
এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সে ‘এজেন্ট-ব্যবসা’কে আড়াল করে টাকার খেলা
প্রিমিয়াম বকেয়া-গাড়ি বিক্রিতেও অনিয়মের গন্ধ
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ ডেস্ক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডে এজেন্ট কমিশন, প্রিমিয়াম বকেয়া আর কোম্পানির গাড়ি বিক্রিকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এজেন্টদের অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা কমিশন জমা হলেও তা তাদের আয় হিসেবে আয়কর নথিতে প্রদর্শন করা হয় না—এমন তথ্য উঠে এসেছে এজেন্ট ও কোম্পানির কর্মকর্তাদের নিজস্ব স্বীকারোক্তিতেই। একই সঙ্গে বাজারদামের চেয়ে নামমাত্র মূল্যে কোম্পানির গাড়ি বিক্রি আর চেয়ারম্যান–পরিচালক ও কর্মকর্তাদের কাছে প্রায় ১৯ কোটি টাকার প্রিমিয়াম বকেয়া রেখে কোম্পানির তহবিল সুরক্ষার বদলে তা ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এইসব আর্থিক লেনদেন কেবল ‘ব্যবসা সংগ্রহের কৌশল’, নাকি উদ্দেশ্যমূলক অর্থ গোপন ও টাকা সরানোর পথ। ৩২ এজেন্টকে ৭ কোটি ৩৩ লাখ, গড়ে ২৩ লাখ করেÑ কিন্তু আয় কোথায়?
২০২২ সালে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স এজেন্ট কমিশন বাবদ পরিশোধ করেছে ৭ কোটি ৩৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। এই টাকা পেয়েছেন ৩২ জন এজেন্ট, তাদের মধ্যে ২২ জনই নারী, সরল হিসেবে দাঁড়ায়-গড়ে একজন এজেন্টের বার্ষিক কমিশন আয় প্রায় ২২ লাখ ৯২ হাজার টাকা। মাসিক হিসেবে যা প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এত বড় অঙ্কের আয়ের কথা সাধারণ কোনো চাকরিজীবীর বেতন হলে তা কর ফাইলে বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শনের কথা। কিন্তু এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের একাধিক এজেন্ট ও সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই স্বীকার করছেন—এই কমিশনকে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত আয় হিসেবে দেখান না। তাদের দাবি, এজেন্ট কমিশনের এই টাকা গ্রাহকদের দিয়ে দেয়া হয় “ব্যবসা সংগ্রহের প্রয়োজনে”। ফলে এটি তাদের আয় নয়, কাজেই আয়কর নথিতে দেখানোরও প্রয়োজন নেই।
অর্থাৎ ব্যাংক একাউন্টে কোটি টাকার কমিশন আসছে, কিন্তু কাগজে-কলমে আয় হিসেবে তা কারও নয়।
https://www.uddoktabangladesh.com/2025/12/09/6965/
নারায়ণগঞ্জে ‘একমাত্র এজেন্ট’ নার্গিস, কাজ করেন স্বামী এডিশনাল এমডি: এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের নারায়ণগঞ্জ ব্রাঞ্চের এজেন্ট তালিকায় আছে একটিই নাম-নার্গিস আখতার। কিন্তু তার মোবাইল নম্বরে কল করলে ফোন ধরেন কবির খন্দকার। পরিচয়, নার্গিস আখতারের স্বামী, এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের নারায়ণগঞ্জ ব্রাঞ্চের ইনচার্জ। কোম্পানির অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এএমডি) কবির খন্দকারের কথায় উঠে আসে আরও চমকপ্রদ তথ্য, নার্গিস আখতারের নামে এজেন্ট লাইসেন্স নিয়েছেন তিনি নিজেই, প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স