সবুর হাওলাদার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই হাজার ৫৬৮ প্রার্থীর (মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার হিসাবে) মধ্যে নারী প্রার্থী ১০৯ জন, অর্থাৎ ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ নারী ছিলেন। যে ১০৯ জন নারী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে ৭২ জনকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। বাকি ৩৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল শুক্রবারও চলছে ভোট গণনার কাজ। এবারের নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৯৫টি আসনের বেসরকারি ফলাফল পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত সাতজন নারী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন বলে খবর এসেছে। আমাদের প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবার নির্বাচনে সবশেষ মোট নারী প্রার্থীর ছিল ৮৫জন। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭ জন বিজয়ী হয়েছেন। বিজয়ী নারী প্রার্থীরা হলেন-মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খান রিতা, ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর লুনা, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ, ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ কামাল, নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন পুতুল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।
মানিকগঞ্জ-৩ (সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ পৌর ও জেলা সদরের ৮ ইউনিয়ন) আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাইদ নূর (রিকশা) পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট।
ঝালকাঠি-২ (ঝালকাঠি সদর-নলছিটি) আসনের ১৪৭ কেন্দ্রে পোস্টাল ভোটসহ বিএনপি জোটের প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী এস এম নেয়ামুল করিম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৮০৫ ভোট।
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনে ৭৯ হাজার ৩২১ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন ‘গুম’ হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর (লুনা)। ধানের শীষের প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় ঐক্য জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৬৩৫ ভোট। সিলেট জেলার ছয়টি আসনের ৩৩ প্রার্থীর মধ্যে তাহসিনা রুশদীর একমাত্র নারী।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা (হাঁস প্রতীক) বড় ব্যবধানে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৫ ভোট। তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ের জুনায়েদ আল হাবিবের চেয়ে ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোট বেশি পেয়েছেন।
এ ছাড়া নাটোর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ফারজানা শারমিন, ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং ফরিদপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী নায়াব ইউসুফ আহমেদ বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ১৭। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনের পর নির্বাচন কমিশন যে তালিকা দিয়েছে, সেই তালিকা অনুসারে, নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৪। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ। দলের হয়ে প্রার্থী হয়েছেন ৬৬ জন নারী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ১৯ জন। এর বাইরে ১ জন প্রার্থী হিজড়া জনগোষ্ঠীর। এর মধ্যে বিএনপি থেকে ছয়জন নারী প্রার্থী বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাচ্ছেন। এছাড়া একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।
নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া নারী প্রার্থীদের হলফনামা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, নারী প্রার্থীদের ৬৪ জনই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। ২৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৩২। পেশাগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী কর্মজীবী।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনের ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩। এর মধ্যে পুরুষ ও নারী ভোটারের সংখ্যা যথাক্রমে ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ ও ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ১ হাজার ২৩৪ জন। প্রায় সমানসংখ্যক ভোটার হলেও প্রার্থিতায় বৈষম্যের শিকার নারীরা।
রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী, দলীয় পদে নির্দিষ্ট হারে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা থাকলেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে কিছু বলা নেই। তবে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর ধারা ২২(খ)-(ঘ) অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এবারের সংসদীয় নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করার কথা বলে হয়েছে। আর পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। অথচ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জোরালো দাবি জানানো দলগুলোর নারী প্রার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে কম।
৩০০ আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত নারী প্রার্থী : এবার ৩০০ আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত নারী প্রার্থীদের মধ্যে আছেন বিএনপি থেকে নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমীন, ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, শেরপুর-১ আসনে সানসিলা জেবরিন, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খানম, ঢাকা-১৪ আসনে সানজিদা ইসলাম, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম, ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ আহমেদ, মাদারীপুর-১ আসনে নাদিরা আক্তার, সিলেট-২ আসনে মোছা. তাহসিনা রুশদীর।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে আছেন ঝালকাঠি-১ আসনে মাহমুদা আলম মিতু, ঢাকা-১৯ আসনে দিলশানা পারুল, ঢাকা-২০ আসনে নাবিলা তাসনিদ।
জাতীয় পার্টি থেকে প্রার্থী করা হয়েছে ঠাকুরগাঁও-২ আসনে নুরুন নাহার বেগম, ঝিনাইদহ-১ আসনে মনিকা আলম, ঢাকা-১০ আসনে বহ্নি ব্যাপারী, নরসিংদী-৫ আসনে মেহেরুন নেছা খান হেনা, খাগড়াছড়ি আসনে মিথিলা রোয়াজাকে। গণ অধিকার পরিষদ থেকে আছেন সিরাজগঞ্জ-১ আসনে মোছা. মল্লিকা খাতুন, ঢাকা-৮ আসনে মেঘনা আলম, নরসিংদী-১ আসনে শিরিন আক্তার।
গণসংহতি আন্দোলন থেকে নাটোর-২ আসনে তাহামিদা ইসলাম তানিয়া, ঢাকা-১২ আসনে তাসলিমা আখতার, ঢাকা-১৮ আসনে বিলকিস নাসিমা রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে নাহিদা জাহানকে প্রার্থী করা হয়েছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) থেকে নেত্রকোনা-৪ আসনে আছেন জলি তালুকদার। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নারী প্রার্থীরা হলেন মাগুরা-১ আসনে শম্পা বসু, বরিশাল-৫ আসনে মনীষা চক্রবর্তী।
বাসদ-মার্ক্সবাদী থেকে গাইবান্ধা-৫ আসনে মোছা. রাহেলা খাতুন, রংপুর-৪ আসনে প্রগতি বর্মণ তমা, জয়পুরহাট-১ আসনে তৌফিকা দেওয়ান, ঢাকা-৫ আসনে শাহিনুর আক্তার সুমি, ঢাকা-৭ আসনে সীমা দত্ত, গাজীপুর-১ আসনে তাসলিমা আক্তার, মৌলভীবাজার-২ আসনে সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১০ আসনে আসমা আক্তার, চট্টগ্রাম-১১ আসনে দীপা মজুমদারকে প্রার্থী করা হয়েছে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির নারী প্রার্থীরা হলেন সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে ইলোরা খাতুন, ঢাকা-৭ আসনে শাহানা সেলিম, ফরিদপুর-৩ আসনে আরিফা আক্তার বেবী, কুমিল্লা-৫ আসনে শিরিন আক্তার, নোয়াখালী-১ আসনে রেহানা বেগম, লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে তানিয়া রব।
ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে রোকেয়া আক্তার, ঢাকা-১২ আসনে মোছা. সালমা আক্তার, ঢাকা-১৩ আসনে ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, গাজীপুর-২ আসনে সরকার তাসলিমা আফরোজ, নরসিংদী-৫ আসনে তাহমিনা আক্তার, চট্টগ্রাম-১০ আসনে সাবিনা খাতুনকে প্রার্থী করা হয়েছে। গণফোরামের নারী প্রার্থীরা হলেন ঝিনাইদহ-৪ আসনে খনিয়া খানম ও ঢাকা-৯ আসনে নাজমা আক্তার।
এ ছাড়া নাগরিক ঐক্য থেকে পাবনা-৪ আসনে শাহনাজ হক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে রাঙ্গামাটি আসনে জুঁই চাকমা, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি) থেকে কুষ্টিয়া-৩ আসনে মোছা. রুমপা খাতুন, জাতীয় পার্টি-জেপি থেকে ঝিনাইদহ-১ আসনে মনিকা আলম, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি থেকে ঢাকা-১০ আসনে নাসরীন সুলতানা, আম জনতার দল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে শরিফা আক্তার, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে আয়েশা আক্তার, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) থেকে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে মোছা. শেফালী বেগম এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ থেকে দিনাজপুর-৩ আসনে লায়লা তুল রীমাকে প্রার্থী করা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন রংপুর-৩ আসনে মোছা. আনোয়ারা ইসলাম রানী, নাটোর-২ আসনে সাবিনা ইয়াসমিন, জামালপুর-৪ আসনে মেহেরজান আরা তালুকদার, ময়মনসিংহ-৬ আসনে আখতার সুলতানা, নেত্রকোনা-৪ আসনে তাহমিনা জামান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা ও নোয়াখালী-৫ আসনে হাসনা জসীমউদদীন মওদুদ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)