা এমন প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা কঠোর অডিটের আওতায় আনতে হবে এবং প্রয়োজনবোধে পুনর্গঠন বা বন্ধ করতে হবে।
নিম্নোক্ত সারণিতে বিভিন্ন শিখন-শেখানো পদ্ধতির কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মতামত উপস্থাপন করা হলো:
| শিখন পদ্ধতি | দৃঢ়ভাবে সম্মত | মাঝারিভাবে সম্মত | নিরপেক্ষ | মাঠারিভাবে অসম্মত | দৃঢ়ভাবে অসম্মত |
| আইসিটি ব্যবহারের মাধ্যমে উদ্ভাবন | ১৫% | ৩১% | ২১% | ২৪% | ৯% |
| আধুনিক শ্রেণীকক্ষে অংশগ্রহণমূলক শিখন | ৯% | ২৮% | ২৭% | ২১% | ১৫% |
| মুখস্থের চেয়ে ধারণা তৈরি প্রাধান্য | ১৪% | ২২% | ৩১% | ২২% | ১১% |
| কেস স্টাডি, উপস্থাপনা, গ্রুপ স্টাডি | ১৯% | ৩৮% | ১৯% | ১৫% | ৯% |
| সমস্যা-ভিত্তিক শিক্ষা (PBL) | ১৪% | ১৪% | ২৩% | ৩১% | ১৮% |
| কম্পিউটার-সহায়িত নির্দেশনা | ১৬% | ২৫% | ৩৬% | ১৫% | ৮% |
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতকে বিশ্বমানের করতে হলে শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা সংস্কৃতি, পাঠ্যক্রম ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। পিএইচডি বাধ্যতামূলককরণ তার কেন্দ্রে থাকবে। একই সাথে, শিক্ষকদের মধ্যে অনৈক্য, গীবত ও রাজনীতি বন্ধ করে একটি সুস্থ ও জ্ঞানসন্ধানী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রস্তাবিত রূপান্তর কৌশল বাস্তবায়নে 'উপর থেকে নিচে' ও 'নিচে থেকে উপর'—উভয় পদ্ধতির সমন্বয় জরুরি। কেবলমাত্র একটি দক্ষ, নীতিবান ও গবেষণা-সক্ষম শিক্ষকসমাজই বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে নিয়ে যেতে পারে।বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়ার জন্য শুধু প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা নয়, একটি গভীর প্রতিশ্রুতি ও দার্শনিক-আদর্শগত ভিত প্রয়োজন। এই প্রতিশ্রুতি শুধু পাঠদানের প্রযুক্তিগত দিক নয়, বরং শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার একটি পিতৃমাতৃসুলভ দায়িত্ববোধও বোঝায়। শিক্ষককে হতে হবে সহানুভূতিশীল, নিবেদিত এবং দায়িত্ববোধে সম্পূর্ণ, যাতে তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু জ্ঞানই না দেন, তাদের চরিত্র ও মূল্যবোধও গড়ে তুলতে পারেন।
উপরোক্ত আদর্শিক চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (BAC)-এর কঠোর নীতিমালা প্রয়োজন:
পিএইচডি বাধ্যতামূলককরণ: বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো স্তরে (লেকচারার বা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে) শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি আবশ্যক হওয়া উচিত। এটি নিশ্চিত করবে যে শিক্ষক গভীর গবেষণা ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের অধিকারী।
প্রফেসর পদে পদোন্নতির মানদণ্ড: বাংলাদেশে প্রফেসর (যা যুক্তরাজ্য ও কমনওয়েলথ ব্যবস্থার সর্বোচ্চ শিক্ষাক্রমিক পদ) হওয়ার জন্য শুধু বছরের অভিজ্ঞতা নয়, গুণগত মানও প্রয়োজন। শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা।আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশনা, পিয়ার-রিভিউড জার্নালে20 article DOI no. related and indexedপ্রকাশিত হতে হবে।প্রকাশিত নিবন্ধগুলোর ডিজিটাল অবজেক্ট আইডেন্টিফায়ার (DOI) থাকা বাধ্যতামূলক, যা তাদের গুণমান ও আন্তর্জাতিক প্রবেশযোগ্যতা নিশ্চিত করে।কেমব্রিজ ডিকশনারি ও বিশ্বব্যাপী একাডেমিক প্রথা অনুযায়ী:
লেকচারার (যুক্তরাজ্য ও কমনওয়েলথ প্রথা): এটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক একাডেমিক পদ। একজন লেকচারার শিক্ষাদান, গবেষণা ও পরীক্ষা নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এই পদটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদের সমতুল্য।অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর (যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রথা): এটি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে টেনিউর-ট্র্যাক (স্থায়ী হওয়ার পথ) এর প্রারম্ভিক পদ। তাদের মূল দায়িত্বে কোর্স উন্নয়ন, শিক্ষাদান, ছাত্র উপদেশদান এবং গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশ করা অন্তর্ভুক্ত।বাংলাদেশের বাস্তবতা: ইউজিসির রিপোর্ট অনুসারে, বাংলাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মাত্র ৬,৪০০ জন শিক্ষকের পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে। এটি একটি উদ্বেগজনক সংখ্যা, যা দেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাই, পিএইচডি বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি বিদ্যমান শিক্ষকদের জন্য পিএইচডি অর্জনের সুযোগ ও প্রণোদনা তৈরি করা জরুরি।স্থানীয়ভাবে স্কোপাস ইন্ডেক্সড জার্নাল প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব- বিআইডিএস, পরিকল্পনা একাডেমি, আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্থানীয়ভাবে স্কোপাস ইন্ডেক্সড জার্নাল চালু করে, তাহলে এর বহুমুখী সুবিধা হবে:বিদেশি মুদ্রার সাশ্রয়: গবেষকদের বিদেশি জার্নালে প্রকাশনার জন্য বিপুল পরিমাণ ফিস/চার্জ প্রদান করতে হয়। স্থানীয় স্কোপাস জার্নাল সেই চাপ কমাবে।স্থানীয় গবেষণার দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি: বাংলাদেশের সমস্যা ও গবেষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সহজে উপস্থাপিত হবে।