নবায়ন—সবই নার্গিসের নামে। কিন্তু কোনো পলিসি বিক্রি করেন না নার্গিস, সব ব্যবসা সংগ্রহ করেন কবির খন্দকার ও উন্নয়ন কর্মকর্তারা। ব্রাঞ্চের সব পলিসির কমিশন জমা হয় নার্গিস আখতারের ব্যাংক একাউন্টে। সেখান থেকে “প্রয়োজন অনুযায়ী” টাকা তুলে গ্রাহকদের দেয়া হয় বলে দাবি। ৭৭ লাখ কমিশন, মাসে গড়ে সাড়ে ৬ লাখ, কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে নার্গিস আখতারের নামে এজেন্ট কমিশন প্রদান করা হয়েছে ৭৭ লাখ ৮৯ হাজার ৫৪ টাকা। অর্থাৎ মাসিক গড়ে কমিশন প্রায় ৬ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। কবির খন্দকার নিজেই স্বীকার করেছেন-“এই টাকা নার্গিসের ব্যক্তিগত আয় না। ব্যবসা সংগ্রহের জন্য গ্রাহকদের দিয়ে দিতে হয়। তাই আয় হিসেবে কোথাও দেখানো হয় না।” অর্থাৎ নার্গিসের নামে ব্যাংক একাউন্ট, লাইসেন্স, কমিশনÑসবই আনুষ্ঠানিকভাবে তার; কিন্তু ব্যবসা, টাকা তোলা, ব্যবহারÑসব নিয়ন্ত্রণ করেন স্বামী ও কোম্পানির কর্মকর্তারা।
এখানে অন্তত তিনটি গুরুতর প্রশ্ন দাঁড়ায়-১. এজেন্ট লাইসেন্সধারী কাজ করছেন না, বরং তার নামে পরিবারের অন্য সদস্য কোম্পানির ব্রাঞ্চ-ইনচার্জ ও এএমডি হিসেবে কমিশন নিয়ন্ত্রণ করছেন-এটা কি আইনসম্মত? ২. এভাবে ব্যাংক একাউন্টকে কেবল টাকা চলাচলের ‘চ্যানেল’ হিসেবে ব্যবহার করে কোটি টাকার অর্থপ্রবাহকে আয় থেকে আড়াল করে রাখা কি আয়কর আইন, অর্থপাচার আইন কিংবা বীমা আইন লঙ্ঘন নয়? ৩. নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ কি এসব তথ্য জানার পরও কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে?
ব্রাঞ্চ ইনচার্জের স্ত্রীই এজেন্ট: ‘পারিবারিক এজেন্ট নেটওয়ার্ক’: কবির খন্দকার দাবি করেছেন, “এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের প্রায় সব ব্রাঞ্চেই একজন করে এজেন্ট আছে, আর তিনি ওই ব্রাঞ্চ ইনচার্জের স্ত্রী বা নিকটাত্মীয়।” এভাবে এজেন্টদের মূল পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে-
নামমাত্র লাইসেন্সধারী, ব্রাঞ্চ ইনচার্জ বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার স্ত্রী/আত্মীয়, কমিশনের টাকা তাদের নামে আসে, নিয়ন্ত্রণ করেন অন্যজন যেখানে বীমা আইন বলছে, নির্দিষ্ট নিয়মে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্টই ব্যবসা সংগ্রহ ও কমিশন গ্রহণে অনুমোদিত, সেখানে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সে এজেন্টের নামের আড়ালে ‘আত্মীয়স্বজনের ব্যাংক একাউন্টকে টাকা আদান-প্রদানের মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। কাওরান বাজার ব্রাঞ্চ এজেন্ট স্ত্রী, ফোন ধরেন ইনচার্জ স্বামী। কাওরান বাজার ব্রাঞ্চের এজেন্ট তালিকায় নাম রয়েছে একজনের-শরীফুন-নেসা। তালিকার নম্বরে কল দিলে নম্বর বন্ধ। কিন্তু কোম্পানির ওয়েবসাইটে ব্রাঞ্চের যোগাযোগের নম্বরে ফোন করলে ধরেন কবির উজ-জামান। পরিচয়-এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের কাওরান বাজার ব্রাঞ্চ ইনচার্জ, প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ব্রাঞ্চে একজনই এজেন্ট, শরীফুন-নেসা, আর