প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২২, ২০২৬, ১১:৪০ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ নভেম্বর ২৩, ২০২৫, ৩:০৪ পূর্বাহ্ণ

*জুনিয়র অবস্থায় পাঁচ বছর নির্বাহী ক্ষমতা, দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে শত কোটি লোপাটের অভিযোগ, বিদেশে পাচার হাজার কোটি টাকা—নীরব দুদক, নির্বিকার মন্ত্রণালয়
উদ্যোক্তা বাংলাদেশ ডেস্ক: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এখন দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো উন্নয়ন সংস্থাগুলোর একটি। গ্রামীণ সড়ক, সেতু, স্কুল ভবন, আশ্রয়কেন্দ্র—সব মিলিয়ে দেশের গ্রামীণ উন্নয়নের বেশির ভাগ কাজই এই প্রতিষ্ঠানের হাত দিয়ে হয়। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষকর্তাদের সততা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা শুধু কাঠামো নয়, পুরো উন্নয়ন দর্শনকেই ঝাঁকুনি দেয়। এলজিইডির বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) জাবেদ করিমকে ঘিরে এমনই এক দীর্ঘ, জটিল ও বিতর্কিত পথচলার গল্প শোনা যায়—যার শুরু নিয়োগ অনিয়ম দিয়ে, আর বিস্তার রাজনৈতিক প্রভাব, কমিশন বাণিজ্য, বিদেশে অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগে । আজ প্রথম পর্বের প্রতিবেদনে সেই সব অভিযোগ ও গল্পের সমন্বিত এক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা।
ফল প্রকাশের আগেই চাকরি : তথ্যসূত্র বলছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের একজন প্রভাবশালী প্রকৌশলী ছিলেন জাবেদ করিমের বাবা। সেই পরিচিতি ও প্রভাবই নাকি পুত্রের চাকরির দুয়ার খুলে দেয় আগে থেকেই। কুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে বিএসসি ডিগ্রির চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই এলজিইডির সরকারি (জিওবি) খাতের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি নেন জাবেদ করিম। অথচ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে লেখা ছিল—বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস আবশ্যক।
অর্থাৎ ফলাফল হাতে পাওয়ার আগেই নিয়োগ পাওয়াটাই ছিল একটি সুস্পষ্ট বিরোধ, যা এখন ‘গুরুতর অনিয়ম’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির তারিখ, নির্বাচিত প্রার্থীর তালিকা, কুয়েটের ফল প্রকাশ ও যোগদানের তারিখ পাশাপাশি সাজালে এই অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কয়েকজন অভিজ্ঞ প্রশাসক ও আমলা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে শুধু নিয়োগ নয়, চাকরি বাতিল, অতীতের সব বেতন-ভাতা ফেরত নেওয়া, এমনকি আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুযোগ আইনেই আছে। প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠানের বর্তমান শীর্ষ পদে বসা একজন কর্মকর্তা কি তাঁর ক্যারিয়ারের একেবারে গোড়াতেই এমন বিতর্কিত ‘শর্টকাট’ নিয়েছিলেন?
জুনিয়র থেকে পাঁচ বছরের ‘নির্বাহী’ লক্ষ্মীপুরের অঘোষিত সম্রাট : ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। তখন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন লক্ষ্মীপুরের জিয়া উল হক জিয়া। একই জেলার বাসিন্দা জাবেদ করিম তখনও জুনিয়র পর্যায়ের একজন সহকারী প্রকৌশলী। অভিযোগ—ব্যক্তিগত ‘নেটওয়ার্ক’ আর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকে পুঁজি করেই শুরু হয় তাঁর ক্ষমতার উত্থান। তৎকালীন এলজিইডি প্রধান প্রকৌশলী শহিদুল হাসান নাকি বিষয়টিকে প্রথমে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বলেন। একজন সহকারী প্রকৌশলীকে জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া শুধু প্রচলিত নিয়মেরই লঙ্ঘন নয়, প্রশাসনিক শৃঙ্খলারও অবমাননা—এমন যুক্তিই দেখিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মন্ত্রীর সরাসরি চাপের সামনে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেননি। ফলাফল—একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র সহকারী প্রকৌশলী জাবেদ করিমকে লক্ষ্মীপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই অতিরিক্ত