গ্যাস কোম্পানির ভেতরেও যোগসাজশের গন্ধ
বিশেষ প্রতিনিধি : গ্যাসের চাপ (প্রেসার) সংক্রান্ত কৌশলী কারসাজির মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানিকে প্রায় ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে শিল্পগোষ্ঠী টিকে গ্রুপ–এর একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামের বাহির সিগন্যাল এলাকায় অবস্থিত সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেড দীর্ঘ ছয় বছর ধরে গ্যাস বিল জালিয়াতির মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
কর্নফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) বিষয়টি শনাক্ত করার পর সামুদা কেমিক্যালকে বকেয়া এরিয়ার বিল হিসেবে ১৩.৭২ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয়। একই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কেজিডিসিএলের বিক্রয় উত্তর–১ বিভাগের ব্যবস্থাপক আব্দুল বাতিনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যদিও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে গ্যাস কোম্পানির অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিয়ে।
প্রেসার ফ্যাক্টর জালিয়াতি-হিসাবের ফাঁকেই কোটি কোটি টাকা: গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী–২০১৪ অনুযায়ী, চুক্তি অনুযায়ী ২ বার (২৯ পিএসআইজি) চাপের গ্যাস সরবরাহ হলে তার জন্য নির্ধারিত প্রেসার ফ্যাক্টর বা চাপ শুদ্ধিগুণক হবে ২.৯৬৯। এই নিয়ম অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকেই গ্যাস বিল প্রস্তুত হওয়ার কথা।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের ২২ জুলাই ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির সময় কৌশলে প্রেসার ফ্যাক্টর ২.৯৬৯-এর বদলে ২.৬২৯ দেখানো হয়। ফলে প্রকৃত গ্যাস ব্যবহারের তুলনায় কম বিল তৈরি হতে থাকে। বাস্তবে যেখানে গ্যাসের প্রকৃত চাপ ছিল ২.৯৬৯ পিএসআইজি, সেখানে নথিতে তা কমিয়ে দেখানো হয়।
এই কারসাজির ফলে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা করে কম বিল পরিশোধ করেছে সামুদা কেমিক্যাল। ছয় বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকায়।
কেজিডিসিএলের চিঠি ও বকেয়া আদায়ের নির্দেশ: কর্নফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির বিক্রয় উত্তর–১ বিভাগ থেকে ইস্যু করা চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিদ্যমান চুক্তি ও গ্যাস বিপণন নিয়ম অনুযায়ী সঠিক প্রেসার ফ্যাক্টর ২.৯৬৯ ধরে পুনঃহিসাব করলে উল্লিখিত অর্থ আদায়যোগ্য।
চিঠিতে সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেডকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে অথবা কেজিডিসিএলের রাজস্ব শাখায় উক্ত অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ওই অর্থ জমা পড়েনি।
ব্যবস্থাপক বদলি, কিন্তু দায় কি এড়ানো হলো?
এতো বড় আর্থিক ক্ষতির ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যবস্থাপক আব্দুল বাতিনকে কেবল অন্যত্র বদলি করা হয়েছে—যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট মহল। অভিযোগ উঠেছে, গ্যাস কোম্পানির অভ্যন্তরে যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের জালিয়াতি বছরের পর বছর চলতে পারে না।
এ ঘটনায় জড়িত অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা তদন্ত করা এবং আব্দুল বাতিনের অধীনে থাকা অন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর গ্যাস চাপ ও বিলিং যাচাই করার জোর দাবি উঠেছে।
এমডির বক্তব্য- বিইআরসিতে মামলা, কারণ দর্শানোর নোটিশ: কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ সালাউদ্দিন বলেন,
“এখনও তারা এরিয়ার বিল জমা দেয়নি। সম্ভবত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) এ সংক্রান্ত একটি মামলা চলমান।”
তিনি আরও জানান, “বিইআরসির নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ইস্যু করা হয়েছে।”
টিকে গ্রুপের বিরুদ্ধে আগেও জ্বালানি জালিয়াতির অভিযোগ: এটি টিকে গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্নফুলী স্টিল মিলস লিমিটেড–এর ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সংযোগ নিয়েও গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রয়োজনীয় এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) না থাকলেও অন্ধকার পথে গ্যাস সংযোগ আদায় করে নেয় টিকে গ্রুপ। এমনকি ফৌজদারহাট বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া চিঠির মাধ্যমে গ্যাস সংযোগ অনুমোদন দেওয়া হয়।
২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত কেজিডিসিএলের ১৬৯তম বোর্ডসভায় টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্নফুলী স্টিল মিলস লিমিটেডের ১৬.৮ মেগাওয়াট ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সংযোগের প্রস্তাব অনুমোদন পায়—যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে।
সাবেক এমডির বিস্ফোরক অভিযোগ: কেজিডিসিএলের একজন সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমার সময়ে টিকে গ্রুপের অনেক ভুয়া কাগজ আমি ধরেছিলাম। তাদের নথিপত্র আরও গভীরভাবে যাচাই করলে আরও অনেক জালিয়াতি বেরিয়ে আসবে।” তিনি আরও দাবি করেন, “আগের সরকারের সময়ে তারা জ্বালানি উপদেষ্টার (তৌফিক ই-ইলাহী চৌধুরী) দপ্তর থেকে বিভিন্ন বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করত।”
টিকে গ্রুপের নীরবতা : এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য টিকে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মাদ মোস্তফা হায়দারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বিষয়টি জানিয়ে পাঠানো এসএমএসেরও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন থেকেই যায়, গ্যাসের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে বছরের পর বছর ধরে চলা এই জালিয়াতি কি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের কারসাজি, নাকি এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী একটি চক্র? ১৩.৭২ কোটি টাকার এই ক্ষতির দায় কেবল একটি বদলিতে শেষ হবে, নাকি প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে—সেদিকেই তাকিয়ে আছে দেশবাসী, মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)