তিনি শরীফুন-নেসার স্বামী। অর্থাৎ এখানে একই প্যাটার্ন- ব্রাঞ্চ ইনচার্জ স্বামী, নামমাত্র এজেন্ট স্ত্রী, কমিশনের অর্থপ্রবাহ সেই পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। সর্বোচ্চ কমিশনধারী এজেন্ট, কিন্তু মোবাইল ব্যবহার করেন সিইও! এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের কাকরাইল ব্রাঞ্চে এজেন্ট দুইজন-১) অনিন্দ জামান লস্কর ২০২২ সালে কমিশন পেয়েছেন ২৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা
২) মো. জহির উদ্দিন লস্কর- সর্বোচ্চ কমিশনধারী, তার নামে এজেন্ট কমিশন ১ কোটি ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। যা ২০২২ সালের মোট এজেন্ট কমিশনের ১৩.৮৬% এজেন্ট তালিকায় থাকা জহির উদ্দিন লস্করের মোবাইল নম্বরে কল করলে ফোন ধরে কোম্পানির বর্তমান মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বদিউজ্জামান লস্কর। প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এটি আমার মোবাইল নম্বর।”
জহির উদ্দিন লস্করের নামে ব্যাংক একাউন্টে তিনি ম্যানডেটেড বা ক্ষমতা প্রাপ্ত। তাই এজেন্টের নামে ওই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর আর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি তিনি। এখানে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর-একজন এজেন্টের নামে এক বছরে এক কোটি টাকার বেশি কমিশন, সেই এজেন্টের যে নম্বর দেওয়া, তা ব্যবহার করছেন কোম্পানির চলতি মুখ্য নির্বাহী, সিইও নিজে এক এজেন্টের ব্যাংক একাউন্টের উপর “ম্যানডেটেড” এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, এজেন্ট কমিশন আসলে এজেন্টের? নাকি এটি শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বা পরিচালকদের টাকার প্রবাহ গোপন রাখার একটি কাঠামো?
এজেন্ট কমিশন, বীমা আইন ও আয়কর আইন কী বলছে : বীমা আইন ২০১০ (ধারা ৫৮(১))। এখানে স্পষ্ট বলা আছে, বাংলাদেশে বীমা ব্যবসা সংগ্রহের জন্য এজেন্ট, এজেন্ট নিয়োগকারী বা ব্রোকার ব্যতীত অন্য কাউকে কমিশন বা অন্য কোন নামে পারিশ্রমিক দেয়া যাবে না, বা এই মর্মে কোনো চুক্তিও করা যাবে না। অর্থাৎ ব্রাঞ্চ ইনচার্জ, সিইও, কর্মকর্তা কারও পক্ষে এজেন্টের নামে কমিশন নিয়ে “নিজে নিয়ন্ত্রণ করা” আইনসিদ্ধ নয়। এজেন্ট লাইসেন্স-ধারী ছাড়া অন্য কেউ ব্যবসা সংগ্রহ করলে এবং কমিশনের টাকা গোপনে পরিচালনা করলে তা সরাসরি আইনভঙ্গের শামিল, বিভ্রান্তিকর বিবরণীতে প্রলুব্ধ করে বীমা বিক্রি ধারা ১৩৩। ধারা ১৩৩ অনুযায়ী-
কেউ যদি মিথ্যা/ভুয়া/প্রতারণামূলক বিবরণী দিয়ে বীমা চুক্তি করাতে প্রলুব্ধ করে। সে অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা, ৩ বছরের জেল বা উভয় দণ্ড হতে পারে। এজেন্টের নামে ব্যবসা, কিন্তু কাজ করেন ব্রাঞ্চ ইনচার্জ–সিইওসহ অন্যরা এ ধরনের কাঠামোকে অনেকে ‘লুকানো কমিশন ব্যবস্থা’ হিসেবে দেখছেন, যেখানে গ্রাহককে কী ধরনের সুবিধা দেখিয়ে টাকা দেয়া-নেওয়া হচ্ছে-সেটাও তদন্তসাপেক্ষ। আয়কর আইন ২০২৩ (ধারা ২৭২(১))। ধারাটি বলছে, কেউ যদি আয়ের তথ্য, সম্পদ, দায়, ব্যয় বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অসত্যভাবে প্রদর্শন করে কর ফাঁকি দেয়, ধরা পড়লে তার ওপর ফাঁকি দেয়া অঙ্কের নির্দিষ্ট অংশ (১৫% + ১০% দ্ধ বছর) হিসাব করে ভারী অর্থদণ্ড আরোপের বিধান আছে। এখানে, এজেন্টের ব্যাংক একাউন্টে বছরে ৫০–১ কোটি টাকার কমিশন,