দায়িত্বের মেয়াদও ছিল সাধারণ নিয়মের বাইরে—দিন, মাস পেরিয়ে তা টেনে নেওয়া হয় প্রায় পাঁচ বছর। ওই সময় তিনি শুধু নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারে বসেননি, নিয়ন্ত্রণ করেছেন জেলার উন্নয়ন তহবিল, কার্যাদেশ ও আর্থিক ক্ষমতার বড় অংশ। এলজিইডির ভেতরের অনেকেই পরে এই সময়টাকে উল্লেখ করেছেন প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার সূচনা হিসেবে—যেখানে জুনিয়রিটি, মেধা, অভিজ্ঞতার বদলে রাজনৈতিক লবিং ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাই পদ-ক্ষমতার মূল মাপকাঠি হয়ে ওঠে।

ঘুষ-কমিশনের স্বর্ণকাল : ২০০১ থেকে ২০০৫—এই সময়টাতে লক্ষ্মীপুরে বিপুল পরিমাণ উন্নয়ন বরাদ্দ আসে। সড়ক–সেতু, কালভার্ট, রাস্তা-ঘাট, ভবন—অনেক কিছুই কাগজে–কলমে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সে সময় এখনকার মতো ই-টেন্ডার চালু হয়নি, টেন্ডার হতো হাতে লেখা কাগজে, অনেক কিছুই ‘চোখের আড়ালে, কলমের আড়ালে’। এই সুযোগটাই নাকি কাজে লাগিয়েছিলেন জাবেদ করিম। অভিযোগগুলো এমন— প্রতিটি কার্যাদেশে ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া, ডিপিপিতে রাস্তার নাম অস্পষ্ট রেখে একই রাস্তার নামে একাধিকবার বরাদ্দ আদায় করা, ‘মন্ত্রী জিয়ার নাম’ ব্যবহার করে ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ, দরপত্র লাগাম নিজের হাতে রাখা, লক্ষ্মীপুরে দায়িত্ব পালনকালে শত কোটি টাকার বেশি অবৈধ আয় করেছেন—এমনটাই দাবি করছেন এলজিইডির অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র। যদিও এসব অভিযোগ এখন আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবে এলজিইডির পুরোনো অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তায় এই সময়টাকে আজও অনেকে বলেন—‘কমিশনের স্বর্ণযুগ’। ১/১১-এর ঝড় আর হঠাৎ ‘উচ্চশিক্ষা’ : গ্রেফতারের তালিকা থেকে মার্কিন টিকিটএ ২০০৭ সালের ১/১১–এর রাজনৈতিক উত্তাল সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে নামে, একের পর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী গ্রেফতার হন। তখন বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রানা দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার হন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একই অভিযোগে জাবেদ করিমের নামও তখনকার তালিকায় উঠে আসে। কিন্তু গল্পটা ওখানেই শেষ হয়নি। এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর আস্থাভাজন হিসেবে অল্প দিনের মধ্যেই নাকি ‘জরুরি ভিত্তিতে’ তাঁর জন্য বের করা হয় উচ্চশিক্ষার বরাদ্দ।
খুব অল্প সময়ের মধ্যে ফাইল–নোটিং, অনুমোদন, ভিসা-প্রক্রিয়া সব শেষ করে তাঁকে পাঠানো হয় আমেরিকায়। অভিযোগকারীদের মতে, এটি ছিল মূলত গ্রেফতার এড়ানোর কৌশল, যার সফলতাতেই তিনি দেশে চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ঝড় থেকে নিরাপদে দূরে সরে যেতে পেরেছিলেন। ফিরে এসে আবারও তিনি এলজিইডির মূল ক্ষমতার বলয়ের ভেতরেই জোরালো উপস্থিতি নিয়ে নিজ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
আওয়ামী সান্নিধ্য, তহবিলে অনুদান, তারপর জাতীয়তাবাদী পরিচয় : ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে দেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। এই সময়কালে এলজিইডি হয়ে ওঠে সরকারের অন্যতম প্রাধান্যপ্রাপ্ত উন্নয়ন বাহিনী। অভিযোগ বলছে—এই পুরো সময়টায় সরকারি ক্ষমতার বরাবরই ‘আরামদায়ক বলয়’ উপভোগ করেছেন জাবেদ করিম। তথ্য অনুসন্ধানে উঠে আসে—আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময় তিনি দলীয় তহবিলে মোটা অঙ্কের অর্থ অনুদান দিয়েছেন। গণভবনে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল—এমন দাবি করেছেন একাধিক সূত্র। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে প্রভাব, নিয়োগ-বদলি এবং পদায়নের ক্ষেত্রে তাঁর নাম ছিল ‘অপরিহার্য।’ কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরের দৃশ্যপট ভিন্ন। অভিযোগ রয়েছে—আগের সব পরিচয় ঝেড়ে ফেলে তিনি এখন ‘জাতীয়তাবাদী সেজে বসেছেন’। আর তাই রাজনৈতিক ব্যানার বদলালেও ক্ষমতার বলয় থেকে তিনি সরেননি, বরং নতুন শক্তির সঙ্গে নতুন করে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগকারীদের ভাষায়—“আগে ছিলেন আওয়ামী বলয়ে, এখন জাতীয়তাবাদী হয়ে গেছেন; কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে তাঁর যাতায়াত কোনোদিনই বন্ধ হয়নি।”