গবেষণা সংস্কৃতি জোরদারকরণ: দেশীয় গবেষকদের জন্য উচ্চমানের প্রকাশনার সহজলভ্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে।তবে এটি করতে গেলে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের পিয়ার রিভিউ সিস্টেম, সম্পাদকীয় বোর্ডে বৈশ্বিক বিশেষজ্ঞ, এবং প্রকাশনা নীতিমালার কঠোর অনুসরণ।ইউজিসির নীতিমালায় এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিকে নিয়োগের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ওজন না দেওয়া সত্যিই বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক। বর্তমান প্রথায়:এমএ পাস করা শিক্ষার্থী পরের দিনই একই স্তরের ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব পাচ্ছেন।গবেষণা ডিগ্রিধারী (এমফিল/পিএইচডি) প্রার্থীদের যোগ্যতা উপেক্ষিত হচ্ছে।এটি একটি মৌলিক ত্রুটি কারণ:উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রি একজন ব্যক্তিকে গভীর জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও গবেষণা দক্ষতা দেয়।যে ব্যক্তি নিজে গবেষণা করেননি, তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের গবেষণা পদ্ধতি শিখাবেন?স্নাতকোত্তর ক্লাসে স্নাতকোত্তর পাস শিক্ষক—এটি একধরনের পদার্থবিদ্যার ছাত্রকে পদার্থবিদ্যা পড়ানোর মত অবস্থা।নীতিমালায় অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে: শিক্ষক নিয়োগে পিএইচডি/এমফিলকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত এবং স্নাতকোত্তর ক্লাসের জন্য ন্যূনতম পিএইচডি বা এমফিল বাধ্যতামূলক করা উচিত।যুক্তরাষ্ট্রের টেনিউর সিস্টেম (যেখানে টেনিউর প্রাপ্ত প্রফেসর আমৃত্যু বা স্বেচ্ছা অবসর পর্যন্ত পদে থাকতে পারেন) বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে সতর্কতার সাথে:শিক্ষকদের শিক্ষণ ও গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি তৈরি হয়।অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়।স্থিতিশীলতা ও জ্ঞান সঞ্চয় বৃদ্ধি পায়।সতর্কতা:টেনিউর পদ্ধতির আগে কঠোর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া প্রয়োজন।নিয়মিত পারফরম্যান্স রিভিউ বজায় রাখতে হবে।দক্ষতা হ্রাস রোধে ব্যবস্থা থাকতে হবে।বর্তমান বাংলাদেশে অবসর বয়স ৬৫। টেনিউর বা জীবনভিত্তিক পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজন:বিদেশমানের প্রকাশনা ও গবেষণা রেকর্ড:শিক্ষাদানে অসাধারণ অবদান -জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি
নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের কাছে উচ্চশিক্ষা সংস্কারের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ আশা করা যায়:
ইউজিসি নীতিমালা সংশোধন: শিক্ষক নিয়োগে পিএইচডি/এমফিলকে বাধ্যতামূলক করা উচিত।
গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন: স্কোপাস-ইন্ডেক্সড জার্নাল প্রতিষ্ঠায় বিশেষ বরাদ্দ ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন।
টেনিউর ও জীবনভিত্তিক অধ্যাপক পদ চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই: পাইলট প্রকল্প শুরু করতে হবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত নিশ্চিতকরণ: ১:১৫ অনুপাত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (BAC)-এর ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি: এর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, উচ্চমানের প্রকাশনা প্ল্যাটফর্ম, এবং শিক্ষকদের জন্য প্রণোদনামূলক ক্যারিয়ার কাঠামো—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর জোর দিতে হবে। ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার এই রূপান্তর সম্ভব করবে। এর ফলে দেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত হবে।দুর্নীতিগ্রস্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া ইউজিসি কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ বা merger করা উচিত নয়।কুমিল্লার বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা এমসিএ এবং এমবিএ করেছেন, তারা অনেক কিছু শিখলেও কোনও সার্টিফিকেট না পাওয়ার কারণে তাদের ডিগ্রি ব্যবহার করতে পারছেন না। সরকারের উচিত ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া পুনর্গঠনের মাধ্যমে কুমিল্লার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইউজিসির অধীনে তাদের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে উদ্যোগ নেওয়া।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা একটি মহান পেশা, যার মূল ভিত্তি জ্ঞান সৃষ্টি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠন। এই গুরুদায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য শিক্ষককে হতে হবে:
ইউজিসি ও BAC-এর উচিত এই মানদণ্ডগুলোকে নীতিমালা হিসেবে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। কেবল তখনই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত বিশ্বমানে পরিণত হবে এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।UGC এবং BAC-এর উচিত পোস্ট ডক্টরেট ডিগ্রীকে স্বীকৃতি দেওয়া।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। উদ্যোক্তা বাংলাদেশের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)