কিন্তু “এটা আমাদের আয় নয়, গ্রাহকদের দিয়ে দিই”এই অজুহাতে কর ফাইলে তা না দেখানো, কর আইনের ভাষায় সরাসরি আয় গোপন বা ফাঁকির অভিযোগ তৈরি করে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এত বড় অঙ্কের অর্থপ্রবাহকে “আয় নয়, গ্রাহককে দেয়া টাকা” বলে দেখানো মানে হচ্ছে, প্রকৃত আয়, উৎস ও ব্যবহারÑসবকিছুকে জটিল করে মানিলন্ডারিংয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা। তারা মনে করেন, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (ইঋওট), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (ঘইজ) ও মানিলন্ডারিং বিরোধী সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
১২ লাখ টাকার গাড়ি ৩ লাখে বিক্রি : একই কোম্পানিতে গাড়ি বিক্রিতেও দেখা যাচ্ছে ভয়াবহ গরমিল। ২০০৭ মডেলের টয়োটা রাশ বিক্রি মাত্র ৩ লাখে। এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের ২০০৭ মডেলের একটি টয়োটা রাশ গাড়ি, বাজারমূল্য প্রায় ১২ লাখ টাকা। বিক্রি করা হয়েছে মাত্র ৩ লাখ টাকায়। বিস্তারিত, রং: সিলভার, রেজিস্ট্রেশন: ২০০৮, ঢাকা মেট্রো ঘ-১১-৯৯৪৬, অনলাইনের গাড়ি বিক্রির প্ল্যাটফর্মে একই মডেলের গাড়ির দাম ১২-১৩ লাখ টাকার মধ্যে উল্লেখ থাকলেও, কোম্পানির এক্সিকিউটিভ কমিটি ২০২৩ সালের ১৫ মে অনুষ্ঠিত ১৯৫তম সভায় এ গাড়িটি ৩ লাখ টাকায় বিক্রির অনুমোদন দেয়। আরও ৩টি গাড়ি নামমাত্র দামে. ওই সভায় আরও অনুমোদন হয়, ২০০৪ মডেলের দুটি টয়োটা এক্স করোলা, বিক্রয় মূল্য: প্রত্যেকটি মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, অথচ অনলাইনে একই মডেলের গাড়ির দাম ৯-১২ লাখ টাকার মধ্যে। সূত্র বলছে, ৩০ মার্চ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। মোট ১২টি দরপত্র জমা পড়ে। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয় মেসার্স টম কারস। কিন্তু প্রশ্নÑএত কম দরপত্রের মধ্যে “সর্বোচ্চ দও ও বাজারদামের এক-চতুর্থাংশের নিচে কেন। গাড়ি বিক্রির নাম করে কি কোম্পানির সম্পদ কমদামে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে? কোম্পানির গাড়ি মানে শেয়ারহোল্ডার ও পলিসিহোল্ডারদের সম্পদ। বাজারদামের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোম্পানিই, মুনাফা পায় অন্য কেউ। খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ-“এ ধরনের গাড়ি বিক্রি অনেক সময় কর্মকর্তা, পরিচালকদের ‘আত্মীয়-ঘনিষ্ঠদের’ সুবিধা দেবার মাধ্যম হয়ে ওঠে। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া আসল চিত্র জানা যাবে না।”
১৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকার প্রিমিয়াম বকেয়া: আইন মানছে কে, বীমা আইনে স্পষ্টÑপ্রিমিয়াম বকেয়া রেখে পলিসি ইস্যু করা অবৈধ, প্রিমিয়ামের টাকা নগদায়ন না হওয়া পর্যন্ত পলিসি সংক্রান্ত কোন ডকুমেন্ট হস্তান্তর করাও আইনবিরোধী, কিন্তু এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের হিসেবে দেখা যাচ্ছেÑ অক্টোবর পর্যন্ত কোম্পানিটিতে প্রিমিয়াম বকেয়া: মোট ১৮ কোটি ৮৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, পরিচালকদের বকেয়া: ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি। প্রিমিয়াম বকেয়ার হিসাব অনুযায়ী শুধু পরিচালকদের বকেয়া-চেয়ারম্যান আমির হামজা সরকার: ৬৭ লাখ ৮২ হাজার ৭৪৮ টাকা। ভাইস চেয়ারম্যান মাজাকাত হারুন ৯১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৪৫ টাকা, পরিচালক আসিফুর রহমান ৭৮ লাখ ১ হাজার ১৩৯ টাকা, পরিচালক লুৎফুল বারী ১ কোটি ২৮ লাখ ৮২ হাজার ২৫৯ টাকা, পরিচালক মাহফুজা ইউনুস ৮৭ হাজার ১৯৭ টাকা, পরিচালক এবিএম কায়সার ৩১ হাজার ১১৮ টাকা, মরিয়ম আখতার ১২ লাখ ৫১ হাজার ৩০১ টাকা, সব মিলিয়ে পরিচালকদের বকেয়া ৩ কোটি ৮০ লাখ ৩১ হাজার ১০৭ টাকা।
আইন অনুসারে পরিচালকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের পলিসিতে নিজের ব্যবসার সর্বোচ্চ ২৫% বীমা করতে পারলেও, বকেয়া রেখে পলিসি ইস্যু করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে-“এই বকেয়া দেখিয়ে কোম্পানির তহবিল থেকে টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না।” ব্রাঞ্চ ও ইউনিটে বকেয়া প্রিমিয়াম: কাগজে সংখ্যা, বাস্তবে ঝুঁকি, ৩২ ব্রাঞ্চে বকেয়া: ৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, মোট বকেয়া ৯ কোটি ৫৫ লাখ ১৭ হাজার ৮৩৭ টাকা। সর্বোচ্চ বকেয়া মতিঝিল ব্রাঞ্চ ১ কোটি ২৭ লাখ ৭১ হাজার ২০৮ টাকা, ইনচার্জ: অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন। প্রগতি সরণি ব্রাঞ্চ: ৮১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫ টাকা, দিলকুশা ব্রাঞ্চ: ৫২ লাখ ২৫ হাজার ১৭৬ টাকা -ইনচার্জ এএমডি সাইদুর রহমান, গুলশান ব্রাঞ্চ: ৪৯ লাখ ৭ হাজার ৬৫৬ টাকা, কাকরাইল ব্রাঞ্চ: ৪৮ লাখ ৭১ হাজার ৩৫৩ টাকা- ইনচার্জ এএমডি বদিউজ্জামান লস্কও, রামপুরা, জুবিলি রোডসহ অনেক ব্রাঞ্চেই বকেয়া ৩০ লাখের আশপাশে, ২২টি ইউনিটে বকেয়া: ২ কোটি ২৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ বকেয়া: ইউনিট-১৭- ৪৫ লাখ ৭ হাজার ১৭১ টাকা (ইনচার্জ ইভিপি শেখ আব্দুল হালিম)। বেশ কয়েকটি ইউনিট আবার পরিচালিত হচ্ছে তথাকথিত “ডামি ইনচার্জ” দিয়ে, যেখানে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এএমডি বদিউজ্জামান লস্করের হাতে বলে অভিযোগ। এই ৬টি ইউনিটের কোড ‘বি.এল’ দিয়ে চিহ্নিত। এই ৬ ইউনিটের মোট বকেয়া: ৪৩ লাখ ৯২ হাজার ৭৪৮ টাকা। ‘অন্যান্য’ নামে ৩ কোটি ২৫ লাখ: সিইওসহ উচ্চ কর্মকর্তাদের বকেয়া। বকেয়া প্রিমিয়ামের হিসাব বিবরণীতে ‘অন্যান্য’ নামে ৪১ জনের বকেয়া- মোট ৩ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ২১৫ টাকা, এই খাতেÑঅতিরিক্ত পরিচালক বদিউজ্জামান লস্কও এর নামে বকেয়া: ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সানজিনা খানর নামে বকেয়া: ৪৭ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৯ টাকা, নামের পাশে উল্লেখ রয়েছে কোম্পানির ডিএমডি নাগিবুর রহমান খানের নাম, আবুল কালামের নামে বকেয়া: ১৬ লাখ ৭৪ হাজার ২১৮ টাকা