প্রকল্পের আড়ালে লুটের মেশিন? : এলজিইডি সাম্প্রতিক সময়ে যেসব বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, তার মধ্যে ‘বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয় কেন্দ্র’ অন্যতম। সাইক্লোন, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা দুর্যোগে মানুষের আশ্রয়ের স্থান হিসেবে এসব ভবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ হলো—এই মানবিক প্রয়োজনের প্রকল্পও রক্ষা পায়নি আর্থিক লোপাটের হাত থেকে। সূত্রগুলোর দাবি—কেবল এই একটি প্রকল্প থেকেই শত কোটি টাকার বেশি অর্থ লোপাট করেছেন জাবেদ করিম ও তাঁর ঘনিষ্ঠ এক শ্রেণির কর্মকর্তা-ঠিকাদার গোষ্ঠী। প্রকল্পের প্রাক্-নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় বাস্তব কাজের মান ও অগ্রগতি—দুটোর মধ্যেই নাকি রয়েছে চোখে পড়ার মতো অমিল। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ না হলেও বিল-পরিশোধে কোনো বাধা ছিল না। আবারও সামনে আসে তাঁর প্রভাবশালী ‘সেন্ট্রাল কানেকশন’—পতিত আওয়ামী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামের সহকারী একান্ত সচিব জাহিদ হোসেন চৌধুরীর নাম। অভিযোগ, এই এপিএসকে সঙ্গে নিয়েই তিনি এলজিইডি ও মন্ত্রণালয়ের সংযোগস্থলকে রূপ দিয়েছেন ‘লুটের করিডরে’। একই সূত্রগুলো বলছে—এই সময়কালে তিনি বিদেশে পাচার করেছেন কমপক্ষে হাজার কোটি টাকার বেশি, আর দেশে–বিদেশে গড়ে তুলেছেন কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদের সাম্রাজ্য।
সড়ক-সেতু রক্ষণাবেক্ষণ বন্ধ, শুধু ‘বিলের সেতু’ চালু: এক সময় তিনি ছিলেন সড়ক ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজন। কিন্তু অভিযোগ হলো—সেই সময়টাকেই এলজিইডির অভ্যন্তরে অনেকে বলছেন ‘রক্ষণাবেক্ষণহীন রক্ষণাবেক্ষণ অধ্যায়’। বলা হয়, সেই সময়ে বাস্তবে কোনো নতুন সড়ক বা সেতু নির্মিত হয়নি, যতটা হওয়ার কথা ছিল। পুরোনো সড়কও ঠিকঠাক রক্ষণাবেক্ষণ পায়নি, ফলে জায়গায় জায়গায় ক্ষতবিক্ষত রাস্তাই ছিল সাধারণ মানুষের বাস্তবতা। কিন্তু প্রকল্প-ফাইলে, বিল-ভাউচারে, কাগজে-কলমে—সব কাজ ‘সম্পন্ন’ দেখিয়ে বিল পরিশোধের রেকর্ড রয়েছে।
এলজিইডির মধ্যম স্তরের অনেক কর্মকর্তা বলেন, এই সময়টাতেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দুর্নীতির সংস্কৃতি অনেকটা ‘গোছানো পদ্ধতি’ পায়—যেখানে টেন্ডার, ভেরিয়েশন, অতিরিক্ত বরাদ্দ, পুনর্মূল্যায়ন—সবকিছুই একটি সুসংহত কমিশন–নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠে।
পোস্টিং-প্রকল্প বাণিজ্য : সরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে পোস্টিং-বদলির গুঞ্জন নতুন নয়। কিন্তু এলজিইডির ভেতরে গত কয়েক বছরে যে অভিযোগগুলো ঘোরাফেরা করছে, তা বেশি মাত্রায় জাবেদ করিমকে ঘিরেই। এলজিইডির বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্য— বড় প্রকল্পে পরিচালক হওয়া মানে শুধু মর্যাদা নয়, বিপুল অর্থ প্রবাহের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ। অভিযোগ—এমন প্রকল্প পরিচালকের পদ পেতে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ‘সেটিং মানি’ গুনতে হয়েছে, আর এর বড় অংশই নাকি গেছে ক্ষমতাধর সিন্ডিকেটের কাছে। বিভিন্ন জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী পদায়নেও তাঁর সরাসরি ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। যোগ্যতা-সিনিয়রিটির চেয়ে ‘ঘনিষ্ঠতা’ আর ‘লেনদেন’ এখানে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানাচ্ছেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে বর্তমান অবস্থান থেকে জাবেদ করিম যেভাবে সবকিছু অস্বীকার করছেন, তা আরেকটি প্রশ্নও তৈরি করছে—যদি সবই ‘মিথ্যা’, তাহলে কেন এলজিইডির অভ্যন্তরে এত বিপরীত বক্তব্য, ক্ষোভ আর গুঞ্জন?
