
* কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ
* জরিমানা বকেয়া, পরিচালনা বোর্ডে অস্থিরতা
* অডিটহীন ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিতে গ্রাহকের অর্থ
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, ঢাকা: বিমা খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক স্বার্থ উপেক্ষার চিত্র আবারও সামনে এসেছে। নতুন প্রজন্মের স্বদেশ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ইখতিয়ার উদ্দিন শাহীন–এর বিরুদ্ধে ১ কোটি ২ লাখ ২৭ হাজার ২২২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কোম্পানির আরও তিন কর্মকর্তা এ অভিযোগে দুদকের নজরদারিতে রয়েছেন।
এসভিপির লিখিত অভিযোগ : স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি) মো. আলমগীর শেখ অভিযোগ করেছেন—দীর্ঘ সময় কোম্পানির অভ্যন্তরে দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, ব্যবস্থাপনায় সংকট ও বিমা আইন লঙ্ঘন চলে আসছে। ৮ ডিসেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে তিনি অভিযোগ দাখিল করেন। দুদক, আইডিআরএসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থাকেও অভিযোগের কপি প্রদান করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে—এ অনিয়মের ফলে হাজার হাজার গ্রাহকের সঞ্চিত অর্থ ও ভবিষ্যৎ দাবি নিষ্পত্তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কোটি টাকার আত্মসাৎ—স্ট্যাম্পে স্বীকারোক্তির দাবি: অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক সিইও ইখতিয়ার উদ্দিন শাহীন গ্রাহকের প্রিমিয়ামের ৬০ লাখ ৭০ হাজার ৭১৭ টাকা নিজের ব্যক্তিগত হিসাবে নেন এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ৫০৫ টাকা ইনসেনটিভ বোনাস গ্রহণ করেন। ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর আইডিআরএ আনুষ্ঠানিকভাবে এই অর্থ কোম্পানির হিসাবে জমা দিতে নির্দেশ দিলেও এখনো অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে—তিনি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ব্যক্তিগত হিসাবে অর্থ জমার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
আইন লঙ্ঘন সত্ত্বেও প্রভাব বজায়: বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট নির্দেশ দেয়—ইখতিয়ার উদ্দিন শাহীন আর সিইও হিসেবে কাজ করতে পারবেন না এবং কোম্পানির ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারবেন না। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশও জারি হয়। তবে অভিযোগ অনুসারে, তিনি বিভিন্ন সময় ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে আবারও কোম্পানির কার্যক্রমে যুক্ত থাকছেন এবং সর্বশেষ কোম্পানি বোর্ড তাকে আর এস আর এম কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে স্বদেশ লাইফে প্রতিনিধিত্বের অনুমোদন দিয়েছে।
জরিমানা বকেয়া, ঋণ অনিয়ম, পরিচালনা বোর্ডে অস্থিরতা : বিমা আইন লঙ্ঘনের দায়ে আইডিআরএ ২০২৩ সালের ১০ মে কোম্পানিটিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে, যা এখনো পরিশোধ হয়নি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে— কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ও সুদ খরচ হয়ে গেছে, স্থায়ী আমানতের বিপরীতে ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে ১২ পরিচালককে অপসারণে আইডিআরএ নির্দেশ দিলেও হাইকোর্টের আদেশে তা স্থগিত রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ অডিট নেই, সিএফও নেই, অটোমেশনহীন হিসাব: কোম্পানি ২০১৪–২০২১ সাল পর্যন্ত অনুমোদিত সীমার তুলনায় ৪১% থেকে ২১৯% পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে। ২০২১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অভ্যন্তরীণ অডিট, এজিএম বা ইজিএম হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সিএফও ও কোম্পানি সচিব নেই, ফলে আর্থিক তথ্যসংরক্ষণ অগোছালো হয়ে পড়েছে।
সিইও পদে অস্থিরতা: ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট সিইও পদ শূন্য হওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সিইও নিয়োগ হয়নি। চলতি দায়িত্বে একের পর এক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সিইও আব্দুল জব্বার কাউসারের বিরুদ্ধেও চুরির মামলা চলছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ম্যানুয়াল লেনদেনে অনিয়মের সুযোগ: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল সিস্টেম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম না থাকায় বেতন, কমিশন, ভাড়া ও বিল ম্যনুয়াল মাধ্যমে সমন্বয় হয়—যা বিভিন্ন ফাঁকফোকর ও বে-নামে বিল তৈরির সুযোগ তৈরি করছে। অনেক কর্মকর্তা নিয়মিত ইনসেনটিভ পান না, কেউ প্রতিবাদ করলে চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়। ২০১৯ সাল থেকে এখনো পর্যন্ত কোম্পানিটি ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ করেনি বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
দুদকের তদন্ত চলছে: দুদক ইতোমধ্যে মামলার তদন্ত শুরু করেছে। বিমা খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, পুরো বিমা শিল্পের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ফল। বিমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন গ্রাহক ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)