পাশে উল্লেখ কোম্পানির এসইভিপি জয়নাল আবেদীনের নাম, বারিধারা ব্রাঞ্চের নাজমুল হাসানের নামে বকেয়া: ২০ লাখ ১৭ হাজার ৭৩৮ টাকা। এই ‘অন্যান্য’ শিরোনামটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জায়গা-বীমা কোম্পানির মূল তহবিল থেকে কাদের সুবিধায়, কীভাবে, কতদিন ধরে প্রিমিয়াম বকেয়ার নামে টাকা আটকে রাখা হয়েছে। কোম্পানি কী বলছে? এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের সাবেক সিইও (চলতি দায়িত্ব) মো. আনোয়ার হোসেন মন্তব্য না করে দায়িত্ব ঠেলে দেন কোম্পানির সেক্রেটারি মো. মহিউদ্দিন খন্দকারর ওপর। মহিউদ্দিন খন্দকারের প্রতিক্রিয়া ছিলÑ“এসব বিষয় আপনার জানার প্রয়োজন কী, তা আমি বুঝতে পারছি না। আইডিআরএ জানতে চাইলে আমরা জবাব দেব।” তিনি দাবি করেন, “আমরা বাকি ব্যবসা করি না।” অনেক সময়ে গ্রাহক চেক দেয়, এক–দুদিনের মধ্যে নগদায়ন হয়। ব্যবসায়িক সম্পর্কের স্বার্থে আগে পলিসি ডকুমেন্টস দেয়া হয়। অর্থাৎ বকেয়া প্রিমিয়ামের পাহাড়কে তিনি দেখাতে চাইছেন ‘ব্যবসায়িক বাস্তবতা’ হিসেবে। কিন্তু কাগজ-কলমের হিসাব দেখাচ্ছে, এ বকেয়া “একÑদুদিনের” নয়, বছরের পর বছর ধরে জমা।
প্রশ্ন এখন নিয়ন্ত্রকের দরজায়: এজেন্ট কমিশন, প্রিমিয়াম বকেয়া আর গাড়ি বিক্রি-তিন দিক থেকেই স্পষ্ট যে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সে আর্থিক শৃঙ্খলা ও আইনের শর্ত মানার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী-স্বার্থ ও সুবিধা আদায়ের কাঠামো।
এখন প্রশ্ন-আইডিআরএ ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা কি কাগজে–কলমে আইন দেখিয়ে দায় সেরে নেবে, নাকি বাস্তব লেনদেন, ব্যাংক একাউন্ট, এজেন্ট-পরিচালক-কর্মকর্তাদের আর্থিক যোগাযোগ সব খুলে দেখে সত্য বের করবে? বীমা আইন, আয়কর আইন ও মানিলন্ডারিংবিরোধী বিধানের আওতায়-এজেন্টদের নামে কোটি টাকার কমিশন, প্রকৃত এজেন্ট না হয়েও ব্যবসা-নিয়ন্ত্রণ, প্রিমিয়াম বকেয়া রেখে পলিসি ইস্যু, বাজারমূল্যের এক-চতুর্থাংশ দামে গাড়ি বিক্রি, সবই এমন অভিযোগ, যা শুধু একটি কোম্পানির ভেতরের গল্প নয়; এটা পুরো বীমা খাতের স্বচ্ছতা, গ্রাহকের টাকার নিরাপত্তা ও পুঁজিবাজারের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয় আইডিআরএ, এনবিআর, বিএফআইইউসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো এই প্রশ্নের জবাব দিতে মাঠে নামে, নাকি কাগজের ফাইলে আরেকটি “পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত স্থগিত” নোটিশই হয়ে থাকে একমাত্র সমাধান।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বদিউজ্জামান লস্করের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপ ফোন ও বার্তা পাঠানো হয়। অবশেষে ফোনে সন্ধান মেলে হাসপাতালে, জানান হাসপাতালে আছি। পরে কথা বলব। পরে অনেক যোগোযোগ করলেও তিনি কথা কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ করেননি। ধারাবাহিক সিরিজ চলবে---
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)