কয়েক হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য : একজন ক্যারিয়ার সরকারি প্রকৌশলী—যার পুরো কর্মজীবন সরকারি চাকরিতে, সরকারি বেতন-ভাতা, সরকারি সুযোগ-সুবিধায় সীমিত থাকার কথা। সেই ব্যক্তিকে নিয়ে যদি অভিযোগ ওঠে—বিদেশে পাচার করা অর্থই কমপক্ষে হাজার কোটি টাকা, দেশের ভেতরে ও বাইরে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই সম্পদের অর্থনৈতিক উৎস কী? সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুসারে প্রত্যেক কর্মকর্তাকেই নির্দিষ্ট সময় পরপর তাঁর সম্পদের বিবরণ জমা দিতে হয়। অভিযোগকারীদের দাবি—প্রকৃত আয়-ব্যয়ের তথ্য আর সরকারি নথিতে জমা দেওয়া হিসাবের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে, যা তদন্ত করলে সহজেই সামনে আসতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দুদক ছিল নীরব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও ছিল নির্বিকার। রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ে নিরাপদ জাল বুনে নেওয়া একজন প্রভাবশালী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তাই এই সময়টায় কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
প্রশ্নের মুখে এলজিইডি : এলজিইডি শুধু একটি দফতর নয়; এটি দেশের গ্রামীণ ও স্থানীয় উন্নয়নের মুখ্য বাহন। গ্রামগঞ্জের স্কুল ভবন, ইউনিয়ন-উপজেলা সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, আশ্রয়কেন্দ্র—এসবই কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দেয়। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে যদি নিয়োগ অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, কমিশন বাণিজ্য, অর্থ পাচার, পোস্টিং-বাণিজ্যের মতো অভিযোগ জমা হতে থাকে, তখন প্রশ্নটা শুধু একজন ব্যক্তিকে ঘিরে থাকে না—নড়বড়ে হয়ে যায় পুরো ব্যবস্থার সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জাবেদ করিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তবে এত বিপুল ও গুরুতর অভিযোগের মুখে থেকেও তিনি প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) পদে বহাল—এটা নিজেই এক বড় প্রশ্ন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি আর সুশাসনের কথা যারা বলেন, তাদের জন্য তাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এলজিইডি ও এর শীর্ষ পর্যায়ের বিরুদ্ধে ওঠা এই সব অভিযোগের নিরপেক্ষ, নির্ভরযোগ্য ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্ত কি হবে, নাকি ‘উন্নয়নের’ নামে আবারও সব ঢেকে দেওয়া হবে? তারা জানান, এই উত্তরের ওপর নির্ভর করছে, জনগণের করের টাকায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ—বিশেষ করে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের ভবিষ্যৎ কতটা সুরক্ষিত থাকবে।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ইমেইল, হোয়াস্টঅ্যাপ এবং ফোনে যোগাযোগ করলেও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) জাবেদ করিম কোনো তথ্য দেননি, যোগাযোগও করেননি। অফিসের মিডিয়া কনসালটেন্টকেও ইমেইল, হোয়াস্টঅ্যাপ এবং ফোনে যোগাযোগ করা হলে কোনো তথ্য দেননি।